বিন্দু তালুকদার
তাহিরপুর উপজেলায় ডুবন্ত কাঁচা পাকা বিভিন্ন সড়ক দিয়ে যাতায়াতে লোকজনকে বিভিন্ন স্থানে টোল দিতে হয়। তবে টোল আদায়ের স্থলে কোন সাইনবোর্ড নেই। নেই টোল আদায়কারী ও ইজারা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের নাম। দীর্ঘদিন ধরেই সাধারণ মানুষ দাবি করে আসছিলেন, শুকনো সময়ের ৪ মাস হাওরের ডুবন্ত সড়কের বিভিন্ন স্থানে পা ফেলতে টোল নেওয়া বন্ধ করা। কিন্তু দরিদ্র ও ক্ষমতাহীন হওয়ায় তাদের এ দাবি
কেউ আমলে নিচ্ছে না বলে অভিযোগ হাওরপাড়ের বাসিন্দাদের।
এলাকাবাসীর অভিযোগ চার মাস হাওরপাড়ের বিভিন্ন সড়ক দিয়ে পা ফেলতে বা সাইকেলের চাকা ঘুরাতে বিভিন্ন স্থানে ৫ টাকা থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত টোল দিতে হয়।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোন ধরনের নিয়মের তোয়াক্কা না করে কিছু ইউনিয়ন পরিষদ নিজ প্রতিষ্ঠানে আয়ের কথা বলে এ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, তাহিরপুর উপজেলার দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়নে এ রকম একটি স্থান আলমখালি কালভার্ট। তাহিরপুর উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার উত্তর দিকে এটি অবস্থিত। দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়নের বড়দল গ্রামের সামনে দিয়ে মাটিয়ান হাওরের পূর্ব তীর ঘেঁষে কাউকান্দি পর্যন্ত একটি ডুবন্ত সড়ক রয়েছে। সড়কটির বড়দল ও কাউকান্দি গ্রামের মাঝখানে আলমখালি স্থানে একটি কালভার্ট আছে। কালভার্টের দুই পাশের মাটি নেই গত কয়েক বছর ধরে।
গত কয়েক বছরেও স্থানটিতে মাটি ফেলার কোন উদ্যোগ নেয়নি স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ। তবে এ থেকে টাকা আয়ের সুযোগ হাতছাড়া করেনি ইউনিয়ন পরিষদ। গত ৫ বছর ধরে এ স্থানটিকে খেয়াঘাট বানিয়ে ইজারা দিয়ে যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়ন পরিষদ। এ বছরও ইউনিয়ন পরিষদ একই কাজ করছে। তবে এই খালভার্টটির পূর্বদিকে মাটিয়ান হাওররক্ষা বাঁধ আলমখালিতে ইউনিয়ন পরিষদ সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা ব্যয় করলে লোকজন ও সবধরনের যানবাহন ঝুঁকিমুক্তভাবে চলাচল করতে পারে। কিন্তু এখন উল্টো খালটির সামান্য গর্ত শুকিয়ে গেলে ইজারাদার মাটি তুলে নেয়, যাতে খালটি শুকিয়ে না যায়।
সংশ্লিষ্ট সুত্র জানায়, দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়ন পরিষদ ৯৫ হাজার টাকায় আলমখালি কালভার্টটি ইজারা দিয়েছে। ইজারা নিয়েছেন ইউনিয়নের কাউকান্দি গ্রামের মোজাফর আলীর ছেলে হবিক মিয়া ও মৃত আব্দুর রউফের ছেলে শফিকুল ইসলাম। ইজারাদার কালভার্টটির দুই পাশে বাঁশের চাটাই দিয়েছে লোকজনের যাতায়াতের সুবিধার্থে। কালভার্টের সামনে বাঁশ দিয়ে লোকজন ও যানবাহন থামিয়ে প্রতিদিন টাকা আদায় করছে ইজারাদারের লোকজন। প্রতিদিন এই বাঁশের চাটাই দিয়ে ১শ থেকে ২ শতাধিক মোটরসাইকেল ও কয়েক শতাধিক লোক যাতায়াত করে থাকে। প্রতিটি মোটরসাইকেল প্রতিবার পার হতে ১০ টাকা আর ব্যক্তি পার হতে ৫ টাকা টোল দিতে হয়। তবে স্থানটিতে টোল আদায়ের কোন ধরনের সাইনবোর্ড নেই।
এলাকাবাসী জানিয়েছেন, আলমখালি বাঁেধ সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা খরচ করলে লোকজন ও সবধরণের যানবাহন সহজে চলাচল করতে পারে। কিন্তু টাকার বিনিময়ে ইজারা দিয়ে এখানে বাঁেশর চাটাই দেওয়া হয়েছে। চাটাইয়ের ওপর দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলছে সাধারণ লোকজন ও যানবাহন। ইজারাকৃত কালভার্টটির পূর্বপাশে আলমখালি হাওররক্ষা বাঁধ দিয়ে লোকজন যাতে চলাচল না করতে পারে সেজন্য ইজারাদাররা শুকিয়ে যাওয়া অংশের মাটি সরিয়ে পানি প্রবাহ বাড়িয়ে দেয় ।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদ সদস্য আবুল হোসেন খাঁন এবং উপজেলা বিএনপি সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমিনকে নিজ বাড়ি উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নে যেতে এই কালভার্টে দেওয়া চাটাই পার হয়ে উপজেলা সদর থেকে বাড়ি যেতে হয়। একইভাবে উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ফেরদৌস আলম ও উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান খসরুল আলমকেও নিজ বাড়ি উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নে যেতে এই বাঁেশর চাটাই পারি দেন। উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান কামরুল ও ইউএনওকে এই চাটাই পারি দিতে হয়। কারণ দক্ষিণ বড়দলের একাংশ, উত্তর শ্রীপুর ও শুল্কস্টেশন বড়ছড়া, চারাগাঁও ও বাগলী যেতে এই চাটাই দেওয়া কালভার্ট খেয়া পার হতে হয়।
