তথ্য লুকিয়ে পাঠাগার প্রতিষ্ঠা সরকারি বরাদ্দ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা

ধর্মপাশা প্রতিনিধি
কাগজেপত্রে পাঠাগারগুলো অনেক পুরনো। কিন্তু বাস্তব প্রেক্ষাপট ভিন্ন। পাঠাগারগুলোর প্রতিষ্ঠাতার দাবি কাজের সুবিধার্থে প্রতিষ্ঠা সাল আগে দেখানো হয়েছে। ফলে সরকারি খাতায় এসব পাঠাগার ‘ক’ শ্রেণির অন্তর্ভূক্ত হয়েছে। যদিও এসব পাঠাগার নামসর্বস্ব। যত্রযত্র সাইনবোর্ড, ঘরের শয়নকক্ষ এমনকি গোয়াল ঘরে এলোমেলোভাবে বইপত্র রেখে দেখানো হচ্ছে পাঠাগারের কার্যক্রম। কে কোন পাঠাগারের সভাপতি-সম্পাদক তা নিয়েও অস্পস্ট বক্তব্য প্রতিষ্ঠাতার। এমনই এক প্রতিষ্ঠাতার নাম নিক্সন তালুকদার। তিনি পাঠাগার সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য জানার জন্য এ প্রতিবেদকে জেলা গণগ্রন্থাগারে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। তবে নিক্সন তালুকদার তার নিজ বাড়ি ধর্মপাশা উপজেলার চামরদানি ইউনিয়নের কাহালা গ্রামে কাহালা জনকল্যাণ পাঠাগারটি ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত বলে জানিয়েছেন। এছাড়াও তিনি ধর্মপাশার বংশীকুন্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নের ঘাসী গ্রামে তার বড় বোন রিনা তালুকদার ও মধ্যনগর ইউনিয়নের জমশেরপুর গ্রামে তার (নিক্সন) ফুফাতো ভাই উদ্দ্যেশ সরকারের বসতঘরে পৃথক দুটি নামসর্বস্ব পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করেছেন।
ঘাসী গ্রামে কাব্য প্রজ্ঞাপারমিতা তালুকদার জনকল্যাণ পাঠাগার ও জমশেরপুর গ্রামে নিক্সন তালুকদার জনকল্যাণ পাঠাগার ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে বলে সুনামগঞ্জ জেলা গণগ্রন্থাগারে তথ্য সরবরাহ করা হয়েছে। যা জেলা গণগ্রন্থাগারের জুনিয়র গ্রন্থাগারিক নিশ্চিত করেছেন। যা বাস্তবের সাথে সাংঘর্ষিক। অথচ উদ্দ্যেশ সরকারের ছেলে সাগর সরকার জানিয়েছেন, তাদের বাড়িতে ৫/৭ বছর ধরে পাঠাগারের কার্যক্রম চলছে। তবে এ ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্যের জন্য নিক্সন তালুকদারের সাথে যোগাযোগ করতে হবে বলে জানায় সাগর। অপরদিকে ঘাসী গ্রামে রিনা তালুকদারের বাড়িতে যে পাঠাগারের কার্যক্রম দেখানো হয়েছে তাও কয়েক বছর ধরে নামে মাত্র চলছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। ঘাসী গ্রামের বয়োজ্যোষ্ট ব্যক্তি অনীল সরকার জানান, রিনা তালুকাদরের বাড়ির বসতভিটাই নির্মাণ করা হয়েছে ১০/১২ বছর আগে।
সোমবার সকালে সরেজমিন রিনা তালুকদারের বাড়িতে গিয়ে শুধু ঘরের বারান্দায় পাঠাগারের একটি সাইনবোর্ড ঝুলতে দেখা যায়। কোনো চেয়ার, টেবিল বা আসবাবপত্র দেখা যায়নি। এ পাঠাগারের সভাপতি রিনা তালুকদার ও তার স্বামী অজয় তালুকদারকেও বাড়িতে পাওয়া যায়নি। এ সময় সে ঘরে বসবাসকারী অজয় তালুকদারের আত্মীয় সুপ্রভা তালুকদার জানান, ঘরের ভেতরে কিছু বই রয়েছে। সুপ্রভার কথা অনুযায়ী ঘরের ভেতরে শয়নকক্ষের এক কোণে একটি ছোট নড়বড়ে সেল্ফে কিছু পড়ে পড়ে থাকতে দেখা যায়।
ওইদিন দুপুরে নিক্সন তালুকদারের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, একটি গোয়াল ঘরে কাহালা জনকল্যাণ পাঠাগারের সাইনবোর্ড ঝুলছে। পাঠাগারের কার্যক্রম কার্যক্রম তার (নিক্সন) বসত ও একটি গোয়াল ঘরে পরিচালিত হচ্ছে। গোয়াল ঘরের অর্ধেক অংশে গরু রাখার স্থান ও অপর অংশে নোংরা পরিবেশে কিছু বই ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফেলে রাখা হয়েছে। এ পাঠাগারের সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য ২০১৯-২০ অর্থ বছরে বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে ১ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। এছাড়াও কোনো পাঠাগারেই বই ও পাঠক সংখ্যার কোনো তথ্য, রেজিষ্টার খাতা পাওয়া যায়নি।
এদিকে ২০২০-২১ অর্থ বছরে সুনামগঞ্জে ১০টি বেসরকারি পাঠাগারে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বেসরকারি গ্রন্থাগারে অনুদান প্রদান সংক্রান্ত ‘অন্যান্য অনুদান’ খাত থেকে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে। এর মধ্যে ধর্মপাশার কাব্য প্রজ্ঞাপারমিতা তালুকদার জনকল্যাণ পাঠাগার, নিক্সন তালুকদার জনকল্যাণ পাঠাগার ও কাহালা জনকল্যাণ পাঠাগার ‘ক’ শ্রেণিতে ৫৬ হাজার টাকা করে বরাদ্দ পেয়েছে। তবে এ বরাদ্দের ব্যাপারে নিক্সন ছাড়া অন্য কেউ জানে না। ধর্মপাশা ছাড়াও জেলার তাহিরপুর উপজেলার দক্ষিণ শ্রীপুরের মহজমপুর গ্রামে উষা-সুধীর তালুকদার জনকল্যাণ পাঠাগার ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার কৌয়া গ্রামে নেপাল শিল্পী আর্য তালুকদার জনকল্যাণ পাঠাগার নামের আরও দুটি পাঠাগার রয়েছে নিক্সনের। তার তাহিরপুরের পাঠাগার ‘ক’ ক্যাটাগরিতে ৫৬ হাজার ও ‘গ’ ক্যাটাগরিতে বিশ্বম্ভরপুরের গাঠাগার ৩৫ হাজার টাকা বরাদ্দ পেয়েছে এ অর্থ বছরেই।
নিক্সন তালুকদার বলেন, ৫টি পাঠাগারের কার্যক্রম একসাথে নিয়েছি। কাজের সুবিধার্থে প্রতিষ্ঠা সাল আগে দেখানো হয়েছে। বরাদ্দের ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের জানানো হয়েছে। তিনি পাঠাগারের বিভিন্ন তথ্যের ব্যাপারে বলেন, আমিতো একটা কাজ নিয়ে আছি না, অনেকগুলো বড় গবেষণা নিয়ে আছিতো তাই এগুলো দেখে বলতে হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মুনতাসির হাসান বলেন, ‘পাঠাগার প্রতিষ্ঠায় যদি কোনো অনিয়ম করা হয়ে থাকে তাহলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’