এগারো বছরের মেয়ের চোখে মুক্তিযুদ্ধ

জেসমিন সাদিক
(পূর্ব প্রকাশের পর)
ঐ দিকে আলেয়া ফার্মেসীতে বরুণ দা, রইছ চাচা , আব্বা, আলফাত মোক্তার সাব, খোকন চৌধুরী, খলিলুর রহমান অ্যাডভোকেট, আছদ্দর মোক্তার সাহেব সবাই একাট্টা। ন্যাপ আওয়ামী লীগে কোন ভেদাভেদ নাই । আর রাজনৈতিক চর্চা হতো উচ্চগ্রামে। আমি শুধু অবাক বিস্ময়ে বড়দের এই উচ্ছাস এই তর্ক বিতর্ক দেখতাম আর আইয়ূব খান নামক এক শাসক যে কত খারাপ তার পতন যে হতেই হবে সে স্বপ্ন দেখতাম। আলেয়া ফার্মেসীতে চোখ ছোট একজন ছিলেন নাম মনে হয় ছিলো অম্বিকা। তিনি কতবার যে চা-বিস্কুট আনাতেন তার ইয়ত্তা নাই। আমার ভাগে বিস্কুট পড়তো। আবার পুরান কলেজের ছাত্রদের জিলাপী বা নিমকির ভাগও পেতাম মাঝে মাঝে। সামনেই ছিলো বলার স্টল। মিস্টি, জিলাপী আমৃতির জন্যে বিখ্যাত। তাও ভাগে পেতাম। টো টো করে শহরে ঘুরা আর পুকল খেয়ে হাঁটা আমার অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়। যেখানেই জটলা আমি সেই জটলার ভিতরে গিয়ে সংবাদ সংগ্রহে পটু ছিলাম। এই সংবাদগুলো রিলে করতাম আমি আম্মার কাছে। আম্মা মন দিয়ে শুনতেন হু হা করতেন কোন মন্তব্য করতেন না। এখন মনে হয় আম্মার হয়তো এই সংবাদগুলো জানতে ইচ্ছে করতো। আমার মাধ্যমে জানতেন।
আমাদের পাড়ায় বাবলুর মামা আজাদ মামা ছিলেন ঘোর ন্যাপ সমর্থক। উনার দোকান ছিলো। তাদের আখড়ার পলাশের খালিক সাহেব আমাদের পাড়ার খালেদার আব্বা, অজিত নাগ, স্বপন দা. মিন্টু দা আরও অনেকেই এই আড্ডার নিয়মিত সদস্য। আর জালালাবাদ হোটেল ছিলো মফস্বল থেকে আসা নেতাদের একমাত্র থাকার জায়গা। ৭০ সালের শেষ দিকে মধুমিতা হোটেল নামে একটা নুতন হোটেল হয়। কিন্তু হোটেল বলতে জালালাবাদ হোটেলই বুঝাতো। সব রাজনৈতিক নেতারা সিলেট থেকে বা মফস্বল থেকে এসে এই হোটেলেই রাত্রি যাপন করতেন। ছোট্ট শহরে বিকালটা হয়ে উঠতো উত্তেজনাপূর্ণ। ছাত্রদের মিছিল, বড়দের মিটিং, রাজনৈতিক আলোচনার ঝড়, পেপার আর রেডিওর খবরের ব্যাখ্যা। সবার চোখে স্বপ্ন। স্বৈরাচার হঠানোর প্রত্যয়। নিজেদের শাণিত করার আকাক্সক্ষা, দেশপ্রেমের দীক্ষা, একে অপরের প্রতি ভালবাসার সুদৃঢ় বন্ধন। ছাত্র ছাত্রীদের যুগপৎ পথচলা। কোন ক্ষুদ্রতা , কোন অশ্লীলতা, কোন নীচতা ঐ সময়ের ছাত্র, যুবা, প্রৌঢ় কারও মাঝে ছিলো না। সারা শহরটা যেনো এক ফ্যামেলি হয়ে স্বাধিকার এর স্বপ্নে বিভোর ছিলো ।
ছাত্ররা শুধু রাজনীতিতেই ব্যস্ত থাকতো না। ঈদে পার্বণে হিন্দু মুসলিম একত্রে আনন্দ উৎসবে মেতে উঠতো। লক্ষীপুজার সময় হতো অনেক মজা। ছেলেরা এমনিতেই পোস্টার লিখার জন্য চিকা মারার জন্য রাত জাগতো, দরাজ গলায় গান গাইতো, আর এর তার বাড়ীর মুরগী খাসী চুরি করে রাতে পিকনিক করতো। মধ্যরাতে মানিক কোরেশীর বাসা থেকে শহীদ ভাই, সমছু ভাই অনেক মসলা আম্মাকে ধরিয়ে দেন বাটার জন্য। আম্মা গজ গজ করতে করতে মসলা বেটে দেন মধ্য রাতে। শেষ রাতে আমরাও এই খাবারের ভাগ পেতাম। দেখা যেতো আম্মা মসলা বেটে তাদের সাহায্য করছেন আর একদল আমাদের মুরগীর ঘর লাকরীর ঘর খালি করছে। যাদের বাড়ীতে চুরি করতো তারা বুঝলেও প্রচ্ছন্ন সমর্থন দিতেন। দামাল ছেলেদের এই সব অত্যাচার বড়রা হাসি মুখে সহ্য করতেন ।
