ঝুঁকিপূর্ণ ভাঙনেও ক্লোজার নির্মাণে ধীরগতি

বিশ্বজিত রায়, জামালগঞ্জ
হাওররক্ষা বাঁধের কাজে মন্থরগতি পরিলক্ষিত হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ ভাঙনেও ঢিমেতালে চলছে বাঁধের কাজ। কাবিটা নীতিমালা অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের প্রায় দেড় মাস পর বাঁধের কাজ শুরু হয়েছে এবার। কোন কোন বাঁধে মাটির কাজ ৩০-৪০ ভাগে পৌঁছলেও এমন বাঁধ আছে যেখানে পড়েনি এক ছটাক মাটিও। পিআইসির দায়িত্বশীলদেরও বাঁধে পাওয়া যাচ্ছে না। কোন বাঁধেই কমপেকশনসহ আনুষাঙ্গিক কাজে হাত দেওয়া হয়নি। হালি, শনি ও মহালিয়া হাওরের ২৬টি পিআইসির প্রায় ২০টি বাঁধ ঘুরে এমন বাস্তবতা দেখেছেন গণমাধ্যম কর্মীরা। এতে করে যথাসময়ে কাজ শেষ না হওয়ার ব্যাপারে শংকা প্রকাশ করছেন হাওরপাড়ের কৃষক ও হাওর সচেতন মানুষেরা।
হাওররক্ষা বাঁধ ঘুরে দেখা যায়, হালি হাওরের বদরপুর সংলগ্ন ৪১ নম্বর পিআইসির বাঁধে নামমাত্র মাটি ফেলা শুরু হয়েছে। পরবর্তী ৪০ নম্বর পিআইসির ঘনিয়ার বিলের ভাঙায় কাজ চলমান থাকলেও এর বিপরীত পাড়ের শনির হাওরের (১৯ নম্বর পিআইসি) নান্টুখালী ক্লোজারে তড়িগড়ি হালকা মাটি ফেলে দ্রুত কাজের ধারাবাহিকতার জানান দেওয়া হচ্ছে। বাস্তবে এটি একটি ঝুঁকিপূর্ণ ভাঙন। ৩৯ নম্বর পিআইসির হাওড়িয়া আলীপুরের শেষ মাথার ভাঙনটি ভরাট করা সম্ভব হলেও অবশিষ্ট সকল কাজ এখনও বাকি আছে। হাওড়িয়া আলীপুরের অপর পাড়ের শনির হাওরের (২০নং পিআইসি) সবচেয়ে বিপজ্জনক ক্লোজার হিসেবে পরিচিত লালুর গোয়ালা প্রায় অক্ষত থাকলেও তার শেষ ভাগে ছোটখাটো যে ভাঙন আছে তাতে এখনও মাটি ফেলাই শেষ হয়নি। এই কাজ স্বল্প সময়ে শেষ হওয়ার কোন আলামতও চোখে পড়েনি।
অপরদিকে এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত (মঙ্গলবার বিকালে) হালির হাওরের সবচেয়ে বড় ভাঙন (৩৮নম্বর পিআইসি) মামুদপুরের ভাঙার কাজও সন্তোষজনক পর্যায়ে পৌঁছেনি। হাওরের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ এই ভাঙনসহ এই বাঁধের সম্পূর্ণ কাজ ২০ ভাগও এগোয়নি। বাঁধে পাওয়া যায়নি সংশ্লিষ্ট পিআইসির সভাপতিকে। এই বাঁধে নির্দেশিকা বোর্ড দেখতে না পেয়ে দায়িত্বরত একজনকে প্রশ্ন করা হলে তিনি অন্যত্র পড়ে থাকা বোর্ড দেখিয়ে দেন। বাঁধ রক্ষা কাজের সংশ্লিষ্ট ওই ব্যক্তি কয়েকদিনের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা জানালেও বাঁধের পাশে বসে থাকা মামুদপুর গ্রামের জনৈক ব্যক্তি জানিয়েছেন, আগামী ২০-২৫ দিনেও এর কাজ শেষ হবে না।
এছাড়া ৩৭ নম্বর পিআইসির কাজে এখনও হাত দেওয়া হয়নি। অপর পারের মহালিয়া হাওরের ৪টি (২১, ২২, ২৩ ও ২৪ নম্বর) পিআইসির মধ্যে ২টিতে কাজ শুরু হয়েছে। বাকি ২টি বাঁধে কাজ এখনও শুরু হয়নি। মদনাকান্দি থেকে শুরু হওয়া ৩৬ নম্বর পিআইসির কাজের অগ্রগতি ভাল হলেও এর পরের আছানপুর ছোঁয়া ৩৫ নম্বর পিআইসির বাঁধে একটি ভাঙন থাকা সত্বেও সেখানে পড়েনি একমুঠো মাটি। অন্যদিকে আছানপুর থেকে সুন্দরপুরের কালীবাড়ি বাঁধ অর্থাৎ ৩২, ৩৩ ও ৩৪ নম্বর পিআইসির কাজ প্রায় ৩০ ভাগ হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
