স্থানীয় সরকার পরিষদগুলোর দুর্বলতা, অদক্ষতা ও দুর্নীতির সুযোগে তাদের ক্ষমতা খর্ব করার সর্বশেষ একটি দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে জেলার টাঙুয়ার হাওরের বৃক্ষরোপন কর্মসূচীতে। প্রকাশিত সংবাদের তথ্য অনুসারে, উন্নয়ন সহযোগী ইউএনডিপি লজিক প্রকল্পের আওতায় গত ৩ বছর ধরে টাঙুয়ার হাওরের ভবানীপুরের পাটিচুড়া কান্দায় জলজ বৃক্ষ হিজল ও করচ গাছ লাগানোর একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করে আসছিল। সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ এই প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিল। প্রতি বছর এই কাজে ১০ লক্ষ টাকা ব্যয় করা হত। কিন্তু বাস্তবে সে সব জায়গায় রোপিত হিজল ও করচের পরিমাণ খুবই কম। যে কারণে ইউনিয়ন পরিষদের হাত থেকে ওই প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব সরিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে। নতুন করে এই দায়িত্ব দেয়া হয়েছে সিএনআরএস নামক একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে। কোন প্রকল্পের দায়িত্ব থেকে একটি স্থানীয় সরকার প্রতেষ্ঠানকে বিরত করে ফেলা ওই প্রতিষ্ঠানটির অকর্মন্যতার পরিচয় বহন করে। বলা বাহুল্য বছর বছর টাকা নিয়েও যারা হাওরে বৃক্ষ রোপন করেনি তারা এই দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত নয় বলেই প্রতীয়মান হয়। আমাদের প্রশ্ন সেই জায়গায় নয়। বরং যে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে এই দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তারা ২০০৭ থেকে ২০১৮ সন পর্যন্ত টাঙুয়ার হাওরের জীববৈচিত্র ও পরিবেশ রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল। তাদের ব্যবস্থাপনার সময়েই টাঙুয়ার সর্বনাশ ঘটেছে সবচাইতে বেশি। এ নিয়ে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়েও বেশ অসন্তোষ রয়েছে। অবশ্য টাঙুয়ার সর্বনাশের জন্য সরকারি ব্যবস্থাপনায় এর পাহারাদারির ব্যর্থতাও বড় দায়ী। এরকম ব্যর্থ একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে পুনর্বার কোন্ বিবেচনায় একই হাওরের বৃক্ষ রোপনের দায়িত্ব দেয়া হল, সেই প্রশ্ন উঠা অবান্তর নয়।
স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালীকরণ এবং স্থানীয় উন্নয়ন কর্মকা- এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাস্তবায়নের একটি জোরালো দাবি রয়েছে। বস্তুত একটি গণতান্ত্রিক কাঠামোয় এমন অবস্থাই বাঞ্ছনীয়। যেকোন বিবেচনায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে উন্নয়ন কাজের বাস্তবায়ন উত্তম হয়। কিন্তু আমাদের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের যোগ্যতা কোথায় নামিয়ে এনেছে টাঙুয়ার হাওরের দায়িত্ব থেকে একটি ইউনিয়ন পরিষদকে সরিয়ে নেয়া তার বড় উদাহরণ। এই প্রতিষ্ঠানগুলো এখন ক্ষমতাচর্চার পাশাপাশি চরম দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে উঠেছে। উন্নয়ন বরাদ্দের টাকা থেকে নয়-ছয় করাই যেন তাদের প্রধান কাজ। সরকারি সুবিধাদি প্রদানের ক্ষেত্রে সুবিধাভোগী বাছাই, তালিকা প্রণয়ন এবং ইউনিয়ন পরিষদ কর্তৃক জনগণকে প্রদেয় সেবা-সুবিধাদি প্রদানের ক্ষেত্রেও তাদের বিরুদ্ধে এন্তার অভিযোগ রয়েছে। এরকম দুর্নীতিপ্রবণ একটি প্রতিষ্ঠান কীভাবে উন্নয়ন কর্মকা-ে নেতৃত্ব দিতে পারে? তাঁদের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে এইসব জায়গায় দায়িত্ব নেয়ার জন্য বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সরকারের বিভিন্ন স্তরে প্রভাব বিস্তার ও অবশেষে সফলতা দেখাতে সমর্থ হয়।
জাতীয়ভাবে আমরা দাতাসংস্থার প্রভাবমুক্ত হয়ে সাবলম্বী হওয়ার চেষ্টায় নিয়োজিত আছি। দাতাসংস্থা উদ্দেশ্য ছাড়া কেবল মানবিক মহানুভবতা নিয়ে কখনও কোন দেশে সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করে না। দেশের অভ্যন্তরে এদের হয়ে কাজ করে অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। উভয়ের উদ্দেশ্য একই লক্ষাভিমুখী। এই লক্ষের সাথে জাতীয় উন্নয়নের জন্য সরকারের নির্ধারিত লক্ষের মধ্যে ফারাক থাকবে। সরকারের দায়িত্বশীলদের কথাবার্তার মধ্যেও এমন বিবেচনাবোধ উঠে আসে। এই জায়গায় প্রধান কাজ ছিল, জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা ও স্বচ্ছতা বাড়ানো। কিন্তু দুর্ভগ্যের বিষয় হলÑ এই কাজটি হচ্ছে না বরং এইসব প্রতিষ্ঠানের উল্টোযাত্রা ঘটছে বলে আমরা দেখতে পাই।
আমরা মনে করি টাঙুয়ার হাওরের একটি এলাকায় বৃক্ষরোপনের দায়িত্ব থেকে ইউনিয়ন পরিষদকে সরিয়ে দেয়ার মাধ্যমে নয় বরং তাদের অকর্মন্যতার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে এইসব প্রতিষ্ঠানকে যোগ্য করে তোলাই সরকারের উদ্দেশ্য হওয়া উচিৎ। এর পরিবর্তে ৩ বছরের দুর্নীতিকে নরম দৃষ্টিতে দেখার মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো ভবিষ্যতে আরও অকার্যকর হয়ে উঠবে।

