তীর কেটে বালু উত্তোলন ঠেকাতে লাল নিশান

অবৈধ বালু উত্তোলন ঠেকাতে জাদুকাটা নদীর দুই তীরে লাল নিশান টানিয়ে দিয়েছেন তাহিরপুর উপজেলা প্রশাসন। জাদুকাটা নদীর তীর কেটে ব্যাপকভাবে বালু উত্তোলনের ফলে নদী তীরবর্তী কিছু গ্রাম ভাঙ্গন কবলিত ও কিছু গ্রাম ভাঙ্গন হুমকির মধ্যে রয়েছে। পরিবেশবিরোধী এই বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে স্থানীয় লোকজন দীর্ঘদিন যাবৎ নানা উপায়ে তাদের বিরোধিতার কথা জানিয়ে আসছিলেন। এ নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে একাধিক সংবাদ প্রকাশিত হয়। শেষ পর্যন্ত প্রশাসন জনদাবির ব্যাপকতা ও স্থানীয় পরিবেশ বিনষ্টের বিষয়টি বুঝতে পেরে লাল নিশান টানিয়ে দিয়ে বালু তোলার সীমানা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। প্রশাসনের এই ব্যবস্থাটি প্রশংসনীয় । তবে শুধু নিশান টানিয়ে দেয়ার মধ্যে থেমে থাকলে চলবে না। সত্যিকার অর্থেই এই নিশান অগ্রাহ্য করে কেউ বা কোন মহল বালু উত্তোলন করে কিনা সেটি সার্বক্ষণিক নজরদারির মধ্যে রাখতে হবে।
ভারত সীমান্তবর্তী কিছু এলাকা ভূগঠনিক বৈশিষ্টের কারণে প্রাকৃতিক সম্পদের ভা-ার হিসেবে সুপরিচিত। মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে আসা বালু ও পাথর প্রাকৃতিক নিয়মে নীচে নেমে এসে পাহাড়ি ঝর্ণা, ছড়া ও নদী দিয়ে বাংলাদেশ অংশে জমা হয়। লোকজন এই বালু ও পাথর কুঁড়িয়ে জীবন-জীবিকা পরিচালনা করে আসছেন যুগের পর যুগ ধরে। বলা যেতে পারে জেলায় ধান উৎপাদন ও মাছ আহরণের বাইরে বালু ও পাথর উত্তোলন করা তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক খাত। প্রকৃতির এই আশীর্বাদকে কাজে লাগিয়ে জেলার লক্ষাধিক পরিবার বেঁচে বর্তে আছে সুদূর অতীত কাল থেকে। এই শ্রমজীবি আহরণকারীরা কোন ধরনের যন্ত্রের সাহায্য ছাড়া বালু পাথর কুঁড়িয়ে বিক্রি করতেন। এতে করে কখনও বালু-পাথরের মজুদ নিঃশেষিত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল না, পরিবেশেও পড়ত না বিরূপ প্রতিক্রিয়া। যে পরিমাণ বালু পাথর এই প্রক্রিয়ায় উত্তোলিত হত তার চাইতে বেশি পরিমাণ এসে নতুন করে জমা হয়ে যেত। কিন্তু লক্ষাধিক মানুষের জীবন বাঁচানোর এই খাতটির দিকে যখন অর্থলুলোপ ব্যবসায়ীদের দৃষ্টি পড়ল তখনই আসলে সর্বনাশের শুরু। এই ব্যবসায়ীরা যন্ত্রচালিত জলযান ও বালু-পাথর আহরণের জন্য ড্রেজার মেশিন বসানোসহ নদীগর্ভের বদলে নদীর তীর কাটা শুরু করে দেয়ায় এলাকার প্রতিবেশ প্রতিবেশের উপর বিপর্যয় নেমে আসে। অন্যদিকে এই খাতকে অবলম্বন করে বেঁচে থাকা বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবিকা পড়ে যায় অনিশ্চয়তার মুখে। এরকম অবস্থায় বালু-পাথর আহরণে যেকোন ধরনের যন্ত্রের ব্যবহারের বিরুদ্ধে স্থানীয়ভাবে প্রবল জনমত গড়ে উঠে। বিষয়টিও আইনবিরুদ্ধও। কিন্তু প্রাকৃতিক সম্পদের উপর এই যান্ত্রিক আগ্রাসন বন্ধ করা যাচ্ছে না কিছুতেই। সীমান্তবর্তী জনপদগুলোকে পরিবেশগত বিপর্যয় থেকে রক্ষা ও লক্ষাধিক লোকের জীবিকা টিকিয়ে রাখতে হলে এইসব বিষয়ে সরকারকে অবশ্যই কঠোরতা অবলম্বন করতে হবে।
তাহিরপুর উপজেলা প্রশাসন লাল নিশান টানিয়ে নদীর তীর কাটার বিরুদ্ধে যে প্রাথমিক আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন সেই জায়গায় তাদের কর্মতৎপরতাকে আরও বহুদূর অগ্রসর করে নিয়ে যেতে হবে। তাদেরকে নিশ্চিত করতে হবে এই সীমানা মেনে চলার বিষয়টি। অন্যদিকে পাহাড়ি নদীতে যাতে কোন অবস্থাতেই বাল্কহেড নৌকা বা বার্জ ঢুকতে না পারে এবং বালুপাথর উত্তোলনের যাতে কোন অবস্থাতেই ড্রেজার বা বোমা মেশিন ব্যবহার করা না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে একই সাথে। নতুবা এই লাল নিশান টানানোর কোনই উপযোগিতা থাকবে না।