ডা. ধীরেন্দ্র দেব চৌধুরীর প্রয়াণ, চিকিৎসা ক্ষেত্রে সেই সেবাপরায়ণ মনোভাব এখন কোথায়?

ডা. ধীরেন্দ্র দেব চৌধুরী আমেরিকায় প্রয়াত হয়েছেন ২৩ ডিসেম্বর। তাঁর মৃত্যুসংবাদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের বদৌলতে প্রায় সাথে সাথেই সকলে জেনে যান। এই দুঃসংবাদে সুনামগঞ্জবাসী বিশেষভাবে মর্মাহত হয়েছেন। ফেসবুকে অনেকেই ডা. ধীরেন্দ্র দেব চৌধুরীর মুত্যুসংবাদ পোস্ট করে এবং অন্যের পোস্টে মন্তব্য করে নিজেদের আবেগ-অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন। অনেকেই তাঁকে গরিবের চিকিৎসক অভিধা দিয়ে শোক প্রকাশ করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি আমেরিকায় মেয়েদের সাথে বসবাস করে আসছিলেন। সময়ের ব্যবধানেও তাঁর কথা বিস্মৃত হননি সুনামগঞ্জবাসী। মানুষের মনে সকলে জায়গা করে নিতে পারে না। এ জন্য দরকার হয় বিশেষ গুণাবলির। ডা. ধীরেন্দ্র দেব চৌধুরী একজন চিকিৎসক হিসাবে এবং শেষ জীবনে একজন সমাজসেবী হিসাবে যে দায়িত্ব পালন করে গেছেন তাই তাকে মানুষের মনে স্মরণীয় করে রেখেছে। তিনি এমন এক সময় এই শহরে চিকিৎসা পেশা শুরু করেছিলেন যে সময়ে সারা দেশেই চিকিৎসাসেবার সংকট ছিল। চিকিৎসা শাস্ত্রের ততটা আধুনিকায়নও ঘটেনি সেই সময়ে। স্বাধীনতাত্তোর কালের সেই সময়ে তিনি শহরবাসীকে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে গেছেন এবং শহরের ধনি-গরিব নির্বিশেষে সকলের নিকট ভরসার পাত্র হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর সময়ে এখনকার মত ডায়গনস্টিক বা ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা নীরিক্ষার মাধ্যমে রোগ নির্ণয়ের তেমন কোনো ব্যবস্থা ছিল না। চিকিৎসককে রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেই রোগ নির্ণয় ও ব্যবস্থাপত্র দিতে হত। চিকিৎসকের জন্য এ ছিল অনেক কঠিন কাজ। রোগী নিয়ে চিকিৎসককে প্রচুর মাথা খাটাতে হত। ডা. ধীরেন্দ্র দেব চৌধুরী আন্তরিকভাবেই রোগীর সেবা দিয়ে গেছেন। এটি তাঁর পেশা ছিল বটে কিন্তু এজন্য কোনো অসামর্থ্য ব্যক্তি পয়সার অভাবে তাঁর চিকিৎসা পাননি এমন উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যাবে না। প্রসূতি চিকিৎসায় ছিল তাঁর সবিশেষ দক্ষতা। তিনি সাহস করে নিজের সামান্য যন্ত্রপাতি দিয়ে ছোটখাট অপারেশন করে সন্তান প্রসব করাতেও দ্বিধা করতেন না। এই শহরের এমন কোনো বাসা-বাড়ি খোঁজে পাওয়া যাবে না যে বাড়িতে তাঁর সেবার হাত প্রসারিত হয়নি। রাত-বিরোতে খবর পাওয়া মাত্র তিনি ছুটে যেতেন রোগীর বাড়িতে। এই সময়ের অভিজ্ঞতা দিয়ে তাঁর সেই বিশালত্ব বুঝা যাবে না। এইসব বিরল গুণের জন্যই তিনি মানুষের হুদয়ে জায়গা করে নিতে পেরেছিলেন। যে কারণে তাঁর তিরোধানের খবর পেয়ে শত শত মানুষ আজ আবেগে আপ্লুত হয়ে উঠেছেন। এমন সেবাপরায়ণ মহৎপ্রাণ চিকিৎসকের পরিণত বয়সে মৃত্যুতে আমরাও শোকাহত। তাঁর স্মৃতির প্রতি জানাই সশ্রদ্ধ অভিবাদন।
যে সময় যায় সেই সময়ই ভাল যায়, এমন একটি প্রবাদ আছে সমাজে। মানুষ তার অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে সময়ের এই পরিবর্তনের কথা প্রবাদের মাধ্যমে স্থায়ী করে গেছে। সুনামগঞ্জ শহরে ডা. ধীরেন্দ্র দেব কিংবা মরহুম আবুল লেইছ, বিহারী ডাক্তার অথবা ডা. সতীশ চন্দ্র দাস; এই অল্প কয়জন চিকিৎসক যে সেবা দিয়ে গেছেন এখন কি মানুষ সেই পরিমাণ সেবা গ্রহণ করতে পারছেন? অথচ এখন তো চিকিৎসকের অভাব নেই। সরকারি পরিকাঠামোয়ই রয়েছেন অনেক চিকিৎসক। রয়েছে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা। কিন্তু সেই সেবা কই? আসলে সেবার মনোবৃত্তিই লোপ পেয়েছে। সমাজ এগিয়েছে, অর্থনীতির উল্লম্ফন ঘটেছে, চারিদিকে উন্নতির চাকচিক্য; কিন্তু মানুষের মন থেকে যেন একই সাথে উধাও হয়েছে সমাজের জন্য কিছু করার মনোভাব। মনের ভিতরে অন্যের জন্য কিছু না করা বরং সবকিছুই নিজের জন্য করা, এই স্বার্থবাদী চিন্তার প্রসারের ফলেই আজ ডা. ধীরেন্দ্র কিংবা ডা. লেইছ সাহেবদের প্রবাদপ্রতিম সেবার কথা আজ গল্প মনে হয়।
ডা. ধীরেন্দ্র দেব চৌধুরীর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের মাধ্যমে আমরা মূলত মানুষের ভেতরকার সেই মঙ্গলময় দিকটিরই উন্মোচন কামনা করি।