তাঁরা আমাদের গর্ব – এমএ মান্নান

স্টাফ রিপোর্টার
চার লোককবি বৈষ্ণব কবি রাধারমণ দত্ত, মরমী কবি হাসন রাজা, দূর্ব্বীণ শাহ ও বাউল স¤্রাট শাহ আব্দুল করিমের স্মরণে ৪ দিনব্যাপি উৎসব ‘হাওর পাড়ের গল্প’ শুরু হয়েছে।
শুক্রবার জেলা শিল্পকলা একাডেমী চত্বরে উৎসবের উদ্বোধন করেন অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান। উৎসব উপলক্ষে বিকাল ৫ টায় জেলা শিল্পকলা একাডেমী প্রাঙ্গণের সামনে থেকে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের হয়ে শহরে বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। র‌্যালি শেষে জেলা শিল্পকলা একাডেমীতে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন সিলেটের  বিভাগীয় কমিশনার নাজমানারা খানুম। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক কামরুজ্জামানের সঞ্চালনায় আলোচনা পর্বে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন- অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান, বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন- সংসদ সদস্য ড. জয়া সেন গুপ্তা, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাবেক সাংসদ মতিউর রহমান, সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন, সংসদ সদস্য পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ্, শিক্ষাবিদ ড. এএফএম সাইফুল ইসলাম। স্বাগত বক্তব্য রাখেন- জেলা প্রশাসক মো. সাবিরুল ইসলাম, বক্তব্য রাখেন পুলিশ সুপার বরকতুল্লা খান, মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিলেট কমার্স কলেজের অধ্যক্ষ লেখক-গবেষক ড. মোস্তাক আহমাদ দীন ।
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসনের আয়োজনে জেলা শিল্পকলা একাডেমির হাসন  রাজা মিলনায়তনে চার দিনব্যাপি এ উৎসব শুরু হয়েছে। DSCN1684
উৎসবে শুক্রবার বাউল স¤্রাট শাহ আব্দুল করিমের সৃষ্টি-কর্ম নিয়ে আলোচনা শুরু হয় সন্ধ্যা থেকে। এরপর  গানে গানে মাতিয়ে রাখেন শিল্পীরা।
আলোচনা পর্বে প্রধান অতিথি অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান বলেন, ‘দেশের লোক সংস্কৃতির কেন্দ্রে রয়েছে সুনামগঞ্জ। সুনামগঞ্জের লোক শিল্পীদের গান দেশে-বিদেশে সমাদৃত। জামালগঞ্জের নির্মলেন্দু চৌধুরী পৃথিবীব্যাপী সুনামগঞ্জের লোক শিল্পীদের তুলে ধরেছেন। এই চার লোক কবির সঙ্গে নির্মলেন্দু চৌধুরীকে কোনভাবে সম্পৃক্ত করা যায় কী-না চিন্তা করা যেতে পারে।’
তিনি গত ৩১ আগস্টের আগরতলার একটি অনুষ্ঠানের বর্ণনা দিয়ে বলেন,‘আগরতলার ঐ অনুষ্ঠানে ত্রিপুরার মূখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারও ছিলেন। হাজারো ¯্রােতার এই অনুষ্ঠানে বার বার শাহ্ আব্দুল করিমের নাম উচ্চারিত হয়েছিল। আমার গর্ব হচ্ছিল যখন শিল্পীদেরকে শ্রোতারা অনুরোধ করছিলেন শাহ্ করিমের গান পরিবেশন করার জন্য। তিনি বলেন,‘আমি লালন শাহ্, রাধারমণ, হাসনরাজা, দূর্ব্বীণ শাহ্, শাহ্ আব্দুল করিম, শচিন দেব বর্মণ, নির্মলেন্দু চৌধুরীর গানের ভক্ত। কয়েকটি গানের কলি উল্লেখ করে তিনি বলেন- লালন শাহ্’এর ‘খাচার ভিতর অচিন পাখি… , শাহ্ আব্দুল করিমের দখিনা বাতাসে সই গো- দখিনা বাতাসে, বন্ধুর বাড়ির ফুলের গন্ধ আমার বাড়ি আসে’সহ অসংখ্য জনপ্রিয় গান মানুষের মন ছুঁয়েছে।’
মন্ত্রী বর্তমান সরকারের নানা উন্নয়ন কার্যক্রম তুলে ধরে বলেন, ‘সরকার একটি আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার জন্য কাজ করছে।’