হাওররক্ষা বাঁধ কাজের এমন মন্থর গতিতে দুশ্চিন্তায় কৃষকরা। তারা দ্রুত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার তাগিদ দিয়ে জানিয়েছেন, গেল ৩ বছর বন্যা হয়নি। এই বছর আগাম বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। তাই যথাসময়ে কাজ শেষ করতে না পারলে বিপদ হতে পারে।
জামালগঞ্জ উপজেলা হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি শাহানা আল আজাদ বলেন, হালির হাওরের দুইটা পিআইসিতে মোটামোটি ভালো কাজ হয়েছে। আর বাকিসব পিআইসির কাজে তেমন অগ্রগতি নেই। অনেক কাজ এখনও বাকি রয়ে গেছে।
একই দিনে বাঁধে যাওয়া জামালগঞ্জের সাচনা বাজার ইউনিয়নের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান নূরুল হক আফিন্দী বলেন, আমরা হালির হাওরের ৬-৭টা বাঁধ ঘুরে দেখেছি। এসব বাঁধে কাজ কেবল শুরু হয়েছে। তবে যেভাবে হওয়ার কথা সেভাবে হচ্ছে না। আমার ধারণা ১০ ভাগ কাজ হয়েছে। কাজ যতটুকু হয়েছে, তাতে দুর্বল কাজই মনে হচ্ছে।
জামালগঞ্জ উপজেলা হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক অঞ্জন পুরকায়স্থ জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত হাওরে যে কাজ হয়েছে তা গত বছরের তুলনায় কম। গেল বছরে এ সময়ে প্রায় ২০ ভাগ কাজ বাকি ছিল, কিন্তু এই বছর মাত্র ২০ ভাগ কাজ হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হবে কিনা এই নিয়ে কৃষকসহ সকলেই হতাশায় ভোগছেন। কারণ চলতি বছরে আগাম বন্যা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অল্প সময়ের মধ্যে বাঁধের কাজ শেষ করার দাবি জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ওয়ার্কঅর্ডার বিলম্বসহ অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর বাঁধে মেশিন কম। যার কারণে কাজ দেরী হচ্ছে। এছাড়া বাঁধে গিয়ে সংশ্লিষ্ট পিআইসিদেরও পাওয়া যাচ্ছে না। তারা এই কাজটাকে তেমন পাত্তা দিতে চাইছে না। দ্রুত কাজ সম্পন্নে পিআইসিদের বাঁধমুখী করতে প্রশাসনকে আরও তৎপর হতে হবে।
এ ব্যাপারে জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও কাবিটা প্রকল্প বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটির সভাপতি বিশ্বজিত দেব বলেন, আমাদের শর্তটা এই রকম- যখন যে নির্দেশনা দেওয়া হবে সে অনুযায়ী কাজ করতে হবে। ফেব্রুয়ারির ২০ তারিখের মধ্যে মাটির কাজ শেষ করার নির্দেশনা দেওয়া আছে। এ সময়ের মধ্যে যারা মাটির কাজ শেষ করতে পারবে না তাদের বিরুদ্ধে আমরা অ্যাকশনে যাব। আর ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে বাকি যে কাজ থাকবে তা যথাসম্ভব শেষ করার চেষ্টা করা হবে।
হাওররক্ষা বাঁধের এই চিত্র কেবল জামালগঞ্জ বা তাহিরপুর উপজেলায় নয়। অন্যান্য উপজেলার হাওরেও একই চিত্র।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী সবিবুর রহমান বললেন, আমাদের পর্যবেক্ষণে মাটির কাজ গড় হিসাবে ৪০-৪৫ ভাগ হয়েছে। সব কয়টি উপজেলার হাওররক্ষা বাঁধ বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটি আগামী ১৫ থেকে ২৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে মাটির কাজ শেষ করার আশ^াস দিয়েছেন। সেই আশ^াস অনুযায়ী কাজ শেষ না হলে যেসব পিআইসি কাজ করতে পারবে না। তাদেরকে বাতিল করে বিকল্প পন্থায় কাজ আদায় করা হবে। এইবার বেশি বৃষ্টিরও আশঙ্কা আছে। সুতরাং হাওররক্ষা বাঁধ নির্মাণে অবহেলা করার কোন সুযোগ নেই।