তালেবের সাথে শেষ দেখা

বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রভাত রঞ্জন তালুকদার
বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ১৮ মিনিটের ভাষণে আমরা বুঝে যাই আমাদের কি করতে হবে। তাই আমরা লুকিয়ে বাড়ীর কাউকে না জানিয়ে রাত ৩ টার সময় ভারতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই। সারাদিন হাঁটতে হাঁটতে দুপুর পেরিয়ে অপরাহ্ন হলো। আমাদের সাথের একজনের আত্মীয় বাড়ীতে উঠলাম। তাদের বাড়ীর সব বালাট শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছেন। বাড়ীতে শুধু দুইজন বৃদ্ধলোক ও একজন মেয়ে আছে। মেয়েটি খেসারী ডাল দিয়ে ভাত পরিবেশন করলো। বাড়ীতে কোন বাসনপত্র ছিলো না তাই মেয়েটি কলাপাতায় আমাদের খাবার পরিবেশন করলো। রান্না এতোই স্বাদ লাগলো যে ভাত দিতে চাইলে না বলতাম না। কারণ যদি আর ভাত না দেয়।
তারপর আমরা বালাটে চলে গেলাম। দুইদিন পর আমি ট্রেনিং নেওয়ার জন্য নির্বাচিত হয়ে গেলাম। সেখানে ছাত্রলীেগের মুুজিবুর রহমান ভাইয়ের সাথে দেখা হয়ে গেলো। মেজর ডি. সুজা, মুজিবুর ভাই এবং আরো কয়েকজন অফিসার ছিলো। ট্রেনিং নেওয়ার জন্য আমরা ত্রিশজন রওয়ানা হলাম। শিলং ক্যান্টনম্যান্টে আমি এক রাত্রি যাপন করে পরের দিন রাত ৮ টার সময় ইকো ওয়ান ট্রেনিং সেন্টারে পৌঁছলাম। তখন গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল। আমাদের জন্য একটা থালায় দুইট বড় রুটি ও এক মগ চা দিয়ে গেলো। রুটি খেয়ে অভ্যাস নেই তাই ফেলে দিবো ভাবছিলাম। ঠিক তখনই জগৎজ্যোতি তার এক বন্ধুকে নিয়ে আমাদেরকে দেখতে এলো। জগৎজ্যোতি আমাকে বললো, দাদা রুটি ফেলবেন না। ফেললে শাস্তি দিবে, ক্রলিং করাবে। যা দেয় তাই খেতে হবে। আমরা অষ্টম ব্যাচে ট্রেনিং করেছি। এই ব্যাচের যাদের নাম মনে আছে তারা হলেন, সুনামগঞ্জের রব্বানী ভাই, ছব্বির, ইব্রাহীমপুরের আছদ্দর ভাই, এবাদুর ভাই, বেতগঞ্জের মনির ভাই, ছলিম উদ্দিন, নগরের সুধীর দা, পেরুয়া দিরাইয়ের বিধু, প্রভাত, জৈন্তার জয়ন্ত সেন যিনি বাংলাদেশে মেজর হয়ে অবসর করেছেন, নবীগঞ্জের সুরঞ্জন আমার ক্লাশমেট ছিলো। আমরা সিলেট সরকারি কলেজে পড়েছি। সুরঞ্জনও সেনাবাহিনীর মেজর হয়ে অবসর গ্রহণ করেছে।
আমাদের ট্রেনিং শুরু হলো। সেখানে ২৪ ঘন্টা বৃষ্টি হতো। যে শার্ট প্যান্ট পড়ে ট্রেনিং করেছি তা সারাদিন ভিঁজা থাকতো। ট্রেনিং শেষ করে বালাট এসে শুকাতাম। ট্রেনিং সেন্টারে টিলায় ছোট ছোট চিনা জেঁাকে ভর্তি ছিলো। রাতে ঘুমাতে গেলে প্যান্ট শার্ট পড়া থাকতো, মোজা পায়ে থাকতো, গামছা দিয়ে কান, মুখ ভাল করে বেঁধে ঘুমাতে হতো যাতে চিনা জেঁাক ঢুকতে না পারে। দুপুরে খাবার সময় লাইন ধরে খাবার নিতে হতো। সবাইকে একমাপে খাবার দেওয়া হত। বেশী চাইলে তা দেওয়া হত না। প্রথম প্রথম এই খাবার খেতে পারতাম না। অন্যকে কিছু খাবার দিয়ে দিতাম। কিছুদিন ট্রেনিং করার পর এ খাবারে আমার পেট ভরতো না। চেয়ে থাকতাম, অন্যরা আমাকে একটু খাবার দিত।
