অ্যাডভোকেট এনাম আহমেদ
সুনামগঞ্জের কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে স্থাপন করায় আমরা হতভম্ব। স্বাধীনতার ৪৬ বছর পর ঠান্ডা মাথায় একটি স্কুলের বাউন্ডারি দেয়া খেলার মাঠের ভেতরে আমরা কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের জায়গা ঠিক করে ফেললাম! শহিদ স্মৃতি এবার অমর হবে একটি স্কুলের খেলার মাঠে ? ৪৬ বছর পূর্বে আমাদের মুক্তিযোদ্ধাগণ নিজ হাতে যে জায়গায় শহিদ মিনার নির্মাণ করেছিলেন, আমরা কি এর চেয়ে ভালো জায়গা নির্ধারণ করলাম ? এ ঘটনা প্রমাণ করল আমাদের পূর্বপুরুষরা শিক্ষায় আমাদের চেয়ে পিছিয়ে থাকলেও মেধা, মনন ও দূরদর্শিতায় কত অগ্রসর ছিলেন। দীর্ঘদিন যাবৎ শহরে একটি শহিদ মিনার নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছে। এ ব্যাপারে উদ্যোগও নেয়া হয়েছে। স্থান নিয়ে কথাবার্তা চলছে। অগ্রসর চিন্তা ভাবনা সম্পন্ন ভালো খবরের প্রত্যাশায় ছিলাম। একটি পূর্ণাঙ্গ শহিদ মিনার কমপ্লেক্স শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অচিরেই নির্মিত হতে যাচ্ছে এমন স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলাম। কিন্তু বিনামেঘে বজ্রপাতের মতো একটি সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত স্থানে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার নির্মাণের খবর চলে এলো আমাদের সামনে। এ পর্যায়ে প্রশ্নœ উঠতেই পারে যে, শহিদ মিনার কেন নির্মাণ করা হয়? ভবিষ্যতে কেন শহিদ মিনার নির্মাণ করতে হবে-সে বিষয়ে আমাদের ন্যুনতম ধারণা থাকা দরকার। শহিদ মিনার কি শুধু ইট, সুরকির কয়েকটি স্তম্ভ? নির্দিষ্ট বিশেষ দিনে শুধু ফুল দেয়ার জন্য না-কি শহিদ মিনারকে ঘিরে আরও কিছু কার্যক্রম আছে?
৫২’ এর ভাষা আন্দোলন পরবর্তী ঢাকার কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারটি কি শুধু ভাষা শহিদদের স্মরণ করার জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল? এটি কি পরবর্তীতে বাঙালির সকল আশা আকাঙ্খার প্রতীক হয়ে উঠেনি? প্রায় ১৩০ বছরের পুরাতন শহরের সরকারী জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়। এটিই স্কুলের প্রধান খেলার মাঠ। স্কুলের যাবতীয় ক্রীড়া কার্যক্রম এ মাঠেই সম্পন্ন হয়। শুধু এ স্কুল নয়, শহরে তীব্র মাঠ সংকট থাকায় আশেপাশের অনেক স্কুল ও প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক ক্রীড়া এ মাঠে সম্পন্ন হয়। সুনামগঞ্জের মূল স্টেডিয়াম বর্তমানে ব্লক থাকায় মধ্য শহরে আর কোন খেলার মাঠ নেই। বিকেলে এ মাঠটি কিশোর-যুবকে ভর্তি থাকে। কেউ খেলে ক্রিকেট, কেউ ফুটবল। জায়গার অভাবে অনেক দলকে মাঠের কোণে ছোট ছোট অংশে খেলতে হয়। এ নিয়ে প্রায়ই ঝগড়া হয়। শহরের মুরুব্বীগণ এসব সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করেন। এর মধ্যে কোথায় আমরা করব শহিদ মিনার? এ মাঠে কয়েক মাস থাকে কাদা। সুরমা নদী উপচে প্রথমেই পানি উঠে এ মাঠে। তখন কি হবে? শহিদ মিনারে যাওয়ার জন্য মাঠের মধ্যে দিয়ে উঁচু রাস্তা তৈরি করতে হবে। মাঠ হবে দুই ভাগ। তখন এটি কি আর মাঠ থাকবে? বলের আঘাতে শহিদ মিনারের আকৃতি ভেঙে পড়তে পারে। এতে শহিদ মিনারের অবমাননা হবে। আবার খেলা বন্ধ করলে তারুণ্যের অবমাননা হবে। তরুণরা উঠে আসবে রাস্তায়। ইভটিজিং করবে, মাদকাসক্ত হবে, বাচ্চারা দৈহিকভাবে দুর্বল