এনামুল হক, ধর্মপাশা
পারিবারিক অস্বচ্ছলতা ও অসুস্থ্য স্বামীকে নিয়ে বিপাকে পড়া হাওরপাড়ের গৃহবধূ সুফিয়া আক্তার (ডাকনাম জোসনা) জীবিকার সন্ধানে ২০০৯ সালে পাড়ি জমিয়েছিলেন সংযুক্ত আরব আমিরাতে। সেখানে তিনি গৃহ পরিচারিকার কাজ নেন। ছয় সন্তানের জননী সুফিয়া আক্তার তাঁর আড়াই বছর বয়সী মেয়ে রোজিনাকেও রেখে গিয়েছিলেন গ্রামে। তবে ভালই কাটছিল তাঁর প্রবাস জীবন। ২০১৪ সালের ১৪ অক্টোবর তিনি তাঁর বাড়িওয়ালা দম্পতির সাথে সেখানকার সমুদ্র উপকূলে বেড়াতে যান। এক পর্যায়ে ওই দম্পতির ৬ ও ১০ বছর বয়সী দুই শিশু সমুদ্রে পড়ে যায়। সুফিয়া আক্তার সাথে সাথে দুই শিশুকে উদ্ধারের জন্য নেমে যান সমুদ্রে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তীব্র ¯্রােত উপেক্ষা করে প্রথমে একটি শিশুকে তীরে নিয়ে আসেন এবং ফের দ্বিতীয় শিশুকে উদ্ধারের জন্য ঝাপ দেন সমুদ্রে। দ্বিতীয় শিশুটিকেও উদ্ধার করেন তিনি। কিন্তু পরক্ষণেই তিনি সমুদ্র তীরে জ্ঞান হারান এবং সমুদ্র ¯্রােতে ভেসে যান। যখন সুফিয়া আক্তারকে উদ্ধার করা হয় তিনি তখন তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছেন। এ ঘটনার আট দিন পর সুফিয়া আক্তারের মরদেহ সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার সেলবরষ ইউনিয়নের ভাটাপাড়া নামক নিজ গ্রামে সমাহিত করা হয়।
অপরদিকে দুই শিশুকে বাঁচাতে সুফিয়া আক্তারের সাহসিকতা ও আত্মত্যাগের খবর সংযুক্ত আরব আমিরাতের অধিকাংশ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। বিষয়টি রাষ্ট্র প্রধানেরও নজরে আসে। রাষ্ট্র প্রধানের নির্দেশনায় সুফিয়া আক্তারকে স্মরণীয় করে রাখতে দুবাই কেয়ারস নামের একটি শিক্ষা সেবাদানকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা এগিয়ে আসে। তারা ২০১৮ সালে ঢুলিজার হাওরপাড় ঘেষা ভাটাপাড়া গ্রামে ১০০ শতাংশ জায়গা জুড়ে সুফিয়া আক্তার স্মরণে নির্মাণ করে ভাটাপাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়। ওই বছরই বিদ্যালয়টিতে শুরু হয় ভর্তি কার্যক্রম। বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের পরিচালিত এ বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে ২৭০ জন শিক্ষার্থী ও ৯ জন শিক্ষক রয়েছে। বিদ্যালয়ে সুফিয়া আক্তারের ছেলে মাজহারুল ইসলাম নৈশ্য প্রহরী হিসেবে চাকরী পেয়েছেন।
সুফিয়া আক্তার ১৯৭২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ভাটাপাড়া গ্রামে কালু মিয়া এবং আখতারের নেছা দম্পতির ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। সাত ভাই-বোনের মধ্যে সুফিয়া ছিলেন তৃতীয়। ১৭ বছর বয়সে তিনি একই গ্রামের খুর্শিদ মিয়ার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি।
সুফিয়া আক্তারের ছেলে মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘মায়ের স্মরণে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ে কাজ করতে পেরে আমি খুব আনন্দিত।’
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মঈন উদ্দিন বলেন, ‘সেলবরষ ইউনিয়নে এটিই প্রথম কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয়। যা হাওরপাড়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে বলে বিশ্বাস করি।’
সেলবরষ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা নূর হোসেন বলেন, ‘এ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে অত্র ইউনিয়নে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সূচনা হলো। বিদ্যালয়টির মধ্য দিয়ে সাহসী নারী সুফিয়া আক্তার যুগ যুগ ধরে চিরস্বরণীয় হয়ে থাকবেন।’
- খাদ্যে ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে : স্বাস্থ্যমন্ত্রী
- শহরতলীতে মধ্যবয়সী নারীর লাশ উদ্ধার


