রোহিঙ্গা ইস্যুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে ক্রমশ আরও বেশি করে জড়িত হচ্ছে তার সর্বশেষ প্রমাণ পাওয়া গেল মিয়ানমারের সেনাপ্রধানকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর টেলিফোন করা থেকে। ২৭ অক্টোবর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন মিয়ানমার সেনাপ্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইংকে টেলিফোন করে রোহিঙ্গা নির্যাতন বন্ধ ও বাংলাদেশে আগত অত্যাচারিত রোহিঙ্গাদের দ্রুত ফিরিয়ে নেয়াসহ আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন। এর আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়ে সক্রিয় চিন্তা শুরু করেছে বলে জানিয়েছে। এইসব প্রতিক্রিয়ায় মিয়ানমারের অশান্ত আরাকান ও নির্যাতিত রোহিঙ্গা ইস্যুতে মার্কিন প্রতিক্রিয়ার দিকটি বিশ্ববাসী আরও ভালভাবে অবহিত হল। কিন্তু মিয়ানমার এই প্রতিক্রিয়াকে কোন দৃষ্টিতে দেখে সেটি হলো মূল বিষয়। বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি মিয়ানমার সফর শেষে দেশে ফিরে যে মন্তব্য করেছেন সেটি নিশ্চিতভাবেই হতাশাজনক। তিনি রোহিঙ্গা ইস্যুর সমাধানে মিয়ানমারের আন্তরিকতার ঘাটতির বিষয়টি উল্লেখ করে বলেছেন, বর্তমানে বিশ্ব প্রতিক্রিয়া দেখে মিয়ানমার কিছু নমনীয় কথা বলছে বটে তবে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া বন্ধ হয়ে গেলে তারা আবারও স্বমূর্তিতে আবির্ভূত হবে। অর্থাৎ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য থেকে স্পষ্টতই বুঝা যায় রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে তথা রোহিঙ্গা দলন বন্ধ করতে মিয়ানমারের আদৌ কোন আগ্রহ নেই। এর অর্থ কি মিয়ানমারের প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা নাগরিকের ভার বাংলাদেশকেই বইতে হবে? কেন অন্য একটি দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর দায়িত্ব বাংলাদেশকে নিতে হবে, এই প্রশ্নে বিশ্ব বিবেক কাগজে-পত্রে উদ্বিগ্ন হলেও বাস্তবত মানবিক সহায়তার বাইরে এখন পর্যন্ত আর কোন উদ্যোগ লক্ষণীয় নয়। উন্নয়নকামী বাংলাদেশের জন্য এটি অসহনীয় এবং বাংলাদেশ যে মিলেনিয়াম লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেছিল তা অর্জনে এই ইস্যুটি এখন সবচাইতে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসাবে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
মিয়ানমার একটি জাতিগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্নকরণ ও অন্যদেশে ঠেলে দেয়ার সাহস পেল কোথায় এই প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক। এখন পর্যন্ত যে বিষয়গুলোকে আমরা গণ্য করতে পারি সেগুলো হলো, বাংলাদেশের চাইতে মিয়ানমারের সামরিক শক্তি বড়। অন্য কারণটি হলো রোহিঙ্গা দলন ইস্যুতে রাশিয়া ও চীনের প্রকাশ্য সমর্থন। ভারতের ভূমিকাটি প্রথমে মিয়ানমারের পক্ষে মনে হলেও সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা বিশ্লেষণ করলে বুঝা যায় ভারত এই ইস্যুতে অনেকটাই দুদুল্যমান অবস্থায় রয়েছে। মিয়ানমারের এই সবল অবস্থাকে রুখতে মার্কিন তৎপরতা একটি বড় বিষয় বটে। তবে এই ইস্যুতে সরাসরি মার্কিন হস্তক্ষেপ উপমহাদেশজুড়ে অশান্তি ডেকে আনতে পারে। তাই বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ মার্কিন হস্তক্ষেপটিকেও ভাল চোখে দেখবে না। এই শাঁখের করাতের ধারালো দাঁত থেকে রক্ষা পেতে বাংলাদেশকে তাই নিবিড় কূটনৈতিক ব্যবস্থার দিকেই অগ্রসর হতে হবে। ভারত যদি এই ইস্যুতে পরিষ্কার অবস্থান গ্রহণ করে ফেলে তাহলে মিয়ানমার বেকায়দায় পড়ে যাবে নিশ্চিতভাবেই। সুতরাং বাংলাদেশকে ভারতের সাথে মিলে সমস্যা সমাধানের পথেই হাঁটতে হবে।
এই ধরনের জটিল সমস্যায় সামরিক হস্তক্ষেপের অনেক নজির বিশ্বব্যাপী রয়েছে। শেষ পর্যন্ত যদি সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানের পথে যেতে হয় তাহলে না ভাল হবে মিয়ানমারের জন্য, না বাংলাদেশের। কিন্তু অবস্থা যে দিকে মোড় নিচ্ছে সেখানে আমরা সত্যিকার অর্থেই একটি উপমহাদেশীয় অশান্তির উপলক্ষ নিয়ে আতংকিত। সুতরাং অশান্তির আগে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ খোঁজাটাই হবে উত্তম।