একুশে ফেব্রুয়ারি ছিলো সবার কাছে প্রার্থনার দিনের মতো। তা পালনের যে ঘটা ছিলো আর সকলের সম্পৃক্ততা এতো প্রবল ছিলো যে প্রত্যেক পাড়ায় সবাই ব্যস্ত। ১০/১৫ দিন আগ ধেকে শুরু হতো রিহার্সেল। দীপালী দি’র বাসায় গান শেখাতেন মৃদুল দা। ‘আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি’, ‘ভুলবনা ভুলবনা একুশে ফেব্রুয়ারি ভুলব না’- দীপালী দি সবার দিদি। উনার ছেলে মেয়ে বড় হওয়ার পরও তিনি তার পড়াশুনা চালিয়ে যান। সব আন্দোলনে সর্বাগ্রে ছাত্র অছাত্র নারী পুরুষ সবাই কে উনি সময় দিতেন। অসাধারণ রাজনৈতিক সচেতন, কুসংস্কার মুক্ত এক নারী। উনার ছেলে মেয়েরাও উনার সব কাজের সহযোগী। সকল প্রগতিশীল কাজে অগ্রগামী এই মহিলা। তার সন্তানেরা শিল্প সংস্কৃতিকে ধারণ করতেন। দেশাত্ববোধক গানের তালিম আমরা উনার বাসায়ই নিতাম। উনি ছাত্র ইউনিয়নের সংগে যুক্ত ছিলেন। আর উনার সঙ্গে সব সময় থাকতেন আওয়ামী লীগের পারুল ভট। আর ছিলো লম্বা বাসা। উকিল পাড়ায় রাস্তার পাশে লম্বা টিনের বেড়া টিনের ছাউনি দেয়া দোচালা সুন্দর একটি বাসা যার দীর্ঘত্ব অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো। বনেদী বাসা। সবাই এই বাসাকে লম্বা বাসা বলতো। যার সামনে দিয়ে বিকালে গেলে একেক রুম থেকে একেক ধরনের সুরের রেশ ভেসে আসতো। আর রাত্রে পড়ার শব্দ। যৌথ ব্রাহ্মণ ফ্যামেলি, সবাই শিক্ষা সংস্কৃতিতে অনেক এগিয়ে । ছেলে বুড়ো সবাই সংগীত সাধনা করতেন। তাই এই রাস্তা দিয়ে গেলে, শিশু, প্রৌঢ়, বৃদ্ধ বিভিন্ন কন্ঠের সুরেলা সুর ভেসে আসতো আর সবাই সমীহের চোখে দেখতো। এই বাসার সবাই রাজনীতি সচেতন। সকল আন্দোলন সংগ্রামে এই বাসার যুবকদের ভূমিকা থাকতো। উদয় দা, বিজিত মামা, রুপু দি, সবাই ছাত্র ইউনিয়ন। পাশেই কলেজ হোস্টেল। প্রফেসর মেস। আর সেখানকার নেতা প্রফেসর মতিন স্যার। উকিল পাড়ায়ও একটি রাজনৈতিক আখড়া ছিলো। দাদার সুবাদে সকল আন্দোলন সংগ্রামে আপা আর আমি থাকতাম বড়দের লেজ হয়ে। আর সেজন্যে সব পাড়ায় অবাধ বিচরণ করতাম।
একুশে ফেব্রুয়ারির ভোরে দাদা দের তো ঘুম ছিলোই না সঙ্গে আমাদেরও না। এখন তো ফুল কিনে রিং বানিয়ে শহীদ মিনারে সকালে দেয়া হয়। তখন ভোর মানে সূর্য উদয়ের পর পর পুরান কলেজের সামনে শহীদমিনার বানিয়ে ফুল দিতে হতো। সেই ফুল আমরা মেয়েরা রাত্রে মানুষের বাসা থেকে চুরি করতাম। রানী দি, নিরুপমা দি, সঞ্চিতা দি, জয়া দি, প্রতিমা মাসী আরও অনেকে থাকতেন। আমি আর আপাও থাকতাম। আমরা এই ফুল চুরিকে শহীদ ভাইয়ের জন্যে কষ্ট করা মনে করতাম। মনে হতো আমাদের ভাইরা রক্ত দিয়েছে মায়ের ভাষা রক্ষার জন্যে, আমরা শীতের মাঝে খালি পায়ে ফুল দিচ্ছি, এ তাদের প্রাপ্য। অদ্ভুত এক শিহরণ ভালবাসা অনুভব করতাম। না দেখা জীবন দানকারী সেই ভাইদের জন্যে।
(চলবে)