ইয়াকুব শাহরিয়ার, শান্তিগঞ্জ
শান্তিগঞ্জ উপজেলার মুরাদপুর গ্রামের বুক চিরে বয়ে চলেছে পিয়াইন নদী। এই নদীর দুই ক‚লে অথবা নদীর অল্প পানিতে বাঁধা বা অর্ধনিমগ্ন অবস্থায় পড়ে আছে তিন শতাধিক যাত্রীবাহী নৌকা। জ্যৈষ্ঠের এমন দিনে বজরা, ছইয়া, ছাদখোলা ইত্যাদি নৌকা যাত্রী নিয়ে পাথারিয়া বাজার থেকে ভাটিপাড়া-বাংলা বাজার রুট আর হাওরের বুকে দাপিয়ে বেড়ানোর কথা থাকলেও এখনো নৌকাগুলো পড়ে আছে শুকনায়। নৌকার কাঠ শুকিয়ে যাচ্ছে জ্যৈষ্ঠের দাবদাহে। এতে যেমন কষ্ট আর দুর্ভোগ বাড়ছে এসব এলাকার যাত্রী সাধারণের তেমনি কর্মহীন হয়ে আছেন ভাটিপাড়া, মুরাদপুর, আলীনগরসহ বিভিন্ন এলাকার প্রায় নয় শতাধিক নৌকা শ্রমিক। দুঃসময় যাচ্ছে এসব শ্রমিকদের পরিবারের। এলাকায় কোনো কাজ না থাকায় মুরাদপুরের একাধিক নৌকার শ্রমিক জীবন ও জীবিকার তাগিদে সপরিবারে পাড়ি জমিয়েছেন সিলেট ও রাজধানী ঢাকায়।
হাওর-নদীতে পানি না থাকায় এখনো নৌকা চলাচল শুরু হয়নি। নৌকায় চলাচল করতে না পারায় বাধ্য হয়েই যাত্রীদের অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে মোটরসাইকেলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাফেরা করতে হচ্ছে সড়ক পথে। তবে, পাথারিয়া-ভাটিপাড়া-আলীনগরের সড়কপথকে মৃত্যুর ফাঁদ বললেও ভুল হবে না। প্রায় প্রতিদিনই এই সড়কে ছোট বড় দুর্ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ভুক্তভোগীরা।
স্থানীয়রা জানান, অন্যান্য বছর বৈশাখ মাস থেকেই আমরা নৌকায় চলাচল করতে পারি। পাথারিয়া বাজার থেকে প্রায় ৩শ’ নৌকা চলে ভাটিপাড়া, মুরাদপুর, বাংলাবাজার ও আলীনগরসহ এই সমস্ত এলাকায়। প্রতিটি নৌকায় ৩জন করে নৌকা শ্রমিক থাকেন। দিন শেষে নৌকার খরচপাতি শেষে ১৫শ’ থেকে ২ হাজার টাকা উপার্জন করে বাড়ি ফিরেন তারা। এই উপার্জনে ভালোভাবেই চলতো তাদের সংসার। কিন্তু এবার পানি না হওয়ায় জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষ সময়েও হাওর বা নদীতে নৌকা ভাসানো যায়নি। এতে চালচলের ক্ষেত্রে স্থানীয়রাই বেশি দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন।
তারা জানান, শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাথারিয়া বাজার থেকে ভাটিপাড়া বাজার, মধুরাপুর (মর্দাপুর) বাজার, বাংলা বাজার, মুরাদপুর বাজার, আলীনগরের ঘাটসহ প্রায় ১০/১৫টি ঘাটে যাত্রী নিয়ে যায় নৌকাগুলো। এসব জায়গা থেকে অনেক যাত্রী আসেন পাথারিয়া। যাত্রী প্রতি ভাড়া দিতে হয় ২০ থেকে সর্বোচ্চ ৫০ টাকা। মালামাল বহনেও অনেক সুবিধা পাওয়া যায়। কিন্তু বর্তমানে ভাটিপাড়া-মুরাদপুরে যেতে চলে যাত্রী প্রতি ১শ’ টাকারও বেশি খরচ হচ্ছে। এছাড়া প্রতিটি মোটরসাইকেল মারাত্মক ঝুঁকি নিয়ে চালকসহ ৩/৪জন যাত্রী নিয়ে চলাচল করে। রাস্তার অবস্থাও একেবারে বেহাল, বলে বুঝানোর মতো না।
এদিকে কর্মহীন হয়ে সপরিবারে বাড়ি ছেড়েছেন মুরাদপুর গ্রামের মৃত. রাহাত উল্লাহ’র ছেলে গোলাপ নূর, ইজাজুল ইসলামের ছেলে ফয়জুল হক এবং শ্রমিক আবুল হাসান। মুঠোফোনে কথা হয় আবুল হাসানের সাথে। তিনি জানান, আমি একজন নৌকা শ্রমিক। বছরের ছয় মাস নৌকায় যাত্রী বহন করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকি। আমার নিজস্ব নৌকা না থাকায় প্রতি বছর ছয় মাস চুক্তিতে নৌকা ভাড়ায় আনি। এ বছরও ৭০ হাজার টাকায় নৌকা ভাড়া করেছি। স্থানীয় ব্যাংক থেকে কিস্তি তুলে, ধারদেনা করে নৌকা নিয়েছিলাম। এখনো নদী-হাওরে পানি আসেনি। পিয়াইন নদীতে নৌকা ডুবিয়ে পরিবার নিয়ে সিলেটে আছি। দিনমজুরি করে কোনো রকমে চলছি। আমার মতো আরও অনেকেই আছেন।
মুরাদপুর গ্রামের বাসিন্দা আবদুল খালিক ও আলীনগর গ্রামের বাসিন্দা মো. মাহবুব বলেন, আমরা সীমাহীন দুর্ভোগের মাঝে আছি। রাস্তা ভাঙা, মোটরসাইকেলের ভাড়া বেশি। পানি হলে নৌকায় করে আমরা খুব সহজেই চলাচল করতে পারি, খরচও কম। এ রাস্তায় প্রায় প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনা হচ্ছে। পানি না আসা পর্যন্ত আমাদের শান্তি নেই।
নৌকা শ্রমিক আবদুল মতিন বলেন, আমরা সাধারণ শ্রমিক। সারা বছরে আমাদের একটাই লক্ষ্য থাকে- বর্ষা মৌসুমে কিছু আয় রোজগার করে সুখে-শান্তিতে বছর কাটাবো। কিন্তু এ বছর তা হচ্ছে না। জ্যৈষ্ঠ মাসও প্রায় শেষ, এখনো নদীতে পানি আসে নি। আমরা এখন একদম বেকার সময় কাটাচ্ছি, খুব কষ্টে দিনাতিপাত করছি।
শান্তিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আনোয়ার উজ জামান বলেন, যদি বেকার হওয়া শ্রমিকদের নামের তালিকা আমাদের দেওয়া হয়, তাহলে আমরা কিছু একটা করার চেষ্টা করবো।


