তৃতীয় ডোজ গ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তায় অনেকে

সাইদুর রহমান আসাদ
সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের টিকা কেন্দ্রে মানুষের ভিড় বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে ভ্যাকসিন নিতে আসা মানুষের ভোগান্তি। গণটিকা নেওয়ার সময় ডাটা এন্ট্রি না করা, কেন্দ্রে এসে শিক্ষার্থীদের টিকা না পাওয়া, অনলাইনে রেজিস্ট্রেশন করে ভ্যাকসিনের দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছেন কিন্তু স্বাস্থ্যকর্মীরা টিকা প্রদানের ডাটা অনলাইনে এন্ট্রি না করা, এমনসব ভোগান্তিতে পড়েছেন অনেকে।
শনিবার বেলা ১১ টায় সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের টিকা কেন্দ্রে স্কুল পড়–য়া ছেলেকে নিয়ে এসেছেন জালাল উদ্দিন। ছেলে সালাউদ্দিন সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার আব্দুল আহাদ সাহিদা চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী। বিদ্যালয় থেকে ছেলের টিকা কার্ড পূরণ করে উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কার্যালয়ে পাঠিয়েছেন কর্তৃপক্ষ। এখান থেকে সদর হাসপাতালের টিকা কেন্দ্রে পাঠানো হয় এই শিক্ষার্থীকে। সদর হাসপাতালে এসেও ছেলেকে ভ্যাকসিন দেয়াতে পারেন নি জালাল উদ্দিন।
কেবল জালাল উদ্দিন নয়, সুফিয়া বেগম নামের আরেক শিক্ষার্থী অভিভাবকও এরকম ভোগান্তির কথা জানালেন। আলহাজ¦ জমিরননুর উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে তার ছেলে নাজমুন হোসেন। টিকা নিতে এসে ঘুরতে ঘুরতে হয়রান তিনি। বললেন, বিপদে পড়েছি, আমার সঙ্গে প্রতিবেশীর মেয়ে অপিও (অপি রানী শীল), দুজনকে নিয়ে ঘুরছি, কেউ সহায়তা করছে না।
জালাল উদ্দিন বললেন, স্কুল থেকে বলেছে উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ে টিকা কার্ড নিয়ে গেলেই হবে। সকালে সেখানে যাওয়ার পর বলা হলো, তারা ভ্যাকসিন দেয় না, সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে যেতে হবে। হাসপাতালে আসার পর তারা বলছেন, শিক্ষার্থীদের ভ্যাকসিন দেওয়া হচ্ছে না। সকাল থেকে শুধু ঘুরলাম, ভ্যাকসিন পাওয়া হলো না।
সুনামগঞ্জের জেলা শিক্ষা অফিসার মো. জাহাঙ্গীর আলম বললেন, শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট কেন্দ্রে ভ্যাকসিন নিতে বলেছি, এরকম হবারতো কথা নয়। রোববার শিক্ষার্থীদের টিকা কেন্দ্র ছিলো সুনামগঞ্জ সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ। সেখানে সবাই এসে ভ্যাকসিন পেয়েছে।
অন্যদিকে, দ্বিতীয় দফায় টিকা নিয়েও অনেকে ভোগান্তিতে পড়েছেন।
ভোগান্তির শিকার হওয়া ব্যক্তিরা বলছেন, অনেকে প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ ভ্যাকসিন নিলেও অনলাইনে এন্ট্রি নেই তাদের টিকা নেবার তথ্য। এতে তৃতীয় ডোজ পাওয়ার অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে তাদের।
