বড় জলমহালে বাড়ছে উত্তেজনা

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জের বড় বড় জলমহালগুলোর উপর প্রভাবশালীদের লোলুপ দৃষ্টি রয়েছে সব সময়। জলমহাল মওসুমে ইজারার বাইরে রেখে প্রভাব খাটিয়ে মাছ ধরা, কিংবা বিরোধকৃত জলমহালে মাছ ধরার ঘটনাও নিয়মিতই ঘটে সুনামগঞ্জে। এ নিয়ে সংঘর্ষ-উত্তেজনাও এই মওসুমে প্রতিদিনের ঘটনা। এবারও কিছু কিছু জলমহাল নিয়ে উত্তেজনা রয়েছে। জেলার বৃহৎ জলমহাল ধর্মপাশার সুনই বিলে এবার পুলিশ ক্যাম্প বসানো হয়েছে। ইজারাদার জলমহালের কিছু কিছু স্থানে সিসি ক্যামেরাও লাগিয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সুনামগঞ্জের ধর্মপাশার বৃহৎ জলমহাল সুনই বিল ৬ বছরের জন্য প্রায় এক কোটি ৮২ লাখ টাকা রাজস্ব দিয়ে ইজারা নিয়েছে সুনই মৎস্যজীবী সমিতি। মধ্যনগরের মৎস্য ব্যবসায়ী সাধন চন্দ্র ভৌমিক মূলত এই সমিতিকে অর্থ সহায়তা দিয়েছেন।
সাধন চন্দ্র ভৌমিক জানালেন, জলমহালটি ১৪২২ বাংলা থেকে সুনই মৎস্যজীবী সমিতি ইজারা নিলেও ওই বছরে স্থানীয় সংসদ সদস্যের ঘনিষ্টজনেরা জোর করেই ভোগ করেছে। বাংলা ১৪২৩, ২৪ ও ১৪২৫ সালে সংসদ সদস্যের মধ্যস্থতায় তাঁর ছোট ভাই ধর্মপাশা উপজেলা পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হোসেন রোকনকে মালিকানায় শরিক করে মৎস্য আহরণ করা হয়। কিন্তু মাছ ধরা ও বিক্রির কোনো হিসাব অন্য শরিকানরা পান নি। এ কারণে আদালতে এফিডেভিট করে সুনই মৎস্যজীবী সমিতি মোজাম্মেল হোসেন রোকনের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করেছে।
এরপর পাহারাদারের উপর প্রতি রাতেই হামলা হয়, প্রতি রাতেই জোর করে মাছ ধরে নিয়ে যায় কিছু লোকজন। সুনই মৎস্যজীবী সমিতির ইজারাদাররা পরে সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবরে লিখিতভাবে জানায়। মৎস্যমন্ত্রী, ভূমিমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে অবহিত করা হয়। এসব মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে খোঁজ খবর নেওয়া হয়।
এক পর্যায়ে ধর্মপাশা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিখিতভাবে জানান, এই জলমহালটি উপজেলা সদর থেকে অনেক দূরে, উপজেলা থেকে ওখানে ম্যাজিস্ট্রেট কিংবা পুলিশ পাঠিয়ে এটি রক্ষা করা কঠিন। এই চিঠি দেবার পর গত ২৪ নভেম্বর ওখানে অস্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি বসানো হয়। এই ফাঁড়িতে ৮ জন পুলিশ সদস্য ১৫ দিন করে পালাক্রমে জেলা সদর থেকে গিয়ে পাহারা দিচ্ছেন। তাতেও শেষ রক্ষা হচ্ছে না। ১৫ দিন আগে এই জলমহালের পুলিশ ক্যাম্প খলাসহ কয়েকটি এলাকায় সিসি ক্যামেরা বসিয়েছে ইজারাদার কর্তৃপক্ষ।
ব্যবসায়ী সাধন চন্দ্র ভৌমিক জানালেন, স্থানীয় সংসদ সদস্যের ঘনিষ্টজনসহ মাছ লুটেরাদের যন্ত্রণায় অতিষ্ট হয়ে মৎস্যমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতায় তারা অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প বসিয়েছেন সুনই জলমহালে। পরে তাতেও সমস্যা হওয়ায় কিছু কিছু স্থানে সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে।
ধর্মপাশা, জামালগঞ্জ ও তাহিরপুরের সীমানার আরেকটি বড় জলমহাল করাইলজান গ্রুফ ফিসারী। হরিপুর মৎস্যজীবী সমিতির নামে প্রায় ৯৪ লাখ টাকায় ইজারা নেওয়া হলেও, এটি নিয়ে উত্তেজনা আছে। হরিপুর মৎস্যজীবী সমিতির পক্ষ থেকে গত এক সপ্তাহে একাধিকবার বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকের কাছে জলমহাল রক্ষায় সহযোগিতা করার জন্য আবেদন করা হয়েছে।