স্থানীয়রা জানান, প্রভাবশালী নাগরিক ও প্রশাসনের কাউকে এ চাটাই পারি দিতে টাকা দিতে হয় না। তাই এ নিয়ে তাদের কোন মাথা ব্যথা নেই। তবে নিরীহরা এর টোল থেকে রেহাই পান না।
কাউকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শিরীনা আক্তার বলেন,‘আমরা সবাই এই বাঁশের চাটাই পারি দিয়ে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করে থাকি। টাকার জন্য প্রতিদিনই কারো না কারো সাথে দুর্ব্যবহার করে থাকে টাকা আদায়কারি লোকজন।’
এ প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্ট দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়নের বড়দল গ্রামের শিক্ষক ও কলামিস্ট মোছায়েল আহমদ বলেন,‘ইউনিয়নবাসী অনেক স্বপ্ন আর আশা নিয়ে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করেন। তবে অনেক সময়ই ভোটের পর জনগণের স্বপ্ন আর আশা ভেঙ্গে পড়ে। রাগ করে ব্যক্তি পাল্টালেও লুটের সিষ্টেম পাল্টে না।’
উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি রফিকুল ইসলাম ও ছাত্রদল সভাপতি মেহেদী হাসান উজ্জ্বল এ প্রসঙ্গে বলেন,‘ ইউনিয়ন পরিষদেও এখন কোটি টাকার উপরে বাজেট হয়। সে অনুপাতে জনগণের কাঙ্খিত সেবা বাড়েনি। উল্টো হাওরবাসীকে শুকনো সময়ে বিভিন্ন সড়কে হাঁটলে টাকা গুণতে হয়। আলমখালি কালভার্টও এরকম একটি। আমরা জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে ব্যবসা নয়, নাগরিকসেবা নিশ্চিতের দাবি জানাচ্ছি।’
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম সরোয়ার লিটন বলেন,‘হাওরপাড়ের অধিকাংশ বাসিন্দা দরিদ্র। তাই হাওরবাসী যখন নৌকা ছেড়ে রাস্তায় আসেন তখনই রাস্তার বিভিন্ন অংশে পা দিতে অর্থ দিতে হয়।’
উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রুহল আমিন বলেন,‘ আপোষকামী জনপ্রতিনিধি আর আমরা নেতারা সত্য বলতে ভয় পাই বলেই টোলের নামে এখানে এ রকম চাঁদাবাজি চলছে।’
জেলা পরিষদ সদস্য ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল হোসেন খাঁন বলেন,‘বিষয়টি আমার এভাবে নজরে আসেনি। ইউনিয়ন পরিষদ যদি উল্টো জনদুর্ভোগ বাড়ায় তাহলে প্রতিকারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
ভারপ্রাপ্ত ইউএনও মো. রফিকুল ইসলাম বলেন,‘এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।
উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান কামরুল বলেন,‘আজ সোমবার উপজেলা সমন্বয় সভায় বিষয়টি নিয়ে কথা বলে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
কালভার্টের ইজারাদার হবিক নুর বলেন,‘আমরা চেয়ারম্যানের কাছ থেকে ইজারা নিয়েছি। আমরা বাঁধের মাটি সরাই না, কৃষকরা নৌকা চলাচল আর জমিতে পানি নিতে বাঁধের মাটি সরায়।’ তিনি আরও জানান, মুক্তিযোদ্ধা, নেতা, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা টাকা দেয় না। সাধারণ মানুষই পারাপারে টাকা দেয়। পৌষ মাস থেকে লোকজন ও মোটরসাইকেল পারাপারে টাকা নিচ্ছি। ফাল্গুন মাসে বাঁধের কাজ সম্পন্ন হয়ে যাবে। তখন কারো টাকা লাগবে না।
দক্ষিণ বড়দল ইউপি চেয়ারম্যান আজহর আলী বলেন,‘আমি দায়িত্বগ্রহণের আগ থেকেই এই জায়গাটি ইজারা দেয়া হচ্ছে। যেহেতু ইজারা দেয়া হয়েছে, তাই টোল আদায় করা হয়। টোলের নামে চাঁদাবাজির কোন অভিযোগ পাওয়া যায়নি। জায়গাটুকু বেশ গভীর ৫-১০ হাজার টাকায় ভরাট করা সম্ভব নয়, অন্তত লাখ টাকা প্রয়োজন হবে। আমি চেষ্টা করব এই জায়গায় স্থায়ী সড়ক নির্মাণ করতে। ’
- বসন্ত জাগ্রত দ্বারে- ফুলের বনে যার পাশে যাই …
- হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ- দুই মাস পেরিয়ে যাচ্ছে বাঁধের কাজ শুরু হয়নি


