আমিনুল ইসলাম, তাহিরপুর
মাত্র ক’দিন আগে বাঁধ ভেঙ্গে সোনার ফসল তলিয়ে গেল তাদের চোখের সামনে। এ অবস্থায় তাহিরপুরে আট হাওরপাড়ের ২৩ গ্রামের মানুষের মাঝে দেখা দিয়েছে হতাশা। নিজেদের সারা বছরের খাবার, গৃহপালিত গরু ছাগলের খাবার জুটবে কিভাবে? ঈদ তাই তাদের মাঝে কোন উৎসবের আমেজ আনতে পারেনি।
তাহিরপুরে আট হাওরপাড়ের দু’টি ইউনিয়নের ২৩টি গ্রামের মানুষের মাঝে ঈদের আমেজ নেই। গ্রামগুলো হলো উপজেলার শ্রীপুর দক্ষিণ ইউনিয়নের ১২টি গ্রাম এবং শ্রীপুর উত্তর ইউনিয়নের ১১টি গ্রাম। শ্রীপুর দক্ষিণ ইউনিয়নের খাইজ্যাউরি, নোয়াল, ফানা, বলাইকান্দি ও জিনারিয়া হাওরপাড়ের পাঠাবুকা রামসিংহপুর, মানিখিলা, লামাগাঁও, দুমাল, দুর্লভপুর, শরীফপুর, ভবানীপুর, বলাইকান্দি, সন্তোষপুর, মহজমপুর ও গোয়াবাড়িসহ ১২টি গ্রাম। শ্রীপুর উত্তর ইউনিয়নের এরালিয়াকোনা, গনিয়াকুড়ি ও সন্যাসি হাওরপাড়ের ১১টি মন্দিয়াতা, মইয়্যাজুরি, মুজরাই, সিরিয়ারগাঁও, গোলাবাড়ি, জয়পুর, ইসলামপুর, পানিয়াখালি, বিনোদপুর, ইন্দ্রপুর ও তেরঘরসহ গ্রাম।
এ বছর ভারতের মেঘালয় ও চেরাপুঞ্জিতে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের ফলে উপজেলার বৌলাই ও পাটলাই নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় পানির চাপে হাওরগুলোর স্থায়ী বেরী বাঁধ উপচে হাওরে পানি প্রবেশ করতে থাকে। এ অবস্থায় হাওরপাড়ের কৃষকরা টানা ১০ থেকে ১৫ দিন স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধে কাজ করেও বাঁধ রক্ষা করতে পারেননি। বাঁধ ভেঙ্গে হাওরপারের কৃষকদের সোনার ফসল তাদের চোখের সামনেই পানিতে তলিয়ে যায়। এ অবস্থায় এ বছর তাহিরপুরে ৮টি হাওরপাড়ের ২৩টি গ্রামের মানুষের মাঝে দেখা দিয়েছে সারা বছরের খাবারের সংকট, তাদের গৃহপালিত গরু মহিষের গো— খাদ্যের সংকট। আর পবিত্র ঈদ—উল—ফিতরের কোন আমেজ তো একবোরেই নেই।
শ্রীপুর দক্ষিণ ইউনিয়নের জিনারিয়া হাওরপাড়ের পাঠাবুকা গ্রামের কৃষক শাহ আলী বলেন, আমরা এক ফসলী বোর এলাকার মানুষ, পৌষ মাঘ মাসে ধানের চারা রোপন করে বৈশাখ মাসে ধান কাটাই মাড়াই করি। ফসল যা পাই তা দিয়েই ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া, বিয়ে—সাদি, সারা বছরের খোরাক সবকিছুই বৈশাখ মাসের উত্তোলিত ধান বিক্রি করে হতো। এ বছর পানিতে ফসল তলিয়ে যাওয়ায় নিজেদের খাবার, গৃহস্থালির গরু মহিষের খাবার নিয়ে তিনি ও তার এলাকার লোকজন চরম সংকটে রয়েছেন। এ অবস্থায় ঈদ উৎসবের তো প্রশ্নই আসে না। তিনি এক পর্যায়ে বাকরুদ্ধ হয়ে অক্ষেপ করে বলেন, এ বছর জিনারিয়া হাওরে ৩০ কিয়ার (৩০ শতকে এক কিয়ার) জমিতে ধান চাষ করেছিলাম। পুরো ধানটাই চোখের সামনে পানির নীচে তলিয়ে গেছে।
বলাইকান্দি হাওরপাড়ের ভবানীপুর গ্রামের কৃষক জনি তালুকদার বলেন, বলাইকান্দি হাওরে ১১ কিয়ার জমিতে ধানচাষ করেছিলাম। এর মধ্যে এক কিয়ার ধান কোন রকম কাটছিলাম। বাকী ধান ২/৩ ঘন্টার মধ্যেই বাঁধ ভেঙ্গে পানির নীচে তলিয়ে গেছে। এখন কাজের সন্ধানে নিজ এলাকা ছেড়ে শহরের কোথাও যেতে হবে।
এরালিয়াকোনা হাওরপাড়ের মন্দিয়াতা গ্রামের কৃষক শ্রীপুর উত্তর ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য সাজিনুর মিয়া বলেন, মন্দিয়াতা, মইয়্যাজুরি, মুজরাই, সিরিয়ারগাঁও, গোলাবাড়ি, জয়পুর, ইসলামপুর, পানিয়াখালি, বিনোদপুর, ইন্দ্রপুর ও তেরঘরসহ উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নের ১১টি গ্রামের মানুষ খুবই হতাশার মধ্যে আছে। ইতিমধ্যেই অনেক পরিবার গ্রাম ছেড়ে কাজের সন্ধানে শহরে চলে গেছে। অধিকাংশ পরিবারে খাবারের সংকট রয়েছে। তিনি আরো জানান,গ্রামগুলোতে এখন কোন ঈদের আমেজ নেই।
মন্দিয়াতা গ্রামের মিনারা বেগম বলেন, এরালিয়াকোনা হাওরে ১০ কিয়ার জমিতে ধান রোপন করছিলাম। সকল জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। ঘরে নাই ভাত,সামনে ঈদ নিজে কাপড় কিনমু না পোলাপাইনরে কাপর কিইন্ন্যা দিমু এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।’
তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. রায়হান কবীর বলেন, উপজেলার বিভিন্ন হাওরের ফসলহারা ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করে অগ্রধিকার ভিত্তিতে খাদ্য সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে।