অনেকে দুই ডোজ নেওয়ার এক বছর পর নতুন করে অনলাইনে নিবন্ধন করছেন। এই নিবন্ধনের পরে প্রথম ডোজ নেবার জন্য ম্যাসেজ পেয়েছেন। ম্যাসেজ পেয়ে টিকা কেন্দ্রে গিয়ে নতুন করে টিকা নিয়েছেন মর্মে শুধু এন্ট্রি করেছেন। নির্ধারিত তারিখে হাসপাতালে শুধু হাজিরা দিচ্ছেন তারা। তবে এই প্রসেসে তৃতীয় ডোজ পেতে বিলম্বের মধ্যে পড়েছেন তারা।
সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের টিকা কেন্দ্রে দায়িত্ব পালনকারী একজন স্বাস্থ্যকর্মী বললেন, শুরুর দিকে ও গণটিকা নেবার সময় ভোটার আইডি কার্ড নিয়ে আসলে আমরা তথ্য এন্ট্রি করে ভ্যাকসিন দিয়েছি। নিয়ম অনুযায়ী তাদের এসব তথ্য অনলাইনে এন্ট্রি করার কথা। কিন্তু এগুলো অনলাইনে এন্ট্রি করা হয় নি। অনলাইনে এন্ট্রি না হওয়া পর্যন্ত তৃতীয় ডোজ নেবার তারিখ গণনা শুরু হবে না, নির্ধারিত সময়কালের আগে কেউ তৃতীয় ডোজ নিতেও পারবেন না।
শহরের ষোলঘরের বাসিন্দা লেখক সুখেন্দু সেন বললেন, গেল বছরের শুরুর দিকে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের টিকা কেন্দ্রে গিয়ে ভোটার আইডি কার্ড নিয়ে ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ নেই। এরপর দুই মাস পর দ্বিতীয় ডোজ নিতে বলা হয়। নির্ধারিত তারিখে গিয়ে দ্বিতীয় ডোজও গ্রহণ করেছি। এবছর তৃতীয় ডোজ নেবার জন্য যোগাযোগ করে জানতে পারি, তথ্য অনলাইনে এন্ট্রি করা হয় নি। এভাবে তাঁর স্ত্রীরও টিকা নেয়ার তথ্যও এন্ট্রি করা হয় নি। একারণে ভোগান্তিতে পড়েছেন তারা।
তিনি ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, নিয়ম অনুযায়ী আমি জানুয়ারির শুরুতে ভ্যাকসিনের তৃতীয় ডোজ পাওয়ার কথা। কিন্তু স্বাস্থ্যবিভাগের ভুলের কারণে আমাকে প্রায় আরও একবছর অপেক্ষা করতে হবে টিকা নিতে।
উকিলপাড়ার বাসিন্দা মনোতোষ সাহা বললেন, আমার মেয়ে গতবছর সম্মুখসারির যোদ্ধা হিসেবে এমএজি ওসমানী মেডিকেল হাসপাতালে দুই ডোজ ভ্যাকসিন নেয়। দ্বিতীয় ডোজ নেয়ার সময় কর্তৃপক্ষ তার তথ্য এন্ট্রি দেয় নি। তৃতীয় ডোজ নিতে গেলে ডাটা এন্ট্রিতে দ্বিতীয় ডোজ নেয়া হয় নি দেখাচ্ছে। হাসপাতালে গেলে তারা বলছে, সিটি কর্পোরেশন থেকে এটা ঠিক করিয়ে আনতে হবে। এই নিয়ে ভোগান্তিতে পড়েছেন তারা।
রায়পাড়ার বাসিন্দা শিল্পী রায় বললেন, আমার ভাই ও ভাইয়ের বউ গণটিকা নেয়ার সময় ভ্যাকসিন নিয়েছে। তারা তো নিজেরা অনলাইনে নিবন্ধন করে নি। তারা কিভাবে তৃতীয় ডোজ নেবে জানতে চেয়েছিলাম, টিকা কেন্দ্রের দায়িত্বশীলরা কিছুই বলতে পারে নি।
সুনামগঞ্জের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আশরাফুল হক বললেন, এরকম ভ্যাকসিন দেওয়ার জন্য মন্ত্রণালয় থেকে আমাদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছিলো। আমরা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার আলোকে পুরো জেলায় দুই হাজার ছয়শ’ জনকে ভ্যাকসিন দিয়েছি। অনলাইনে নিবন্ধনের বিষয়টি আইসিটি মন্ত্রণালয় দেখে। আমরা এই দুই হাজার ছয়শ’ জনের ডাটা তথ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। তারা এখনও আমাদের কিছুই জানায় নি। আবারও যোগাযোগ করে এই বিষয়ে জানার চেষ্টা করা হবে। আশাকরি সংশ্লিষ্টরা তৃতীয় ডোজ ভ্যাকসিন দ্রুতই নিতে পারবেন।