বিন্দু তালুকদার
টানা বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ী ঢলে গত সম্প্রতি দোয়ারাবাজার উপজেলার সীমান্তের খাসিয়ামারা নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে ২০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছিল। এছাড়া একই এলাকার রাবার ড্যামের দুই দিকের এপ্রোচ ও সড়ক ভেঙে ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে। সুরমা ইউনিয়নের বক্তারপুর গ্রামের কাছে বেড়িবাঁধ ও রাবার ড্যামের এপ্রোচ ভেঙে উপজেলার সুরমা ইউনিয়নের আমন বীজতলা ও চাষাবাদকৃত বর্ষাকালীন সবজি পানিতে তলিয়ে গিয়ে ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে।
বন্যার পানি নেমে গেছে। পানির নিচ থেকে ভেসে উঠেছে ভাঙাচুরা রাস্তাঘাট ও ফসলী জমি। স্থানীয় কৃষকরা জানিয়েছেন বন্যার সবচেয়ে বেশী ক্ষতি হয়েছে ফসলী জমির। শত শত কৃষককের ফসলী (আমন) জমি পাহাড়ি ঢলের পানির সাথে আসা বালুতে ভরাট হয়ে গিয়েছে। ধানের জমি বালু ভরাট হয়ে এমন অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে যা আগামী কয়েক বছরেও চাষাবাদ করা সম্ভব হবে না।
কৃষকরা জানান, জমিতে যেভাবে উঁচু হয়ে বালু ভরাট হয়েছে কোনভাবেই এত বালু সরানো সম্ভব নয়। আর বালু না সরালে চাষাবাদ করা যাবে না। এসব জমি এখন বছরের পর পর বছর অনাবাদী থাকবে। জমি থাকার পরও চাষাবাদ না করতে পারলে কৃষকদের পরিবারে অভাব-অনটন দেখা দিবে।
গত বছরের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত রাবারড্যাম প্রকল্প ও খাসিয়ামারা নদীর বেড়িবাঁধ কোটি টাকা ব্যয়ে সংস্কার করা হলেও এবার আবার এই বেড়িবাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয়েছে সীমান্তের গ্রামগুলো।
দোয়ারাবাজার উপজেলার সুরমা ইউনিয়ন পরিষদের ৬ নং ওয়ার্ডের সদস্য টিলাগাঁও রাবারড্যাম এলাকার বাসিন্দা নুরুল ইসলাম বলেন,‘পাহাড়ি ঢলে ঠিলাগাঁও মারপসি গ্রামের শত শত কৃষকের প্রায় ৩০০ কেদার (১০০ একর) জমিতে বালু ভরাট হয়েছে। এসব জমির বালু না সরিয়ে আর ধান চাষ করা সম্ভব হবে না। যেসব জমিতে বালু ভরাট হয়নি চারার অভাবে সেগুলোও চাষাবাদ করা সম্ভব হচ্ছে না। এলাকার কৃষকরা চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন।’
এদিকে তাহিরপুর সীমান্তবর্তী মেঘালয় পাহাড়ের বিভিন্ন ছড়া দিয়ে ভারতীয় বালু এসে এলাকার অর্ধশতাধিক গ্রামের ফসলী জমি বালুতে ভরাট হয়েছে। সীমান্তবর্তী কড়ইগড়া গ্রাম থেকে বীরেন্দ্রনগর পর্যন্ত প্রায় অর্ধশতাধিক গ্রামের জমিতে বালু পড়ে জমির উর্বরতা নষ্ট হয়েছে। পাহাড়ী ছড়া দিয়ে বালু আসায় কয়েক হাজার হেক্টর আয়তনের ছোট বড় বেশ কয়েকটি হাওর বালুর স্তুপ পড়ে প্রায় মরুভূমিতে পরিণত হওয়ার উপক্রম দেখা দিয়েছে।
কলাগাঁও এলাকার জঙ্গলবাড়ী গ্রামের আইনুল মড়ল ও রফিকুল ইসলাম জানান,‘ভারী বৃষ্টিপাত হলেই মেঘালয়ের পাহাড়ী ছড়া দিয়ে পানির সাথে বালু আর ছোট বড় পাথর আসে।’ তারা আরো জানান, ২০০৭ সালে বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে বালু ও পাথর আসা প্রথম শুরু হয়েছিল।
চাঁনপুর গ্রামের আনোয়ার হোসেন বলেন,‘এভাবে পাহাড়ী ছড়া দিয়ে মেঘালয় পাহাড় থেকে বালু আসতে থাকলে কিছুদিনের ভিতরেই সীমান্ত এলাকার সব জমি বালুতে ভরাট হয়ে দেশের মানচিত্র পাল্টে যেতে পারে।’