এই জলমহালের পাশপাশি আরেকটি জলমহাল বোয়ালিয়া প্রকাশিত মকসুদপুর দিঘর জলমহাল ৬ বছরের জন্য উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় সরস্বতীপুর মৎস্যজীবী সমিতি’র নামে ইজারা নেওয়া হয়েছিল। ৬ বছরের জন্য জলমহালটি তারা ইজারা নিলেও গত বছর ইজারার টাকা জমা না দিয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে এরা দখল হস্তান্তর করেছে। তবে জলমহালে থাকা কাটা বাঁশ সরায়নি এই সমিতি। এই সুযোগে ধর্মপাশার সেলবরস ইউপি চেয়ারম্যান মো. নূর হোসেনসহ প্রভাবশালীদের সহায়তায় এই জলমহালের মাছ আহরণ করে বিক্রি করছে একটি পক্ষ। স্থানীয় প্রভাবশালীরা এই জলমহালের কিছু বিল ও ডোবা টাকা নিয়ে অন্যদের মাছ ধরার জন্য বুঝিয়ে দিচ্ছে।
সেলবরস ইউপি চেয়ারম্যান মো. নূর হোসেন বললেন, এই জলমহাল সরস্বতীপুর মৎস্যজীবী সমিতির নামে ৬ বছরের ইজারা ছিল। তারা ৫ বছর পর আমাদের দিয়েছে। পরে তারা ইজারা হস্তান্তর করে নেয়। আমরা ওই জলমহালে মাছ ধরি নি। আমি, স্থানীয় সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন সাহেবের ভাই যতন মিয়া ও স্থানীয় আরেক ব্যক্তি আনোয়ার হোসেন এই তিনজন মিলে জলমহাল দখলে রাখি। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এটি ক্যালেন্ডার ভুক্ত হয়। আমরা সরস্বতীপুর রূপসি বাংলা মৎস্যজীবী সমিতি নিকটবর্তী রয়েছি। সুতরাং আমরাই রাজস্ব দেব। অন্য অভিযোগ সত্য নয়।
অভিযোগের প্রেক্ষিতে সম্প্রতি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মোখলেছুর রহমান এই জলমহাল সরেজমিনে ঘুরে দেখেছেন।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মোখলেছুর রহমান জানালেন, সুনই বিলের ইজারাদার ১০-১২ টি অভিযোগ করেছেন। তার পাহারাদারদের প্রভাবশালীরা তাড়িয়ে দেয় এমন কথা অভিযোগে জানানো হয়। জোর করে মাছ ধরে নিয়ে যাওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়। মাননীয় ভূমিমন্ত্রী ও ভূমি সচিব বরাবরেও তারা একই ধরনের অভিযোগ করেন। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওখানে অস্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি বসানোর সুপারিশ করায় সেখানে পুলিশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, বোয়ালিয়া মকসুদপুর দিঘর জলমহাল পরিদর্শনকালে কাউকে মাছ ধরতে দেখা যায় নি। এরপরও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে এই বিষয়ে খোঁজ নিতে বলা হবে।
জেলা সিপিবির সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. এনাম আহমদ বলেন, লুটপাটের কারণেই জলমহালগুলো অশান্ত থাকে। জলমহাল ইজারা দেয়ার যে নীতিমালা তা বাস্তবায়িত না হওয়ায় এই সমস্যা। মূলত জলমহালগুলোকে উন্মুক্ত করে না দিলে এই ধরনের সমস্যা চলতেই থাকবে।
জানতে চাইলে সুনামগঞ্জ-১ (জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা, তাহিরপুর ও মধ্যনগর) আসনের সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন বললেন, সুনই বিলে পুলিশ ক্যাম্প কেন হয়েছে আমি জানি না। আমার আত্মীয়-স্বজন কেউ জলমহালে মাছ ধরতে যায় না। যারা সুনই জলমহাল ইজারা নিয়েছে, তারা জলমহালের পাড়ের মৎস্যজীবীদের সম্পৃক্ত করতে পারে নি। এজন্য কিছুটা সমস্যা হয়েছে। তিনি জানালেন, হাওরাঞ্চলের খাল-বিল-জলমহাল খেটে খাওয়া মানুষদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া প্রয়োজন। এগুলো ইজারা দেওয়ায় কেউ পুলিশ ক্যাম্প বসিয়ে, কোনো কোনো ইজারাদার বন্দুক দিয়ে হাওরপাড়ের বা বিলের পাড়ের মানুষকে তার বাড়ীর পাশের নিজের জমিতেও মাছ ধরতে বাধা দেয়। এগুলো অমানবিক।