২৮ দিন আমরা ট্রেনিং নিয়েছি। এরমধ্যে আমরা সারারাত জঙ্গল ট্রেনিং করেছি। সকল অস্ত্র ব্যবহার করার ট্রেনিং করেছি, মর্টার, গ্রেনেড ব্যবহার করার ট্রেনিং করেছি, ব্রীজ ভাঙ্গার জন্য এক্সক্লোসিভ ট্রেনিং করেছি। ২৮ দিন ট্রেনিং করার পর শপথ অনুষ্ঠান করে আবার বালাটে ফিরে আসি।
দুইদিন পর সুধীর দা, আছদ্দর ভাই, এবং এবাদুর ভাই সহ দশজন (যারা ছাত্র ছিলেন) চিনাকান্দিতে ‘এ’ কোম্পানীতে যোগদান করি। ‘এ’ কোম্পানীর কমান্ডার ছিলেন গনি হাওলাদার।
আমরা একটা সেকশন একবার ব্রীজ ভাঙ্গার জন্য দিরাই গনিগঞ্জ, জয়কলস, সদরগড়, শাখায়তিসহ অনেক জায়গায় গিয়েছিলাম। তখন বাংকারে থেকে যুদ্ধ করেছি। ভাদেরটেক, সৈয়দপুর, মুসলিমপুর, উড়ারকান্দা ও পলাশ স্কুলেও ছিলাম। তখন একটা খবর ছড়িয়ে পড়লো যে, মুক্তিযোদ্ধের বিরুদ্ধে পাকিস্তানীদের পক্ষে আমেরিকান সপ্তম নৌ—বহর রওয়ানা দিয়েছে। সবার মুখেই একই কথা। সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়লাম। যুদ্ধ কতদিন দীর্ঘস্থায়ী হবে তার ঠিক নেই। তখন আরেকটা খবর ছড়িয়ে পড়লো যে, আমেরিকার সপ্তম নৌ—বহরকে প্রতিহত করার জন্য রাশিয়া নৌ—বহর পাঠাচ্ছে। তখন আমাদের সাব— সেক্টর কমান্ডার ছিলেন ক্যাপটেন সালহ উদ্দিন। তিনি হাফপ্যন্ট ও গেঞ্জি পড়তেন। হাতে সব সময় একটা চুড়ি পড়তেন। তিনি ছিলেন গম্ভীর প্রকৃতির লোক। তিনি সব মুক্তিযোদ্ধাদের ক্লোজ করলেন এবং একটি জরুরী মিটিং এর ব্যবস্থা করলেন। জায়গাটির নাম ঠিক মনে পড়ছে না, তবে জায়গাটি আম গাছ বেষ্টিত বিরাট একটি মাঠ এটা মনে আছে। মিটিং ছিলো ২ টার সময়। সুধীর দা, আছদ্দর ভাই ও আমার উপর দায়িত্ব পড়লো প্রত্যেক পাকিস্তানী বাংকারে গুলি করার, যাতে পাকিস্তানী সৈন্যরা মনে করে মুক্তিযোদ্ধারা প্রত্যেকটি বাংকারে আছে।
আমরা একটার পর একটা বাংকারে গুলি করতে করতে এগুতে লাগলাম। সুধীর দা ও আছদ্দর ভাই আমাকে বললেন, তুমি ঐ বাংকারে গুলি করে এসো। আমরা গাছ তলায় একটু বসি। সামনে একটি মাঠ, তারপর ধানক্ষেত, তারপর বাংকার। আমি আমার মেশিনগান (এল, এম,জি) নিয়ে এগুতে লাগলাম। হঠাৎ সুধীর দা চিৎকার করে বললেন, প্রভাত—প্রভাত তুমি লাইনিং পজিশনে যাও। এই কথা বলার কিছুকক্ষণের মধ্যে হঠাৎ রাইফেলের দুইট গুলি আমার কানের পাশ দিয়ে শন করে চলে গেলো। বাংকারের উপর উঠে দুইজন রাজাকার আমাকে গুলি করেছিলো। আমি সময় নষ্ট না করে দাঁড়িয়েই রাজাকারদের লক্ষ্য করে এল, এম, জি দিয়ে ব্রাশ ফায়ার করি। দুই রাজাকার ছিটকে পড়ে গেলো। তারপর আমরা মিটিংয়ে যোগদান করি। সেখানে সুজাত ভাই ও তালেবের সাথে দেখা হয়। তালেব আমার ক্লাশম্যাট ছিলো। খুব সাহসী ও বিনয়ী ছিলো তালেব। সেখানেই তার সাথে আমরা শেষ দেখা হয়। পাকিস্তানীদের সাথে এক যুদ্ধে তালেবকে পাকিস্থানীরা ধরে নিয়ে যায়। পড়ে শোনতে পারলাম আহসানমারা ব্রীজের নিকট তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হয়, শিক্ষিত মুক্তিযোদ্ধাদের রাশিয়ায় ট্রেনিংয়ে পাঠানো হবে। আমিও রাশিয়ার ট্রেনিং এর জন্য নির্বাচিত হয়েছিলাম।
লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা