ঢেউয়ে ভাঙা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ৩২ বছরেও নির্মিত হয় নি

বিশেষ প্রতিনিধি ও আমিনুল ইসলাম
তাহিরপুর উপজেলা সদরে একজন মোটর সাইকেল চালককে প-ুব কীভাবে যেতে হয় জিঞ্জেস করতেই বললেন, ‘দক্ষিণ শ্রীপুরের প-ুব, ভাইরে ভাই ইখানো নিয়ত কইরা যাওন লাগে’। নিয়ত কেন করতে হবে, জিঞ্জেস করতেই চালকের উত্তর ‘ইখানো যাওনতো অসাধ্য সাধন’। কথা প্রসঙ্গে এই এলাকার মানুষ স্বাস্থ্যসেবা কীভাবে পায়, জানার চেষ্টা করলে কয়েকজন একসঙ্গে বলে ওঠলেন, ‘৩২ বছর আগে (১৯৮৮ সালের বন্যার সময়) আফালের ঢেউয়ে ভাঙছিল দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র, অখনো (এখনো) ইটা (এটি) ইলাখানঔ আছে (সেভাবেই আছে), ইখানের রোগীতো হেমন্ত কালও (হেমন্তর সময়) চাঙায় (পলো দিয়ে বা বাঁশ দিয়ে বিশেষ ব্যবস্থায় কাঁধে করে নেওয়া) নাইলে নাওয়ে (নৌকায়), বাইরা কালও (বর্ষার সময়) হাওরে আফাল থাকলে মরার সময় গণা লাগে (মৃত্যুর সময় গুনতে হয়)।’
দক্ষিণ শ্রীপুর যাবার পথে তাহিরপুর উপজেলা সদরের সুমন রায়ের চায়ের স্টলে বসা এলাকার স্থানীয় লোকজন এভাবেই মন্তব্য করছিলেন।
দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের ৬০টি গ্রামকে ঘিরে রেখেছে হাওরাঞ্চলের বৃহৎ শনি, টাঙ্গুয়া, গুরমা, মহালিয়া ও মাটিয়ান হাওর। ইউনিয়নের ৫০ হাজার মানুষকে তাহিরপুর উপজেলা সদরে আসতে বছরের ৬ মাস আট কিলোমিটার নৌকায়। তিনমাস ‘না নায়- না পায়ে’ অবস্থায় চলতে হয়। বাকি তিন মাস দুই নদীর খেওয়ায় পাড় হয়ে মোটর সাইকেলে যাতায়াত। ইউনিয়নের একাংশের বাসিন্দা উপজেলা সদরে জরুরি কাজ ছাড়া আসেন না। এই অংশের লোকজন ১৫ কিলোমিটার দূরের জামালগঞ্জ উপজেলা সদরে জরুরি চিকিৎসার জন্য যাতায়াত করেন। গ্রাম থেকে নয় কিলেমিটার নৌকায় এবং ছয় কিলোমিটার ইজিবাইকে যাতায়াত করতে হয় জামালগঞ্জে।
ইউনিয়নের প-ুব দ্বিজেন্দ্র কুমার নি¤œ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সভাপতি দীপক তালুকদার বললেন, এতো প্রত্যন্ত এলাকা সুনামগঞ্জে আর নেই। বাংলাদেশেও কোথাও এই অবস্থা আছে কী না, আমার জানা নেই। আমরা একটি নি¤œ মাধ্যমিক বিদ্যালয় করেছি, বর্ষায় বহুদিন এই বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীই আসতে পারে না। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া হলে এই ইউনিয়নের এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামেই কেউ আসতে সাহস করে না। মুমূর্ষ রোগীকে উপজেলা সদরে নিয়ে যেতে আবহাওয়া ভালো হওয়া এবং মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া এই দুইয়ের জন্য সময় গুনতে হয়। রোগী বহনের বাহন এখানে হয় নৌকায় না হয় চাঙায়।
দিঘেন্দ্র কুমার নি¤œ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক রাজ কুমার তালুকদার বললেন, বাঁচলে পড়াশুনার চিন্তা, এখানে মানুষ আগে বাঁচার লড়াই করেন। প্রকৃতির সঙ্গে রীতিমত যুদ্ধ করে বেঁচে থাকা এখানে। এই যুদ্ধে একসময় কিছুটা সাহস যোগাতো এখানকার স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রটি। ১৯৮৮ সালের বন্যার সময় আফালের তা-বে স্বাস্থ্য পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের ভবনের নীচের মাটির সরে গিয়ে ঘরটি ভেঙে পড়েছে। ৩২ বছর পরেও এটি মেরামত বা সংস্কার হয় নি। তিনি বললেন, স্বাস্থ্য চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়ন সকল এলাকায়ই এগুতে থাকে, এখানে ঠিক উল্টো।
