ডেসটিনি নামক মালটিলেভেল মার্কেটিং কোম্পানি সংক্রান্ত জটিলতার নিরসন না হওয়ায় এর লক্ষ লক্ষ বিনিয়োগকারী নিজেদের আমানত ফেরৎ পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। গতকাল দৈনিক সমকালে প্রকাশিত সংবাদে ডেসটিনির অর্থ উপদেষ্টা রণজিৎ চক্রবর্তী দাবি করেছেন, ডেসটিনিতে বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগকৃত অর্থের পরিমাণ দেড় হাজার কোটি টাকা। তাঁর মতে গ্রাহকদের এই টাকা ফেরৎ দেওয়ার মতো সক্ষমতা এখনও প্রতিষ্ঠানটির রয়েছে। রণজিৎ চক্রবর্তীর মতে, ডেসটিনির লাগানো যে ৭ লাখ গাছ বড় হয়েছে সেগুলো বিক্রি করলেই বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরৎ দেয়া সম্ভব। ডেসটিনি কর্তৃপক্ষ তাঁদের বন্ধ প্রতিষ্ঠানগুলো চালু করার অনুমতি দানের জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন। ২০০০ সালে শুরু হওয়া এই এমএলএম কোম্পানিটি মাত্র ১০ বছরের ব্যবধানে বিশাল বাণিজ্য-সাম্রাজ্য গঠন করে ফেলে। ২০১২ সালে দুদকের কাছে ধরা পড়ে যে, প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধাররা ব্যাপকভাবে দুর্নীতিতে জড়িয়ে গেছেন। বিনিয়োগকারীদের অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে। চার হাজার ১১৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ এবং ৯৬ কোটি টাকা বিদেশ পাচারের অভিযোগ এনে প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ ৫১ ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুদক মামলা দায়ের করে। এর পর থেকে প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণ সরকার গ্রহণ করে। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নেমে আসে হতাশার কালো মেঘ। সমকালে প্রকাশিত সংবাদে বিনিয়োগকারীদের আমানতের যে পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে প্রকৃত বাস্তবতার সাথে এর মিল কিংবা অমিল কতটুকু তা জানা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ সরকার ডেসটিনির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিলেও দেশব্যাপী বিস্তৃত এমএলএম নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কত টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে তা নির্ধারণের জন্য কোন সরকারি কমিশন গঠনের খবর আমাদের জানা নেই। তবে রণজিৎ চক্রবর্তীর দাবিকৃত অর্থের চাইতে এর পরিমাণ বেশি হওয়ারই কথা। ্একটি প্রতিষ্ঠান দৃশ্যমান কোন ব্যবসা ছাড়া ১০ বছরের মাথায় কীভাবে বিশাল অর্থের মালিক বনে যায় আবার সেই টাকা নানা কায়দাকানুন করে আত্মসাৎ কিংবা পাচার হয়ে যায় তা অর্থনীতির আগ্রাসী ও লুটেরা চরিত্রের পরিচায়ক। সরকার সময়মতো বিষয়টির উপর হাত দিয়েছিলেন বলে আরও লক্ষ লক্ষ মানুষ হয়তো নিশ্চিত লোকসানের হাত থেকে বেঁচে গেছেন। তবে আসল কথা হলো যেহেতু প্রতিষ্ঠানটির সম্পদ রয়েছে তাই সরকারের উচিৎ কাজ হলো বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরৎ প্রদানের ব্যবস্থা করা। সারা দেশে একটি শক্তিশালী কমিশনের মাধ্যমে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় এই কাজটি সমাধান করতে হবে।
তথাকথিত মালটিলেভেল মার্কেটিং ব্যবস্থাটি একটি অসাড় ও ভাওতাবাজি ছাড়া আর কিছু হতে পারে না। যে প্রলোভন দেখিয়ে এমএলএম কোম্পানিগুলি জনগণের নিকট থেকে টাকা সংগ্রহ করেছে, কোন বৈধ ব্যবসার মাধ্যমে এই পরিমাণ মুনাফা দেওয়া সম্ভব নয়। আর মালটিলেভেলে গ্রাহক সংখ্যার জ্যামিতিক প্রসারণের বিষয়টি আরেক ধান্দাবাজি। কথার মায়াজালে নিম্নমধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের লোভের আগুনে পুড়িয়ে মারার ফাঁদ ভিন্ন একে আর কিছু মনে করার অবকাশ নেই। কিন্তু সমকালে সংবাদ প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ডেসটিনির নানা পর্যায়ের পক্ষসমূহ ব্যাপক প্রচারণা শুরু করেছেন এবং ডেসটিনিকে মুক্ত করে দেওয়ার জন্য তারা দাবি তুলেছেন। এই দাবি জানানোর সময় তারা উত্থাপিত অভিযোগসমূহের যেমন কোন জবাব দিচ্ছেন না তেমনি মালটিলেভেলের মাধ্যমে বিনিয়োগের কয়েক গুণ মুনাফা প্রদানের রহস্যের বিষয়েও চুপ রয়েছেন। এই প্রচারণাকারীরা ডেসটিনির সাধারণ বিনিয়োগকারী নন বলেই আমাদের প্রতীতি।
সরকারের প্রতি আমাদের আহ্বান ডেসটিনির দুর্নীতির বিচার আইনমাফিক চলুক। কিন্তু সাধারণ মানুষ যারা কষ্টার্জিত সঞ্চয় হারিয়ে এখন চোখে অন্ধকার দেখছেন তাদের বিনিয়োগ ফেরৎ দানের জন্য অবিলম্বে উদ্যোগ নিতে সরকারের প্রতি আমরা আহ্বান জানাই।

