স্টাফ রিপোর্টার
ব্লো-আউটের প্রায় ১৬ বছর, টেংরাটিলা গ্যাসফিল্ডের আশপাশের এলাকাজুড়ে গ্যাস উদগীরণ কিছুটা কমেছে। তবে পানিবাহিত রোগসহ গ্যাসফিল্ডের আশপাশের গ্রামে আর্সেনিকে আক্রান্ত হয়েছেন অনেকে। কানাডীয় কোম্পানি নাইকোর সঙ্গে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা চলমান থাকায় গ্যাসফিল্ড থেকে রাষ্ট্রীয়ভাবে গ্যাস উত্তোলনের উদ্যোগ নেই। এ কারণে জাতীয় সম্পদের সুরক্ষা হচ্ছে না। বিপন্ন পরিবেশের প্রভাব পড়ছে স্থানীয়দের ওপর। এলাকাবাসী গ্যাসফিল্ড বিস্ফোরণের কারণে নিজেদের ক্ষতিপূরণ যেমন চান, রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুরক্ষাও প্রত্যাশা করেন।
২০০৫ সালের ৭ জানুয়ারি রাতে টেংরাটিলা গ্যাসফিল্ডে প্রথম দুর্ঘটনা ঘটে। দ্বিতীয় দফা বিস্ফোরণ হয় একই বছরের ২৪ জুন। প্রথম দফায় বিস্ফোরণের সময় আগুনের তাপে রাতেই গ্যাসফিল্ডের প্রোডাকশন কূপের রিং ভেঙে আগুন ২০০ থেকে ৩০০ ফুট ওঠানামা করে। পরে এক মাসেরও বেশি সময় জ্বলার পর আপনা-আপনিই নেভে যায় আগুন। আগুনে ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে আতঙ্ক ছড়ায়। কূপ এলাকার তিন কিলোমিটার দূরেও ভূকম্পন অনুভূত হয়। দুই দফা অগ্নিকা-ে আশপাশের টেংরাটিলা, আজবপুর, গিরিশনগর, কৈয়াজুরি, টেংরাবাজার এবং শান্তিপুরের মানুষের ঘরবাড়ি, গাছগাছালি ও হাওরের ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিস্ম্ফোরণের পর থেকে এক দিনের জন্যও ওই এলাকায় বুদ্বুদ করে গ্যাস ওঠা বন্ধ হয়নি। অবশ্য গত প্রায় এক বছর হয় গ্যাস উদগীরণ কিছুটা কমেছে।
বিশুদ্ধ পানির সংকট এখনও লেগেই আছে। ভূগর্ভের পানিতেও আর্সেনিক। এ কারণে রোগ-বালাই এখানে লেগেই আছে। বিশেষ করে আর্সেনিকে আক্তান্তের সংখ্যা এখানে প্রতি মাসেই বাড়ছে। টেংরাটিলা গ্যাসফিল্ডের পাশের গ্রাম গিরিশনগরেই রয়েছেন ১৫ জন আর্সেনিক আক্রান্ত নারী-পুরুষ। এ ছাড়া আজবপুর, টেংরাটিলা, শান্তিপুর ও কৈয়াজুরি এলাকায় আরও অনেকেই আর্সেনিক আক্রান্তের শিকার।
টেংরাটিলার বাসিন্দা সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ফয়জুর রহমান বলেন, গ্যাসফিল্ড এলাকার আশপাশের সব টিউবওয়েলের পানিতে আর্সেনিক। ভূগর্ভের ওপরের পানিতে বুদ্বুদ করে গ্যাস এখনও উঠছে, তবে আগের চাইতে গ্যাস উদগীরণ কিছুটা কমায় আতঙ্ক কমেছে।
টেংরাটিলা গ্যাসফিল্ডে একসময় গণসংযোগ কর্মকর্তার কাজ করতেন গ্রামের এখলাস ফরায়েজী। তিনি জানান, আর্সেনিক আক্রান্ত হওয়ায় ৫ মাস আগে তার ভাই মোখলেছ ফরায়েজীর হাত কেটে ফেলতে হয়েছে। পাশের গিরিশনগর গ্রামের আর্সেনিক আক্রান্ত গিয়াস উদ্দিন ও মনির মিয়ার অবস্থাও ভালো নেই বলে জানান তিনি।
এখলাছ ফরায়েজী বলেন, গিরিশপুরসহ আশপাশের গ্রামের পুরোনো সব টিউবওয়েলে আর্সেনিক অতিমাত্রায়। নতুন টিউবওয়েলে আর্সেনিক ধরা পড়েছে। এখন অনেকে বাড়িতে কূপ খনন করে সেখানকার পানি নিজ উদ্যোগে বিশুদ্ধ করে তা পান করছেন।
টেংরাটিলা গ্যাসফিল্ডে কর্মরত নাইকোর রক্ষণাবেক্ষণ কর্মকর্তা পলাশ কান্তি বড়ূয়া জানান, ওখানে ৮ জন নিরাপত্তা কর্মী এবং তিনি ছাড়া আর কেউ নেই। আমি একজন সাধারণ কর্মচারী, তাই কোনো ধরনের মন্তব্য করা ঠিক হবে না। তবে গ্যাসফিল্ডের আশপাশে উদগীরণ কমেছে জানিয়ে তিনি বলেন, গ্যাসক্ষেত্রটি নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা চলছে।
দোয়ারাবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোনিয়া সুলতানা বলেন, আগে ওখানে বাসাবাড়িতে বুদ্বুদ আকারে বের হওয়া গ্যাস ব্যবহার হতো। এখন গ্যাসের চাপ কমায় এমন ব্যবহার নেই। গ্যাসক্ষেত্র নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে বাংলাদেশের পক্ষে একটি রায় হয়েছে শুনেছি। নতুন কোনো তথ্য আমাদের জানানো হয়নি।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল কাশেম বলেন, আর্সেনিক ঝুঁকি প্রকল্পের আওতায় টেংরাটিলায় স্কিনিং কার্যক্রম আগামী মাসে শুরু হবে। প্রতিটি পানির উৎস পরীক্ষা করে চিহ্নিত করা হবে। নতুন বিশুদ্ধ পানিরও ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে।