দক্ষিণ শ্রীপুর কমিউনিটি ক্লিনিকের দায়িত্বে থাকা স্বাস্থ্যকর্মী তৌহিদুর ইসলাম বললেন, কমিউনিটি ক্লিনিকে প্রাথমিক চিকিৎসা কেবল দেওয়া হয়, এটি এখানকার লোকজন বুঝতে নারাজ। যেহেতু অন্য কোন চিকিৎসার ব্যবস্থা এখানে নেই, সবাই অসুখ বিসুখ হলে এখানেই ভিড় করেন। আমরা বুঝিয়ে দেই যে এটি প্রাথমিক চিকিৎসা কেন্দ্র। আমাদের কাজ কাউন্সিলিং আর জটিল হলে রেফার্ডের পরামর্শ দেওয়া। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রটি চালু হওয়া জরুরি বলে মন্তব্য করেন এই কর্মচারীও।
পরিবার কল্যাণ কর্মী বিউটি রানী তালুকদার বললেন, যাতায়াত অসুবিধার কারণে এখানকার সন্তান সম্ভাবা মায়েরা গ্রামীণধাত্রীর উপরই বেশি ভরসা করেন। এলাকার প্রায় সকলেই এখানকার স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রটি চালু হবার স্বপ্ন দেখেন।
দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মিয়া হোসেন বললেন, দক্ষিণ শ্রীপুরের বেশির ভাগ এলাকার বাসিন্দা চিকিৎসা বলতে কবিরাজের কাছে যাওয়াই বুঝেন। অন্য বিকল্প নেই বললেই কবিরাজে ভরসা মানুষের।
দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আলী আহমদ মুরাদ বললেন, দেশের অন্য যে কোন স্থানের চেয়ে আমার ইউনিয়নে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র হওয়া জরুরি। ৩২ বছর আগে ছিল, এখন নেই। দেশের সকল স্থানেই নতুন নতুন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান হয়েছে। অথচ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন আমার ইউনিয়নের মানুষ সেবা বঞ্চিত হচ্ছে।
তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন বললেন, দুই বছর হয় আমি তাহিরপুরে এসেছি। সংশ্লিষ্টরা আমাকে জানিয়েছেন, তিন বছর আগে উপজেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভায় এই ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রটি পুননির্মাণ করার প্রস্তাব পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। সেই অনুযায়ী স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে প্রস্তাব গেছে। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ খোঁজ খবর নিয়েছেন। এখনো এটি নির্মাণের দরপত্র কিংবা অন্য কোন অগ্রগতি হয়েছে বলে জানা নেই আমার।
জেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের উপ-পরিচালক বিকাশ কুমার দাস বললেন, আমি এখানে নতুন এসেছি। এই স্বাস্থ্য কেন্দ্রটির দরপত্র হবে শুনতেছি, এখনো হয় নি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই স্বাস্থ্যকেন্দ্র সহ জেলার ধর্মপাশার উত্তর বংশিকুন্ডা, দক্ষিণ বংশিকুন্ডা ও রাজাপুর দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ, ভাটিপাড়া এবং শাল্লার আটগাঁও স্বাস্থ্য কেন্দ্রের ভবনও ব্যবহার অনুপযোগী। এসব এলাকা জেলার অপেক্ষাকৃত প্রত্যন্ত ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতের জন্য হাসপাতালগুলো পুননির্মাণ জরুরি।
স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সুনামগঞ্জের সহকারি প্রকৌশলী প্রদীপ কুমার শীল বললেন, এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রসহ বন্যা ও নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত জেলার ক্ষতিগ্রস্ত সাতটি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র পুননির্মাণের জন্য চাহিদা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট পাঠানো হয়েছে। আশা করছি এগুলো শীঘ্রই দরপত্র প্রক্রিয়ায় যাবে।