‘ছয় কুড়ি বিল, নয় কুড়ি কান্দা, টাংগুয়ায় সবার জীবন বান্ধা।
মিল্যা মিশ্যা রাইখ্যা খাইতাম, খাইয়া-পইরা সবে মিল্যা বাঁচতাম।
এই প্রবচন টাংগুয়ার হাওরের বিস্তৃতি এবং এর উপর নির্ভরশীল মানুষের জীবন জীবিকা ও সংস্কৃতির পরিচয় বহন করে। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সুনামগঞ্জ জেলায় অবস্থিত টাংগুয়ার হাওর স্বাদু পানির এক সুবিশাল জলাভূমি। বিভিন্ন আয়তনের ছোট বড় ১০৪ টি বিল নিয়ে টাংগুয়ার হাওড় গঠিত। তাদের মধ্যে ৫২ টি বিল উল্লেখযোগ্য। বর্ষা মৌসুমে হাওরটি ১৪০০০ হেক্টরের বেশী আয়তন ধারণ করলেও শুকনো মৌসুমে পানি থাকে প্রায় ৯৭২৭ হেক্টর এলাকায়। টাংগুয়ার হাওরের চারপাশ দিয়ে বেশ কয়েকটি নদী যেমন জাদুকাটা, পাটলাই, বৌলাই ও ঘাসি নদী প্রবাহিত হয়েছে। মেঘালয়ের পাহার থেকে অনেকগুলো ছড়া এ হাওরে এসে পড়েছে। হাওরের ভিতরে অনেকগুলো খাল বা নালা বিলগুলোকে জালের ন্যায় সংযুক্ত করে রেখেছে। তাহিরপুর ও ধর্মপাশা উপজেলার চারটি ইউনিয়ন জুড়ে বিস্তৃত এ হাওরের চারপাশের বিভিন্ন ধর্ম, গোত্র ও সংস্কৃতির প্রায় ৬০,০০০ মানুষ বাস করে। ৭৫% অধিক পরিবার টাংগুয়ার হাওরের প্রাকৃতিক সম্পদের উপর নির্ভরশীল।
স্বাদু পানির অন্যতম জলাভুমি জীববৈচিত্র্যের দিক থেকে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। দেশের অন্যতম একটি মাতৃ মৎস্য ভান্ডার (মাদার ফিসারী) হিসেবে পরিচিত টাংগুয়ার হাওরের সম্পদের মধ্যে মাছ প্রধান অর্থকরী সম্পদ বিবেচিত হলেও হিজল, করচ, নলখাগড়াসহ জলাভূমি উদ্ভিদ, বৃক্ষ, দেশী-বিদেশী পাখি, শামুক, ঝিনুক, কাঁকড়া, সাপ, ব্যাঙ, কাছিম, ইত্যাদিসহ মাটি, পানি সবই এ হাওরের জীববৈচিত্র্যসহ প্রতিবেশগত বৈশিষ্ট্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। এখানে ১৪১ প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়, এদের মধ্যে ৫৫ টি প্রজাতি সারা বাংলাদেশে সংকটাপন্ন অবস্থায় পৌঁছে গেছে, ১৭ টি প্রজাতি শুধুমাত্র টাঙ্গুয়ার হাওরেই পাওয়া যায়। তাছাড়া ১১ প্রজাতির উভচর প্রাণী, ২০৮ প্রজাতির পাখি যাদের মধ্যে ৯২ এর অধিক জলচর পরিযায়ী পাখি, ৬ প্রজাতির কচ্ছপ যাদের প্রতিটিই বাংলাদেশে ও বিশ্বে সংকটাপন্ন, ২১ প্রজাতির সাপ, ৭ প্রজাতির টিকটিকি ও ১৯ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী পাওয়া যায়। বাংলাদেশের ২০১ টি বিপন্নপ্রায় প্রাণীর মধ্যে ৮৪ টি প্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়স্থল এ টাংগুয়ার হাওর। প্রতি বছর ৩০,০০০-৪০,০০০ মাঝে মাঝে ৫০,০০০ সংখ্যক বিভিন্ন প্রজাতির পরিযায়ী পাখি টাংগুয়ার হাওরে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বাস করে। এসব পাখি হাওরের প্রতিবেশগত অবস্থার ভারসাম্য রক্ষায় বিশেষ ভূমিকা রাখে। টাংগুয়ার হাওরের বিলগুলোর অন্তঃসংযোগের ফলে বিলের সাথে বিলের, খালের সাথে বিলের, পাহাড়ী ছড়ার সাথে খালের, নদীর সাথে বিলের নিরবচ্ছিন্ন জলপ্রবাহ বিরাজ করার কারণে এখানকার বিল ও কান্দাগুলো জলজ ও স্থলজ প্রাণীজগতের একটি আদর্শ আবাসস্থল হিসেবে গড়ে উঠেছে। এ ধরনের বৈশিষ্ট্য টাংগুয়ার হাওরকে দেশে ও বহির্বিশ্বে প্রসিদ্ধ করেছে।
দৃষ্টি নন্দন টাংগুয়ার হাওর জলাভুমি প্রতিবেশ ব্যবস্থার এক অনন্য উদাহরণ। প্রাকৃতিক সম্পদের আধার এ হাওরটি ১৯৩০ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত লীজ ব্যবস্থাপনায় ছিল। এ কারণে হাওরের মৎস্য ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ অপরিকল্পিতভাবে আহরণের ফলে টাংগুয়ার হাওরের প্রতিবেশগত অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। ইজারাদারী প্রথায় হাওরের প্রাকৃতিক সম্পদের উপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর কোন ধরনের প্রবেশাধিকার ছিল না। দীর্ঘদিনের বঞ্চনার কারণে ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে হাওড় পাড়ের মানুষ মাছ ব্যতীত অন্যান্য সম্পদ নির্বিচারে আহরণ করতো। ফলে দেশের অন্যতম এ প্রাকৃতিক জলাভূমির জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য এবং হাওড়ের প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ, প্রতিবেশ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার, প্রতিবেশগত মান উন্নয়ন, পরিবেশ দুষণ নিয়ন্ত্রণ ও টেকসই প্রতিবেশ ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ১৯ এপ্রিল ১৯৯৯ সালে টাংগুয়ার হাওরের ৯৭২৭ (নয় হাজার সাত শত সাতাশ) হেক্টর এলাকাকে ‘‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা” (Ecologically Critical Area-ECA) হিসেবে ঘোষণা করে। অন্যদিকে, হাওড়টি (ক) জলাভূমি বন প্রতিবেশ, (খ) জলচর পাখির গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক আবাসস্থল, (গ) মাতৃ মৎস্য ভান্ডার ও প্রজনন ক্ষেত্র এবং ঘ) অস্তিত্ব সংকটাপন্ন পাখি, মাছ, প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসস্থল হওয়ার ফলে রামসার সেক্রেটারিয়েট ২০ জানুয়ারি, ২০০০ সালে এ হাওরকে বাংলাদেশের ২য় এবং পৃথিবীর ১০৩১তম রামসার সাইট হিসাবে ঘোষণা করে। আন্তর্জাতিক পরিসরে এ ধরনের সুপরিচিতি টাংগুয়ার হাওরের প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং প্রতিবেশ ব্যবস্থা রক্ষণাবেক্ষণের গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
এ প্রেক্ষাপটে সরকার ২০০১ সালে টাংগুয়ার হাওড়ে লীজ প্রথা বাতিল করে। ১০ বছর করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নবায়ন শর্তে ২০০১ খ্রিস্টাব্দে টাংগুয়ার হাওরের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ভূমি মন্ত্রণালয় হতে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের ওপর ন্যস্ত হয়। পরবর্তীতে ২০০৪ খ্রি, সালের টাংগুয়ার হাওড়ের মালিকানা ভূমি মন্ত্রণালয়ে রেখে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়কে ‘‘হাওড়ের উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবহার” নিশ্চিতকরণের জন্য ব্যবস্থাপনাসহ সর্বপ্রকার অধিকার প্রদান করা হয়।
তৎপ্রেক্ষিতে, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের ১৩/১০/২০০৩ খ্রি. তারিখের নির্দেশে ০৯/১১/২০০৩খ্রি. তারিখ থেকে টাংগুয়ার হাওরের স্থানীয় পর্যায়ের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব জেলা প্রশাসন সুনামগঞ্জ এর উপর ন্যস্ত হয়। জেলা প্রশাসনের দৃঢ় প্রচেষ্টায় পূর্বের ইজারাদার, স্থানীয় স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী ও অবৈধ দখলদারদের কবল থেকে হাওরটি মুক্ত হয় এবং ২০০৬ সালের নভেম্বর পর্যন্ত জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে টাংগুয়ার হাওরের ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
তবে, জেলা প্রশাসন কর্তৃক শুধুমাত্র টাংগুয়ার হাওরের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় গৃহীত কার্যক্রম একটি সাময়িক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি হিসেবে পরিলক্ষিত হয়। তদুপরি পর্যাপ্ত জনবল, অর্থ ও কারিগরী দিক থেকে ঘাটতি দেখা দেয়ায় হাওরের টেকসই ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে একটি দীর্ঘ মেয়াদী ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। তৎপ্রেক্ষিতে, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় চিরাচরিত লীজ পদ্ধতি থেকে সরে এসে দাতা সংস্থা এসডিসির আর্থিক এবং আইইউসিএন বাংলাদেশ এর কারিগরী সহায়তায় ২০০৬ সালের ডিসেম্বর মাসে রামসার নীতিমালার আলোকে Community Based Sustainable Management of Tanguar Haor (CBSMTH, শীর্ষক একটি প্রকল্প গ্রহণ করে।
রামসার সাইট হিসেবে টাংগুয়ার হাওরের টেকসই ব্যবস্থাপনার জন্য একটি সহ-ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি গড়ে তুলে এর প্রতিবেশগত মূল্য ও গুরুত্ব অক্ষুণœ রাখার পাশাপাশি টাংগুয়ার হাওড়ের তীরবর্তী জনগোষ্ঠীর জীবিকা উন্নয়নের সুদৃঢ় ভিত্তি তৈরি করার লক্ষ্য নিয়ে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় আইইউসিএন বাংলাদেশ-এর কারিগরী সহায়তায় ২০০৬ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে প্রকল্প কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে আসছে। প্রকল্পের মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রম বাস্তবায়নে HELVETAS Swiss Intercooperation, CNRS I ERA আইইউসিএন এর সহযোগী সংস্থা হিসেবে কাজ করেছে। প্রকল্পটির ৩য় পর্যায়ের কার্যক্রম আগামী অগাস্ট ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে সমাপ্ত হবে।
হাওরের সম্পদের অবৈধ আহরণ রোধ ও আইন শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য কমিউনিটির আর্থিক সহায়তায় ২৮ সদস্য বিশিষ্ট কমিউনিটি গার্ড হাওরের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় সার্বক্ষণিকভাবে কাজ করছে। অপরদিকে জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে ১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নেতৃত্বে ১০ জন পুলিশ, ২৪ জন আনসার সদস্য টাংগুয়ার হাওরের প্রাকৃতিক সম্পদের অবৈধ আহরণ রোধ ও আইন শৃঙ্খলা বজায় রাখার রক্ষার জন্য সার্বক্ষণিকভাবে টহল কাজ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছে।
প্রকল্পের কার্যক্রম বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নীতি নির্ধারণী ভূমিকা পালনের জন্য জাতীয় পর্যায়ে সচিব, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় এর নেতৃত্বে ২১ সদস্যবিশিষ্ট একটি প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটি এবং স্থানীয় পর্যায়ে ব্যবস্থাপনার জন্য জেলা প্রশাসক, সুনামগঞ্জ এর নেতৃত্বে ২৮ সদস্যবিশিষ্ট একটি টাংগুয়ার হাওর ব্যবস্থাপনা কমিটি (টিএইচএমসি) কাজ করছে। এ ছাড়া, মাঠ পর্যায়ে স্থানীয় কমিউনিটি সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত ৭৪টি গ্রাম সমাজভিত্তিক কমিটি, ৪টি ইউনিয়ন সমাজভিত্তিক কমিটি এবং ১টি কেন্দ্রীয় সমাজভিত্তিক কমিটি প্রকল্পের কার্যক্রম বাস্তবায়নে নিয়মিতভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
টাংগুয়ার হাওরের উপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীকে সংগঠিত করে আত্মকর্মসংস্থান ও বিকল্প আয়ের উৎস সৃষ্টির মাধ্যমে হাওরের প্রাকৃতিক সম্পদের উপর তাদের নির্ভরশীলতা হ্রাসসহ টাংগুয়ার হাওরে একটি কার্যকর সহ-ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রকল্পের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। প্রকল্প লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনে প্রতিবেশ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার, সংরক্ষণ ও উন্নয়ন; পাখি, মৎস্য ও বনজ সম্পদ সমীক্ষা; প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ ও সুবিবেচনাপূর্ণ আহরণ/ব্যবহার নীতিমালা প্রণয়ন; বদ্ধ মৌসুম পালন; হাওরের নাব্যতা বজায় রাখা; মৎস্য, পাখি, বন্যপ্রাণীর আাবাসস্থল পুনুরুদ্ধার ও সংরক্ষণ; মৎস্য ও পাখির অভয়াশ্রম ঘোষণা ও রক্ষণাবেক্ষণ; মৎস্য, পাখি, বন্যপ্রাণীর প্রজনন স্থল সংরক্ষণ; মৎস্য সম্পদের আবাসস্থল পুনরুদ্ধার, উন্নয়ন ও সংরক্ষণ, মজুদ বৃদ্ধির জন্য প্রাকৃতিক পোনা অবমুক্তকরণ, বাঁশ ও কাঠা স্থাপন; বৃক্ষসহ জলাভূমির উদ্ভিদের সমৃদ্ধির উদ্দেশ্যে কান্দা পুনরুদ্ধার, সংরক্ষণ ও বৃক্ষ রোপণ; বিরল প্রজাতি সংরক্ষণের জন্য কৃত্রিম বাসা তৈরি; ফসল রক্ষা বাঁধ মেরামত; প্রতিবেশ সম্মত উপায়ে বসতভিটা সম্প্রসারণ; বদ্ধ মৌসুমে ভিজিএফ বরাদ্দ; অনুমোদিত পদ্ধতির আলোকে মৎস্য আহরণের জন্য দরিদ্র মৎস্যজীবীদেরকে পারমিট প্রদান; বিকল্প কর্ম সংস্থান সৃষ্টি ও সহায়তা প্রদান; উচ্চ ফলনশীল জাতের ধান ও সব্জি চাষ সম্প্রসারণ; সামাজিক তহবিল ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে আসছে। তবে, দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অপেক্ষাকৃত অনুন্নত, যোগাযোগ বিছিন্ন ও দুর্গম হাওর এলাকায় এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন বেশ দুরহ কাজ। এতদ্সত্ত্বেও, টাংগুয়ার হাওরের প্রাকৃতিক সম্পদ সুরক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, প্রতিবেশগত অবস্থা পুনরুদ্ধার ও উন্নয়ন ও নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর দক্ষতা বৃদ্ধি ও জীবনমান উন্নয়নের ক্ষেত্রে এ পর্যন্ত দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে।
হাওরের প্রাকৃতিক সম্পদ সুরক্ষা, জীবিৈবচিত্র্য সংরক্ষণ ও প্রতিবেশ ব্যবস্থা অটুট রক্ষার লক্ষ্যে সমগ্র হাওরকে কোর জোন ও বাফার জোনে বিভক্ত করা হয়েছে। ‘মাছ ধরা নিষিদ্ধ এলাকা’ এর সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে। মৎস্য আহরণ থেকে বিরত রাখার জন্য বদ্ধ মৌসুম (বৈশাখ, জৈষ্ঠ্য, আষাঢ় মাস) নির্ধারণ ও পালন করা হয়েছে। আহরিত মৎস্য সম্পদ বন্টন নীতিমালা (মৎস্যজীবী:৪০%, সংগঠন:৩৬%, সরকার:২৪%) জারী করা হয়েছে। বনজ সম্পদ আয় বন্টন নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। ৪টি বিল অর্থাৎ রুপাভূই, রৌয়া, বালুয়ার ডোবা, তেকুইন্যা বিল ও ১টি নদীর অংশবিশেষ অর্থাৎ আলমের দুয়ারকে মৎস্য অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হয়েছে। লেচ্চামারা এবং হাতিরগাতা ও বেরবেরিয়া বিলের অংশবিশেষকে পাখির জন্য অভয়ারণ্য হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে। অভয়াশ্রমসহ মোট ১৬ টি বিলের গভীর ২২টি স্থানে নিয়মিতভাবে কাঠা-বাঁশ স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে। বিরল প্রজাতি প্যালাসাস ইগল সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে ২টি কৃত্রিম বাসা তৈরি করা হয়েছে। হাওরে মৎস্য প্রজাতির মজুদ বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে প্রাকৃতিক উৎস থেকে সংগৃহীত মাছের পোনা অবমুক্ত করা হয়েছে। ৪.৬ হেক্টর কান্দায় হিজল ও করচের চারা ও নল রোপণ করা হয়েছে। ৮৫ হেক্টর কান্দা পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ করা হয়েছে। প্রাকৃতিক মৎস্য সম্পদের উপর নির্ভরশীল ৭৪টি গ্রামের ৫০০০ পরিবারের ৭০০০জনের বেশী সদস্য ৭৪টি গ্রাম সংগঠন তৈরির মাধ্যমে সংগঠিত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় সকলেই গরীব এবং হত দরিদ্র। সদস্যদের নিজেদের উদ্যোগে সামাজিক তহবিল সংগ্রহ এবং সদস্যদের আর্থিক সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। সামাজিক তহবিল ব্যবস্থাপনা ও জীবনমান উন্নয়ন পরিকল্পনার আওতায় পরিবারগুলো আর্থিক সহায়তা পেয়ে তাদের পারিবারিক আয় বৃদ্ধি করেছে। কৃষক উচ্চ ফলনশীল জাতের ধান বীজ ব্যবহার করে ফসল উৎপাদন করছে। প্রতিবেশ সম্মত বসতভিটা সম্প্রসারণ কার্যক্রমের আওতায় ঝুকিপূর্ণ পরিবারগুলো বসতভিটা ভাঙ্গন থেকে রক্ষা পেয়েছে। নেত্বৃত্ব উন্নয়ন প্রশিক্ষণ গ্রহণের ফলে কমিউনিটি নেতৃবৃন্দের সাংগঠনিক উন্নয়নে দক্ষতা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্ন আয়বৃদ্ধিমূলক কর্মকান্ড, উচ্চ ফলনশীল ধান চাষ, ইকোটুরিজম, ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষণ পেয়ে কমিউনিটি সদস্যগণের সক্ষমতা ও পারিবারিক আয় বৃদ্ধি পেয়েছে।
টাংগুয়ার হাওর সমাজভিত্তিক টেকসই সহ-ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি প্রতিষ্ঠার কাজ আমাদের মতো জনবহুল তবে সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদের দেশের জন্য একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। টাংগুয়ার হাওরের উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ বা নিয়ন্ত্রণ হারানোর বিষয়টি একটি মুখ্য নিয়ামক হিসেবে দেখা দিয়েছে। ফলে হাওর পাড়ের মানুষের মধ্যে এখনও টাংগুয়ার হাওর নিয়ে আস্থাহীনতা বিরাজ করছে। এ কারণে টাংগুয়ার হাওর ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সফলতাগুলোর প্রভাব কাঙ্খিত পর্যায়ে পরিমাপ করা যাচ্ছে না। এছাড়া, টাংগুয়ার হাওর এলাকার দরিদ্র ও হতদরিদ্র জনগণের হাওরের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর অত্যধিক মাত্রায় নির্ভরশীলতা, দারিদ্র পীড়িত মানুষের মাছ চুরির প্রবণতা, মাছ চুরিতে প্রভাবশালী গোষ্ঠির সহায়তা ও ইন্ধন, স্বার্থান্বেষী মহলের ক্রমাগত বিরোধিতা (বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রকাশ, প্রভাব বিস্তার) ও আর্থ-সামাাজক উন্নয়ন কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয়হীনতা টাংগুয়ার হাওর সহ-ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে অন্যতম নিয়ামক হিসেবে দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশের মতো জনবহুল একটি দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশে প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম বাস্তবায়ন সব সময়ই চ্যালেঞ্জিং ও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর নানাবিধ অপপ্রচার ও বাঁধা বিপত্তি মোকাবেলা করে টাংগুয়ার হাওরের প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, প্রতিবেশগত অবস্থা পুনরুদ্ধার ও উন্নয়ন ও নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর দক্ষতা বৃদ্ধি ও জীবনমান উন্নয়নের ক্ষেত্রে এ পর্যন্ত দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জিত হলেও টাংগুয়ার হাওরের টেকসই ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে কাঙ্খিত পর্যায়ের দক্ষতা ও সক্ষমতা অর্জনের জন্য অধিকতর সহযোগিতা প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের মতে অনুশীলনাধীন এ ধরনের সহ-ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি বাস্তবায়ন করে অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয়। তাই স্থানীয় জনগোষ্ঠী, স্থানীয় সরকার ও প্রশাসনের আন্তরিক সহযোগিতাসহ যুগপৎ প্রচেষ্টার ওপর টাংগুয়ার হাওরের প্রতিবেশগত বৈশিষ্ট্য বজায়, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং টেকসই ব্যবস্থাপনায় অনুসৃত সহ-ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির স্থায়ীত্বশীলতা নির্ভর করছে। জেলা প্রশাসনের পাশাপাশি টাংগুয়ার হাওর এলাকার জনগণ, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট সকল সরকারী বেসরকারী অংশীজনের ঐকান্তিক প্রচেষ্টাই টাংগুয়ার হাওর সহ-ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিকে জলাভূমি প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনায় একটি উজ্জল দৃষ্টান্ত হিসেবে দেশে ও বিদেশে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হবে।
মো: ওয়াহিদুজ্জামান
উন্নয়ন কর্মী


