ভ্রমণ- রাশিয়া থেকে ফিরে

এনাম আহমেদ
এবারের ১৯তম বিশ্ব ছাত্র-যুব উৎসবটি অনুষ্ঠিত হয় রাশিয়ায়। এতে বাংলাদেশ থেকে আমরা ৮৭ জন অংশগ্রহণ করি। বাংলাদেশ দলের দলনেতা ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এম.এম. আকাশ। ১৪ অক্টোবর উৎসব উদ্বোধন হয়ে ২২ অক্টোবর সমাপনী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তার সমাপ্তি ঘটে। ৯ দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত এ সব অনুষ্ঠানের বিস্তারিত বিবরণ দেয়ার আগে উৎসবের আদর্শ ও উদ্দেশ্য নিয়ে কিছু আলোচনা করলে বিষয়গুলো বুঝতে সুবিধা হবে।
World Federation of Democratic Youth সংগঠন গঠন করা হয় ১৯৪৫ সালের শেষের দিকে। সংক্ষেপে সংগঠনটির নাম (WFDY) ‘উফডি’। গোটা বিশ্বে তখন অত্যন্ত নাজুক পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। সা¤্রাজ্যবাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক বোমা বর্ষণ করে জাপানের দুটি শহর হিরোশিমা ও নাগাসাকিকে ইতোমধ্যে পুড়িয়ে দিয়েছে। অথচ জাপান পরাজয় মেনে নিয়েছিল। মানবতাবিরোধী পারমাণবিক বোমা বর্ষণের তখন কোনও প্রয়োজনই ছিল না। পরাশক্তি হওয়ার আকাক্সক্ষায় তারা এই নেক্কারজনক ঘটনাটি ঘটায়। এই ঘটনায় ক্ষত বিক্ষত হয় গোটা বিশ্ববিবেক। বিশ্বের যুবসমাজ তখন নেতৃত্বহীন ও হতাশ। তখনই আন্তর্জাতিক যুব সংগঠন ‘উফডি’  ১০ নভেম্বর ১৯৪৫-এ আয়োজন করে বিশ্বযুব সম্মেলনের। এটি একটি বেসরকারি সংগঠন। জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃত। ঐতিহাসিকভাবে সা¤্রাজ্যবাদবিরোধী ও বামঘেঁষা। এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে বৃহৎ যুবসমাজকে ফ্যাসিবাদ, সা¤্রাজ্যবাদ, পারমাণবিক যুদ্ধবিরোধী অবস্থানে নেয়া। বিশ্বের যুব সমাজকে প্রকৃত সম্পদ ঘোষণা দিয়ে মানবিক পৃথিবী গড়ে তোলার লক্ষে তাদেরকে সৃষ্টিশীল কাজে নিয়োজিত রাখা। গৃহযুদ্ধ, জাতিতে জাতিতে হানাহানি, সাম্প্রদায়িকতা মুক্ত করে যুব সমাজকে প্রকৃত মানবিক গুণসম্পন্ন, বিজ্ঞানমনস্ক করে গড়ে তোলা। ‘উফডি’র সদর দপ্তর হাঙ্গেরীর বুদপেস্টে। এর মূল অনুষ্ঠানই হচ্ছে বিশ্বযুব উৎসব। এ উৎসব মূলত রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক। উৎসবের মাধ্যমে গোটা বিশ্বের যুবসমাজকে কাছাকাছি আনা, তাদের নিজ নিজ সংস্কৃতি উপস্থাপন করা, কাজের অভিজ্ঞতা, পরিকল্পনা বিনিময় করা। সর্বোপরি যুব সমাজের তারুণ্যের স্পন্দন সারা বিশ্বে মুক্তিকামী মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেয়া। ‘উফডি’র সভাপতি নিকোলাস পাপাডেমিটিও ও সম্পাদক জোস মউরী। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপ থেকে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা সমাপ্তির পর এ সংগঠনটি সংকটে পড়ে। এ জন্য ১৪তম বিশ্বযুব উৎসবটি অনুষ্ঠিত হয় দীর্ঘ ৮ বছর পর। এরপর যথারীতি প্রতি চার বছর পরপর উৎসবটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বর্তমানে সংকট কেটে ‘উফডি’ অত্যন্ত গতিশীল সংগঠন। এর বাংলাদেশের অনুমোদিত সংগঠন হচ্ছে বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন। ‘উফডি’ স্লোগান হচ্ছে ‘শান্তি, সংহতি, সামাজিক বিচার, আমরা সা¤্রাজ্যবাদ বিরোধী, অতীতকে সম্মান করে আমরা ভবিষ্যত নির্মাণ করি।
১ম বিশ্বযুব উৎসবটি অনুষ্ঠিত হয় ১৯৪৭ সালে চেকস্লোভাকিয়ায়, যার রাজধানী প্রাগ। ৭১টি দেশের প্রায় ১৭ হাজার প্রতিনিধি এতে অংশগ্রহণ করেন। ৪ সপ্তাহব্যাপী এই উৎসব চলে। শুরু হয় ২৫ জুলাই। এ সময় জার্মান বাহিনী চেকোস্লোভাকিয়ার একটি অংশ দখল করে নিলে তার প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়। পুলিশ এসময় ১৮০০ যুবককে গ্রেফতার করে। ২য় উৎসবটি অনুষ্ঠিত হয় ১৯৪৯ সালে হাঙ্গেরীর রাজধানী বুদাপেস্টে। ৮২টি দেশের প্রায় ২০ হাজার প্রতিনিধি এতে অংশগ্রহণ করেন। উৎসবে সংহতি জানানো হয় ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ায় সা¤্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনের, একই সাথে সংহতি জানানো হয় স্পেন ও গ্রিসের মানুষের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের। প্রথমবারের মতো এতে অংশগ্রহণ করে পূর্ব জার্মানির কিছু প্রতিনিধি। ৩য় উৎসবটি অনুষ্ঠিত হয় ১৯৫১ সালে পূর্ব জার্মানির রাজধানী পূর্ব বার্লিনে। এতে ১০৪টি দেশের প্রায় ২৬ হাজার প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন। এসময় সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে পশ্চিমা বিশ্বের ¯œায়ুযুদ্ধ ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। ৪র্থ উৎসবটি অনুষ্ঠিত হয় ১৯৫৩ সালে রুমানিয়ার রাজধানী বুদাপেস্টে। ৫মটি ১৯৫৫ সালে পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারসে। ৬ষ্ঠ বিশ্বযুব উৎসবটি অনুষ্ঠিত হয় তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজধানী মস্কোতে। এতে ১৩০টি দেশের প্রায় ৩৪ হাজার প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করে। সোভিয়েত ইউনিয়ন তখন বিশ্বের সামনে তাদের দুয়ার খুলে দেয় প্রথমবারের মতো। বিশ্বের ১৩০টি দেশ তাদের সংস্কৃতি প্রদর্শন করে, পারস্পরিক কর্মপরিকল্পনা আদান প্রদান করে। এখানেই যুব উৎসব তার প্রকৃত তাৎপর্য খুঁজে পায়। পরবর্তীতে ১৯৫৯ সালে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায়, ১৯৬২ সালে ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিংকীতে, ’৬৮-তে বুলগেরিয়ার রাজধানী সোফিয়ায়, ’৭৩-এ পূর্ব জার্মানির রাজধানী পূর্ব বার্লিনে, ’৭৮-এ কিউবার রাজধানী হাভানায়, ’৮৫-তে আবারও সোভিয়েত ইউনিয়নে, ’৮৯-এ উত্তর