উত্তর বড়দল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবুল কাসেম বলেন,‘২০০৭ সালের পর ৯ বছর বর্ষায় পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে ধারাবাহিক ভাবে বালু ও পাথর আসা অব্যাহত থাকার কারণ নির্ণয় করতে না পেরে সীমান্তবাসীর ফসলী জমি রক্ষা করা এখন কঠিন হয়ে পরেছে। ইতিমধ্যে অনেকেই ঘরবাড়ী সীমান্ত এলাকা থেকে অন্যত্র নিয়ে গেছেন।
তাহিরপুর সীমান্ত এলাকার বালু ভরাট হয়ে ফসলী জমি নষ্ট হচ্ছে উপজেলার উত্তর বড়দল ইউনিয়নের চাঁনপুর, টিলাপাড়া, নয়াছড়া, পাহাড়তলী, কড়ইগড়া ও রজনীলাইন গ্রাম। বাগলী গ্রামের আলী হোসেন জানান,‘পাহাড়ী ছড়া দিয়ে ঢলের সঙ্গে অধিক বালু ও পাথর এসে ফসলী জমি বিনষ্ট হচ্ছে।’
তাহিরপুর উপজেলা কৃষি অফিসার মো. আব্দুস সালাম বলেন,‘সীমান্তে বালু ভরাট একটা বিরাট সমস্যা। এখানে অনেক আগ থেকেই বালু ভরাট হচ্ছে। গত বছল পর্যন্ত ৩৫০ হেক্টর জমি বালুতে চাপা পড়েছিল। এবার নতুন করে আরো ২০ হেক্টর জমি বালু ভরাট হয়েছে। বালু ভরাটের সমস্যাটি প্রকৃতিগত হওয়ায় এটা রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে কৃষকদের জমি ধ্বংস হচ্ছে। ধান চাষের উপযোগী থাকছে না। তবে কৃষকরা ইচ্ছে করলে অন্যান্য ফসল চাষ করতে পারেন।’
দোয়ারাবাজার উপজেলা কৃষি অফিসের উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা সোহরাব হোসেন জানান, বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোর রোপা আমন ৪৫০ হেক্টর, আমনের বীজতলা ৩২০ হেক্টর, আউশ ৩৬০ হেক্টর ও ১৫০ হেক্টর সবজি আক্রান্ত হয়েছিল। পানি সরে যাওয়ায় মোট ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে ১৫০ হেক্টর জমি।
দোয়ারাবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন,‘বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও মৎস্য চাষীদের তালিকা প্রণয়নের কাজ চলছে। তালিকা তৈরি হয়ে যাওয়ার পর আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেব। যেসব কৃষকদের বীজতলা তলিয়ে গিয়ে নষ্ট হয়েছে তাদেরকে পূনর্বাসনের লক্ষ্যে উপজেলা কৃষি অফিস থেকে বীজ সরবরাহ করা হচ্ছে। যাদের বীজের প্রয়োজন তারা সেখান থেকে বীজ নিতে পারবেন। ’
দোয়ারাবাজার উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ইদ্রিস আলী বীর প্রতীক বলেন,‘পাহাড়ি ঢল সুরমা ইউনিয়নের কিছু গ্রামে ফসলী জমিতে সামান্য পরিমাণে বালু ভরাট হয়েছে। যা কৃষকরা নিজেরা ব্যক্তি উদ্যোগেই সরাতে পারবেন। কারো জমিতে যদি বেশী পরিমাণ বালু ভরাট হয় সেক্ষেত্রে আমরা কোন প্রকল্পের মাধ্যমে সরানোর উদ্যোগ নেব। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা যদি আমাদের কাছে সহায়তার জন্য আবেদন করেন আমরা তা বিবেচন করে দেখব।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক মো. জাহেদুল হক বলেন,‘পাহাড়ি ঢলে বালু ভরাট হয়ে সবচেয়ে বেশী জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাহিরপুর সীমান্তে। এছাড়া দোয়ারাবাজার উপজেলায় এবার কিছু জমিতে সামান্য বালু ভরাট হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ক্ষয়-ক্ষতির হিসাব নিরুপণের কাজ চলছে। এসব ক্ষয়-ক্ষতির প্রতিবেদন আমরা ঢাকা পাঠাবো। এছাড়া বন্যার পানিতে যেসব এলাকার আমন জমি ও বীজতলা নষ্ট হয়েছে সেই এলাকার কৃষকদের বীজ সরবরাহ করা হবে।’
- কুশিয়ারায় রানীগঞ্জ সেতু সওজের সাথে ঠিকাদারের চুক্তি সম্পাদন
- টাংগুয়ার হাওরের টেকসই ব্যবস্থাপনা: সহ-ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি ও বর্তমান প্রেক্ষাপট