সংসদ সদস্য ড. জয়া সেন গুপ্তা শাহ্ আব্দুল করিমের স্মৃতিচারণ করে বলেন,‘শোষক আর শোষিত এই শব্দগুলো সমাজতান্ত্রিক চেতনার মানুষ ছাড়া, অন্য কারো কাছ থেকে সাধারণত শুনা যায় না। শাহ্ আব্দুল করিমের গানের কথায় এই শব্দগুলো পাওয়া যায়।’
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিলেট কমার্স কলেজের অধ্যক্ষ কবি ও গবেষক ড. মোস্তাক আহমদ দীন।
জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মতিউর রহমান বলেন,‘ শাহ আব্দুল করিম একজন শিল্পী হলেও তাঁর মধ্যে রাজনৈতিক চেতনা ছিল। তিনি ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী আব্দুজ সামাদ আজাদের পক্ষে গান গেয়ে গেয়ে মাঠে থাকা মানুষের মন জয় করেছেন। তিনি প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনার ধারক-বাহক ছিলেন। শাহ আব্দুল করিম, হাসন রাজা, রাধারমন দত্ত ও দূর্বŸীন শাহ আমাদের গর্ব, আমরা সুনামগঞ্জবাসী তাঁদের উত্তরসূরি। তাদের ইতিহাস সবার সামনে তুলে ধরতে হবে। ’DSCN1673
সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোয়াজ্জেম হোসেন রতন বলেন,‘চার লোককবি আমাদের সুনামগঞ্জ তথা বৃহত্তর সিলেটের গর্ব। তাঁরা সুনামগঞ্জকে দেশ-বিদেশে সম্মানের সাথে তুলে ধরেছেন। তাঁরাই আমাদের পরিচিতি। তাদের সৃষ্টি ও কর্ম আমাদের সবার মাঝে প্রতিফলিত করতে হবে। ’
সংসদ সদস্য অ্যাড. পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ বলেন,‘ বাউল স¤্রাট শাহ আব্দুল করিম, মরমী কবি হাসন রাজা, বৈষ্ণব কবি রাধারমণ দত্ত ও জ্ঞানের সাগর দূর্ব্বীন শাহ আমাদের নতুন প্রজন্মের প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছেন। সুনামগঞ্জের প্রকৃতি তাঁদের ধারণ করেছে। চার গুণি শিল্পীকে আমাদের সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। ’
সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এ এফএম সাইফুল ইসলাম বলেন,‘ শাহ আব্দুল করিমসহ সুনামগঞ্জের চার লোককবি মানুষের জীবনের, মাটি ও হাওরের কথা বলেছেন। তাঁরা সৃষ্টির রহস্য নিয়ে গান রচনা করেছেন। তাঁরা সৃষ্টির মাধ্যমে গণমানুষের কথা বলে গেছেন। নতুন প্রজন্মকে তাঁদের অনুসরণ করতে হবে। ’
পুলিশ সুপার মো. বরকতুল্লাহ খান বলেন,‘ হাওরের এবারের গল্প ছিল দুঃখের। তবে হাওর ও সুনামগঞ্জবাসী দুঃখ ভুলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।  লোক কবিদের অসাম্প্রদায়িক ভাবনা যুগ যুগ ধরে ধারণ ও লালন করতে হবে। যেসব গুণী শিল্পীর জন্ম এই এলাকায় হয়েছে নিশ্চয়ই সুনামগঞ্জ একদিন সংস্কৃতির রাজধানী হবে। ’
সভাপতির বক্তব্যে বিভাগীয় কমিশনার ড. মোসাম্মৎ নাজমানারা খানুম বলেন,‘ সুনামগঞ্জের চার গুণি শিল্পী গ্রামের সহজ-সরল ও জীবনের গান গেয়েছেন। আমাদের প্রতিদিনের দৈনন্দিন কাজে তাঁদের চিন্তা-চেতনা কাজে লাগাতে হবে। তাঁরা সুনামগঞ্জের সন্তান হলেও সিলেটি হিসেবে দেশ-বিদেশে পরিচিত। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের মত তাঁদেরকে নিয়েও গবেষণা হবে। ’
স্বাগত বক্তব্যে জেলা প্রশাসক মো. সাবিরুল ইসলাম বলেন,‘হাওরের বোরো ফসলহানিতে সুনামগঞ্জের অর্থনীতিতে ধস নেমেছে। তাই প্রতি বছরের ন্যায় চার গুণি শিল্পীর ‘লোক উৎসব’ না করে  ছোট পরিসরে ও ভিন্ন নামে ‘হাওর পাড়ের গল্প’ উৎসবের আয়োজন করেছি। চার গুণি শিল্পীকে স্মরণের জন্য এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। ’
উৎসব চলবে আগামী ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত।