জ্যোতি’র আলো যেভাবে নেভে

আসাদ মনি
সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের চার শিক্ষার্থী মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। তাঁরা হলেন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি দাস, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা গিয়াস উদ্দিন, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা তালেব উদ্দিন ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী আজগর। শত্রুদের ত্রাস ছিলেন জগৎজ্যোতি, সব সময় বগলে বই থাকা গিয়াস পরিচিত ছিলেন লেলিন নামে, তালেব ও আজগরের কন্ঠে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে কম্পিত হতো পুরো ক্যাম্পাস।
এই চারজনই ছিলেন প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের সম্মুখসারির নেতা এবং তখনকার ছাত্র সমাজের কাছে মেধাবী ছাত্রনেতা হিসাবে পরিচিত। তাঁদের স্মৃতিরক্ষায় সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ কর্তৃপক্ষ একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেছে। ইন্টারনেটের তথ্যভান্ডারের সহায়তায় পর্যায়ক্রমে তাদের বীরত্বগাঁতা স্মৃতি বর্তমান ছাত্র তরুণদের জন্য তুলে ধরা হবে।
শহীদ জগৎজ্যোতি দাস
হবিগঞ্জ জেলার আজমিরিগঞ্জ থানার জলসুখা গ্রামে জগৎজ্যোতি ১৯৪৯ সালের ২৬ এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন। পিতা জিতেন্দ্র কুমার দাস, মাতা হরিমতি দাস। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে আদরের জ্যোতিই সবার ছোট। সবাই আদর করে ডাকতো শ্যাম বলে। রাজমিস্ত্রি বাবার অভাবের সংসার, তবু জ্যোতি প্রাইমারি পেরিয়ে স্থানীয় বিরাট গ্রামে ‘আজমিরিগঞ্জ বীরচরণ হাইস্কুল’ থেকে ১৯৬৮ সনে দ্বিতীয় বিভাগে মেট্রিক পাস করেন। ন¤্র-ভদ্র আচরণের জন্য শিক্ষকসহ গ্রামের সবাই তাকে স্নেহ করতেন। অভাবের সংসার পড়াশুনার সামর্থ্য নেই, বাপ-ভাইয়ের ইচ্ছা চাকুরিতে ঢুকে সংসারের হাল ধরতে। কিন্তু জগৎজ্যোতির মনে অন্য আগুন জ¦লছে, তাই ভাবলেন আরও লেখাপড়া করতে হবে। নওগাঁ কলেজে ভর্তি হয়ে জ্যোতি এইচএসসি পাস করেন। বিএ পড়ার অদম্য ইচ্ছা জ্যোতির। সেনাবাহিনীতে ভর্তি হয়ে হিন্দি ও ইংরেজি ভাষাটা ভালো করে রপ্ত করেন যা পরবর্তী জীবনে খ্যাতি এনে দিয়েছিলো।
প্রশিক্ষণ শেষ চাকুরিতে যোগদানের দু’দিন আগে জ্যোতি সোজা আজমিরিগঞ্জ চলে এসে বাড়িতে চিঠি দিয়ে জানান, আমি বিএ পাস করতে চাই, এখনই চাকুরিতে আবদ্ধ হতে চাই না।
কিন্তু নিজের আর্থিক অবস্থার জন্য অগত্যা স্থানীয় ‘কৃষ্ণগোবিন্দ পাবলিক হাইস্কুলে’ ৭৫ টাকা বেতনে শিক্ষকতা শুরু করেন। তাও মূল কাজে রেহাই নেই, একবার স্থানীয় জমিদারের দখলে খাস জমি উদ্ধারে তাঁর গ্রুপ তৎপরতা চালান। জমিদারের প্রভাবশালী লোকজন একদিন একা পেয়ে তাকে আক্রমণ করলে খালি হাতে একাই সশস্ত্র আক্রমণ প্রতিহত করেন। আজমিরিগঞ্জ এলাকায় বিষয়টি আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং জ্যোতি অপ্রতিরোধ্য ‘ছাত্রনেতা’য় পরিণত হন। জীবনযুদ্ধই জ্যোতিকে জীবনসংগ্রামী করে তুলেছে, যা পরবর্তী জীবনে প্রতিফলিত হয়েছে। কিন্তু বিএ পাস করা বা উচ্চশিক্ষার কী হবে? তাই কিছু টাকা জমিয়ে প্রথমে হবিগঞ্জ বৃন্দাবন কলেজে ও পরে সুনামগঞ্জ কলেজে বিএ ক্লাসে ভর্তি হন।
জ্যোতি ‘৭১’র উন্মাতাল দিনে সুনামগঞ্জে ছাত্র ইউনিয়নের একজন প্রথম সারির কর্মী হিসেবে শহরের সকল আন্দোলন সংগ্রামের কর্মসূচিতে অগ্রভাগে থাকেন। সকলের আগে তাঁর কণ্ঠেই মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্র ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ ধ্বনিত হয়। তাঁর দ্রোহী মন উপযুক্ত সময়ে নতুন একটি দেশের স্বপ্নে বিভোর হয়ে ওঠে। মুক্তিযুদ্ধ পর্বে সুনামগঞ্জের সকল মিছিল মিটিংয়ে তাঁর সক্রিয় প্রচেষ্টা ও উপস্থিতি ছিলো সবার কাছে আকর্ষণীয়, প্রশংসনীয়। এবার ‘দেশের ডাক’ মুক্তিযুদ্ধে যেতে হবে। চলে যান গ্রামের বাড়ি আজমিরিগঞ্জের জলসুখায়। মা’কে প্রণাম করে, ‘‘মা’ আবার তোমাকে দেখতে আসবো স্বাধীন দেশে’ বলে বিদায় নেন। বাবা জিতেন দাস, বড়ভাই জীবনানন্দ দাস হতবাকের মত পাশে দাঁড়িয়ে সায় জানান। সহজ সরল অবুঝ মা বুকে জড়িয়ে ধরে কান্না-জড়িত কণ্ঠে বিদায় দেন, আশীর্বাদ করে বলেন তোমাদের মঙ্গল হোক। এটাই মা’র সঙ্গে নাড়িছেড়া ধন জগৎজ্যোতির শেষ দেখা শেষ কথা।
মুক্তিযুদ্ধের এ স্বল্পতম সময়ে যার নেতৃত্বে এতগুলো বীরত্বপূর্ণ সফল অভিযান পরিচালিত হয়েছিল, সেই জগৎজ্যোতি দাস জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত শত্রুুর বিরুদ্ধে লড়াই করে দেশের জন্য নিজেকে আত্মোৎসর্গ করেন ১৯৭১ সালের নভেম্বরের ১৬ তারিখ। ওই দিন ন্যাশনাল গ্রিডের বিদ্যুৎ লাইন ধ্বংসের উদ্দেশে ৩৬ জনের একটি দল নিয়ে তিনি নৌকাযোগে খালিয়াজুরী থেকে বাহুবলের দিকে রওনা দেন। খুব ভোরে রওনা হয়ে সকাল আনুমানিক নয়টার সময় বদলপুর ইউনিয়ন পরিষদের কাছে পৌঁছে তারা দেখেন, কয়েকটি নৌকায় করে একদল রাজাকার ওই এলাকায় চলাচল করে এমন জেলেদের নৌকা থেকে চাঁদা তুলছে। জগৎজ্যোতি মুহূর্ত দেরি না করে অস্ত্রহাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে বেশ কয়েকজন রাজাকারকে হত্যা করেন। তাদের এ আকস্মিক আক্রমণে জীবিত রাজাকারেরা নৌকা নিয়ে পালিয়ে যেতে থাকে। জগৎজ্যোতি তার দলের অধিকাংশ সদস্যকে পেছনে রেখে মাত্র বারোজন নিয়ে তাদের তাড়া করেন। রাজাকারের দল নদীর ওপর তীরে নৌকা রেখে শুকিয়ে যাওয়া বিল পেরিয়ে জলসুখার দিকে পালিয়ে যায়। জগৎজ্যোতি নদীর তীরে নৌকা রেখে শুকনো বিলের ওপর দিয়ে রাজাকারদের বেশ কিছুদূর ধাওয়া করে ধরতে না পেরে নিজেদের নৌকায় ফিরে আসতে থাকেন। ঠিক তখনই ওৎ পেতে থাকা পাকসেনারা দুদিক থেকে ঘিরে বিরামহীন গুলিবর্ষণ করতে থাকে। এভাবেই জগৎজ্যোতি ও তার দল দিনের ঝকঝকে আলোয় বিলের মাঝখানে পাকসেনাদের ফাঁদে পড়ে যান।
ওদিকে বদলপুরে রেখে আসা মূল দলও তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসতে পারছে না। কারণ পাকসেনাদের অন্য একটি দল গানবোট নিয়ে তাদের মূল দলের ওপর অনবরত গুলিবর্ষণের মাধ্যমে আটকে রেখেছে। দাসপার্টি ও পাকসেনা উভয় পক্ষের মধ্যে তখন আক্রমণ-প্রতিআক্রমণ চলতে থাকে। প্রচ- গুলি বর্ষণকালে দাসপার্টির একে একে সাতজন গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এদিকে যুদ্ধের রসদ কমে এলে জগৎজ্যোতি বিনোদবিহারীসহ আরও দুজন মুক্তিযোদ্ধাকে বদলপুর মূল দল থেকে গোলাবারুদ আনতে পাঠিয়ে দেন। বেলা গড়িয়ে যায়; কিন্তু গোলাবারুদ নিয়ে ওরা আর ফিরে আসে না। জগৎজ্যোতিরা সংখ্যায় তখন মাত্র দুজন- জগৎজ্যোতি ও ইলিয়াস। গোলাবারুদও তখন ফুরিয়ে আসছে। বিকাল সাড়ে তিনটা। সময় ফুরিয়ে আসছে। জগৎজ্যোতি একটা এলএমজি হাতে শত্রুর ওপর গুলিবর্ষণ করে যাচ্ছেন। এমন সময় শত্রুর একটা বুলেট ইলিয়াসের বুকের বামপাশে এসে আঘাত করে পিঠ দিয়ে বেরিয়ে যায়। জগৎজ্যোতি মাথার গামছা দিয়ে ইলিয়াসের জখমের জায়গাটি শক্ত করে বেঁধে দেন যাতে রক্তক্ষরণ কম হয়।
একপর্যায়ে তিনি ইলিয়াসকে বলেন- তিনি কভার ফায়ারিং দিচ্ছেন ইলিয়াস যেন ফিরে যায়। ইলিয়াস জ্যোতিকে একা রেখে চলে যেতে অস্বীকার করেন এবং যুদ্ধ চালিয়ে যান। থেমে থেমে শত্রুর ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি তাদের মাথার ওপর দিয়ে চলে যাচ্ছে। জগৎজ্যোতি তখন হিসাব করে দেখেন সন্ধ্যা পর্যন্ত যদি টিকে থাকা যায় তাহলে অন্ধকারে মিশে গিয়ে তারা শত্রুর নিশানা থেকে বেরিয়ে যেতে সক্ষম হবেন। কিন্তু সেই পরিকল্পনা আর সফল হয়নি। যুদ্ধের এক পর্যায়ে ম্যাগাজিন লোড করে শত্রুর অবস্থান দেখতে মাথা উঁচু করার মুহূর্তেই একটি গুলি জগৎজ্যোতির চোখ বিদ্ধ করে। মেশিনগান হাতে উপুড় হয়ে পাশের বিলের পানিতে নিশ্চল হয়ে ঢলে পড়েন জ্যোতি।
সন্ধ্যার অন্ধকার যেন আরও অন্ধকার হয়ে নামে ইলিয়াসের চোখে। নিজেকে সামলে নিয়ে তিনি খুব সাবধানে দলনেতা জগৎজ্যোতি দাসের নিথর দেহটি বিলের কাদা পানির ভেতর যতটুকু সম্ভব পুঁতে ফেলেন, যাতে মৃতদেহ পানিতে ভেসে উঠে শত্রুর হাতে না পড়ে। এরপর ইলিয়াস খুব সতর্কতার সঙ্গে সে স্থান ত্যাগ করে শত্রুর ফায়ারিং রেঞ্জ থেকে নিরাপদ দূরত্বে সরে যান। হানাদার বাহিনীর কাছে ত্রাস সৃষ্টিকারী অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতির এভাবেই জীবনাবসান ঘটে। জীবনের অবসান ঘটলেও জ্যোতির ওপর পাকসেনা ও তাদের দোসরদের আক্রোশ তখনও কমেনি।
পরদিন ভোরে জগৎজ্যোতির মৃতদেহ কাদা পানির ভেতর থেকে ভেসে উঠলে রাজাকাররা সে দেহ খুঁজে পায় এবং টেনেহিঁচড়ে নৌকার সম্মুখভাগে তুলে নিয়ে সাধারণ মানুষের ভেতর আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য জলসুখা থেকে আজমিরীগঞ্জের ঘাটে ঘাটে তার মৃতদেহ প্রদর্শন করে তারা পাশবিক উল্লাস করতে থাকে। এভাবে তারা আজমিরীগঞ্জ বাজারে পৌঁছায়। সেদিন ছিল হাটবার। বাজার ভর্তি মানুষ। রাজাকাররা তখন শত শত মানুষের সামনেই বাজারের ঠিক মাঝখানে একটি বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে ঝুলিয়ে পেরেক মেরে জগৎজ্যোতির মৃতদেহ বেঁধে অত্যাচার শুরু করে। এভাবে মারতে মারতে তারা ক্ষতবিক্ষত করে ফেলে জগৎজ্যোতির লাশ। রাজাকার সদস্যরা থুথু ফেলে তার দেহে। তারা জগৎজ্যোতির লাশের ওপর শুধু অত্যাচার করেই বসে থাকেনি বরং তার মা-বাবাকে ধরে এনে তাদের সন্তানের বীভৎস লাশ দেখিয়ে সনাক্ত করতে বলে। দাসের পরিবার সনাক্ত করতে অস্বীকৃতি জানান। হয়তো তারা ভেবেছিলেন সনাক্ত করলে রাজাকারেরা তার পরিবারের অন্য সদস্যদেরও হত্যা করবে।
যুদ্ধ ক্ষেত্রে জ্যোতির শহীদ হবার সংবাদ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, অল ইন্ডিয়া রেডিওসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত ও প্রকাশিত হয়। সেই সাথে তার বীরত্বগাঁথা তুলে ধরা হয় বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে। অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার তাকে সর্বোচ্চ মরণোত্তর পদক প্রদানের ঘোষণা করেন। প্রথম ব্যক্তি হিসেবে জগৎজ্যোতিকে মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদক প্রদানের ঘোষণা সে সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হয়। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সংগঠক বেলাল মোহাম্মদ লিখেছেন: ‘বীরগতিপ্রাপ্ত জগৎজ্যোতিকে বীরশ্রেষ্ঠ খেতাব দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল একাধিকবার এবং তার বীরত্বগাঁথা প্রচার হচ্ছিল সম্মানের সঙ্গে। অল ইন্ডিয়া রেডিওসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত ও প্রকাশিত হয় জগৎজ্যোতির বীরত্বগাঁথা। অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার তাঁকে সর্বোচ্চ মরণোত্তর পদক প্রদানের ঘোষণা দিয়েছিলেন। প্রথম ব্যক্তি হিসেবে জগৎজ্যোতিকে মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদক প্রদানের ঘোষণা সে সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হয়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পরে প্রতিশ্রুতি থেকে ফিরে আসেন বাংলাদেশ সরকার, কোন এক অজ্ঞাত কারণে। ১৯৭২ সালে জগৎজ্যোতিকে বীরবিক্রম খেতাবে ভূষিত করা হয়।’ চলবে..
সূত্র:
শহীদ জগৎজ্যোতি: দাস অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার, সাপ্তাহিক একতা
দাস পার্টির খোঁজে: হাসান মুরশেদ
জগৎজ্যোতি: অঞ্জলি লাহিড়ী
মাহবুবুর রব সাদী: অকুতোভয় যোদ্ধা: উজ্জ্বল দাস, প্রথম আলো
ইতিহাসের বিস্মৃত এক মুক্তিযোদ্ধা: একেএম শামসুদ্দিন, যুগান্তর
গেরিলা ১৯৭১ পেইজে দাসের মৃত্যু দিবস নিয়ে লেখার কিছু অংশ
আজমেরিগঞ্জ উপজেলার তথ্যবাতায়ন এবং উইকিপিডিয়া