হয়ে যাবে। এ মাঠে কি শুধু খেলাধুলাই হয়? ঐতিহাসিকভাবে সরস্বতী ও দুর্গাপূজার প্রতীমা জুবিলীর মাঠে বিসর্জনের জন্য জড়ো করা হয়। র্যালি করার পর এ মাঠ থেকেই বিসর্জন দেয়া হয়। শহিদ মিনার মাঠকে ছোট করে ফেললে শহরের সব প্রতিমা এ মাঠে জায়গা হবে না। স্টেডিয়ামের উপর চাপ কমানোর জন্য জাতীয় পর্যায়ে অনেক খেলা এ মাঠে সম্পন্ন হয়। বৃক্ষমেলা, বাণিজ্যেমেলা, এমনকি বর্ষার কোরবানীর পশুর হাট বসানোর যখন শহরে আর কোন জায়গা থাকে না তখন এ মাঠেই তার ব্যবস্থা করা হয়।
এবার আসা যাক সাংস্কৃতিক সমস্যায়। যে কোন জেলার শহিদ মিনারটি হবে ঐ এলাকার সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের উন্মুক্ত তীর্থভূমি। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক দলের সভা ও সম্মেলন বিনা ভাড়ায় করা যায় শহিদ মিনারে।
এ সব অনুষ্ঠানে মাইক ব্যবহার করতে হয়। স্কুল চলাকালীন সময়ে মাইক ব্যবহার করা হবে কিভাবে? ছুটির দিনে জুবিলী স্কুলে নিয়োগ প্রীক্ষা সহ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস ও পরীক্ষা থাকে। তার মানে শুক্রবারেও মাইক ব্যবহার করা যাবে না। বিভিন্ন দাবি আদায় বা অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিবাদ সভা বা মানববন্ধন করে শহিদ মিনারে। এবার আমরা এগুলো করব বাচ্চাদের খেলার মধ্যে নির্জন স্থানে।
এছাড়াও এ নির্জন স্থানে শহিদ মিনার হলে এটি সন্ধ্যার পর হবে মাদকসেবীদের আশ্রয়স্থল। দেশে জঙ্গিবাদের উত্থানের এ সময়ে যখন শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চাকে উৎসাহিত করা হচ্ছে, তরুণদের শহিদ মিনারমুখী করা হচ্ছে, তখন আমরা শহিদ মিনারকে নিয়ে যাচ্ছি নির্জন স্থানে। এ শহিদ মিনারের জন্য নাকি নীতিমালা করা হবে। নীতিমালা দিয়ে এটিই হবে দেশের প্রথম শহিদ মিনার। অর্থাৎ টুঁটি চেপে ধরা অবরুদ্ধ শহিদ মিনার। দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগ করেও বর্তমান শহিদ মিনারের আশেপাশে পরিত্যক্ত এক ইঞ্চি জায়গাও আমরা বড় করতে পারিনি। কেমন আমাদের দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও আপোষকামিতা। এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে স্কুল মাঠে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার নির্মাণের অনুমতি আমাদের কে দিল? শিক্ষা মন্ত্রণালয়? নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় তো নয়ই, এমনকি স্কুল পরিচালনা কমিটির সভায়ও শহিদ মিনার নির্মাণ বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। এখানে শহিদ মিনার হলে না জুবিলী স্কুলের সম্মান থাকবে, না শহিদ মিনারের পবিত্রতা থাকবে। শহিদ মিনারটি রীতিমতো ‘মাঠে মারা’ যাবে। মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় প্রজন্ম যদি জনবহুল স্থান এড়িয়ে সুরমার পাড়ে নির্জন স্থানে শহিদ মিনারটি নিয়ে যেতে পারে তবে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম সম্ভবত এটিকে আরও নিরাপদ স্থান সুরমা নদীর ঐপাড়ে জগন্নাথপুর গ্রামে নিয়ে যাবে। ঘুমাও শহিদ শান্তিতে, আমরা আছি রাজপথে!
লেখক: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।
- ট্যাকেরঘাট খনি প্রকল্প উচ্চ বিদ্যালয়ের নামকরণ নিয়ে বিতর্ক
- কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ইউপি সদস্য বিজয় কর অবশেষে জেল হাজতে