কোরিয়ার রাজধানী পিয়ংইয়ং-এ, ’৯৭-এ আবার কিউবার হাবানায়, ২০০১-এ আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্সে, ১৬তম উৎসব ২০০৫ সালে ভেনিজুয়েলার রাজধানী হাভানায়, ১৭তম উৎসব ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায়, ১৮ তম উৎসব ইকুয়েডরে অনুষ্ঠিত হয়। এবারের উৎসবটি রাশিয়ার পর্যটন ও অলিম্পিক নগরী সোচিতে অনুষ্ঠিত হয়। সোচির অত্যতম আকর্ষণ ইতিহাস খ্যাত কৃষ্ণ সাগর।
সাগরের নিচের ভূ-প্রাকৃতিক গঠন, ব্যতিক্রমী সমুদ্র¯্রােত, নামকরণ ইত্যাদি কারণে কৃষ্ণসাগর সব সময়ই রহস্যময় ও অনেকের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। এটি দক্ষিণ পূর্ব ইউরোপের একটি সাগর। ভূমধ্যসাগর ও নানা প্রণালীর মাধ্যমে তা আটলান্টিক মহাসাগরের সাথে যুক্ত। এই সাগর পূর্ব ইউরোপ ও পশ্চিম এশিয়াকে বিভক্ত করেছে। এর অববাহিকায় বুলগেরিয়া, রোমানিয়া, রাশিয়া, ইউক্রেন, জর্জিয়া ও তুরস্কের অবস্থান। কৃষ্ণসাগরে অনেকগুলো নদী এসে মিলিত হলেও এদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে দানিয়ুব। সাগরটি ভৌগলিক ও বাণিজ্যিক উভয়দিক থেকেই খুব গুরুত্বপূর্ণ। বছরে প্রায় ৩ লাখ টন মাছ ধরা হয় এ সাগর থেকে। প্রচুর বাণিজ্যিক মালামাল পরিবহণকারী জাহাজও চলাচল করে এ সাগর দিয়ে।
এর নাম ব্লাক সি বা কৃষ্ণসাগর কেন ? এই নামকরণের পেছনে বেশ কিছু হাইপোথিসিস রয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে (১) কৃষ্ণ সাগরের গভীরে অন্তত ২ কি.মি. হাইড্রোজেন ও সালফার দ্বারা পূর্ণ। এছাড়া এর গভীরতর স্তরে সালফার ব্যাকটেরিয়া ছাড়া আর কোন জীব নেই। এতে কোনকিছু ডুবে গিয়ে কিছুদিন থাকলে হাইড্রোজেন সালফাইডের ঘনত্বের কারণে তার রঙ কালো হয়ে যায়।  (২) এই সাগরে চলাচলকারী জাহাজের নাবিকদের মতে যখন সাগরে ঝড় উঠে তখন সাগরের পানি কালো রঙ ধারণ করে। (৩) কৃষ্ণ সাগরের আকাশ বছরের প্রায় সময়ই মেঘে ঢাকা থাকে। যার জন্য পানির রঙ কালচে দেখায়। এ সব বৈশিষ্ট্যের জন্য এক সময় লোকমুখে এর নাম হয়ে যায় ব্লাক সি বা কৃষ্ণসাগর। এই সাগর নিয়ে তুরস্ক-রাশিয়ার সম্পর্কে টানাপোড়েন চলে। তুরস্ক এর উপর রাশিয়ার একক আধিপত্য খর্ব করতে চায়। অপরদিকে রাশিয়া কৃষ্ণসাগরের তীরবর্তী অঞ্চলকে রক্ষার নামে এস-৪০০ ট্রাম্প বসিয়েছে যা পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধ বিমানসহ আধুনিক সব বিমান ঠেকাতে পারে।
এবার সাগর থেকে ডাঙ্গায় উঠা যাক। বিশ্ব ছাত্র-যুব উৎসব সম্পর্কে প্রথমে অবগত হই ১৯৯৭ সালে। যুব ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি অ্যাডভোকেট মইনুদ্দিন আহমদ জালাল ঐ বছর কিউবায় অনুষ্ঠিত ১৪তম বিশ্ব ছাত্রযুব উৎসবে অংশগ্রহণ করেন। তাঁর সাথে যুব নেতা বুরহান উদ্দিন দোলন ও যুবনেতা মোজাম্মেল হক মুনিম ছাড়াও দেশের অন্যান্য বাম দলের নেতৃবৃন্দও কিউবা যান। আমাদের নেতৃবৃন্দ কিউবা থেকে ফিরে আসার পর  জালাল ভাইয়ের কাছ থেকে উৎসবের বর্ণনা শুনে বিশ্বযুব উৎসবে অংশ নেয়ার আবেদন জানাই জালাল ভাইয়ের কাছে। কিন্তু পরবর্তী কয়েকটি উৎসবে যাওয়া হয়নি নানা কারণে। এবারের উৎসব সম্পর্কে অবগত হই প্রায় দুই বছর আগে। জানতে পারি উৎসবটি হবে রাশিয়ায়। এ বছর আবার রুশ বিপ্লবের শত বছর পূর্তি হয়। ১৯১৭ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নে ভøাদিমির ইলিচ লেনিনের নেতৃত্বে রুশ বিপ্লব সংগঠিত হয় ও সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এখন আর সোভিয়েত ইউনিয়ন নেই। তারপরও রাশিয়াসহ সারা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষেরা এবার বছরব্যাপী রুশ বিপ্লবের শততম বর্ষপূর্তি পালনের উদ্যোগ নেয়। অন্যান্য দেশে রুশ বিপ্লবের শত বার্ষিকী পালন করা আর রাশিয়ায় গিয়ে তা পালন করা নিশ্চয়ই এক ব্যাপার নয়।
শিশুকাল থেকেই খেলাঘর, ছাত্র ইউনিয়ন, কমিউনিস্ট পাটির্র বড় ভাইদের কাছ থেকে শুনে শুনে এবং সংগঠনগুলোর কার্যক্রম দেখে তাদের প্রতি আকৃষ্ট হই। কৈশোরে সোভিয়েত ইউনিয়নের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বিবরণ পড়ে আমাদের প্রজন্ম অবাক হয়। সত্যিকার স্বপ্নের এক দেশ, যেখানে মানুষে মানুষে কোন ভেদাভেদ নেই। রাষ্ট্র কাউকে না খেয়ে থাকতে দেয় না। কেউ বিনা চিকিৎসায় মারা যায় না। সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করা হয়। যেখানে ধার্মিক আছে কিন্তু ধর্ম ব্যবসায়ী নেই। কলকারখানা সব রাষ্ট্রীয় মালিকানায়। আর নাগরিকরাই রাষ্ট্রের মালিক। অন্যকে ঠকিয়ে নিজে সম্পদের পাহাড় গড়ার সুযোগ নেই। এমন এক রাষ্ট্র ব্যবস্থা যে দেশে প্রায় ৭০ বছর চলমান ছিল সেই স্বপ্নের দেশ অবলোকন করার ইচ্ছে সেই ছোটবলা থেকেই। রুশ বিপ্লবের শততম বর্ষপূর্তির বছর রাশিয়াতে ১৯তম বিশ্ব ছাত্রযুব উৎসব অনুষ্ঠিত হওয়া খুব তাৎপর্যপূর্ণ। রাশিয়া যাওয়ার এরচেয়ে ভালো সময় আর হতে পারে না। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে গেলেও রাশিয়া এখনও পৃথিবীর বৃহত্তম দেশ। পৃথিবীর মোট চাষযোগ্য জমির এক অষ্টমাংশ রাশিয়াতে অবস্থিত। পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত রাশিয়া ১১টি সময় অঞ্চলে বিভক্ত। মোট ৮৫টি প্রদেশ (ফেডারেল বিষয়) নিয়ে গঠিত।
রাশিয়ার উত্তর পশ্চিমাঞ্চল থেকে দক্ষিণ পূর্ব পর্যন্ত এশিয়া ও ইউরোপের ১৪টি দেশের সাথে সীমান্ত রয়েছে। দেশটির অখতস্ক সাগরের মাধ্যমে জাপানের সাথে ও বেরিং প্রাণালীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কার সাথে সামুদ্রিক সীমানা রয়েছে। রাজধানী মস্কো শিল্পসমৃদ্ধ ও পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ শহর। [চলবে]
লেখক : অ্যাডভোকেট।