দিরাই সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে পে-অর্ডার জালিয়াতি, ডিজিটাল সেবা ব্যবস্থা চালু ভিন্ন প্রতারণা রোধ সম্ভব নয়

পে-অর্ডার জালিয়াতির মাধ্যমে দিরাই সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে কোটি টাকা আত্মসাৎ এর যে খবর গত বুধবার দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত হয়েছে তা এক কথায় উদ্বেগজনক। সংবাদে পরিবেশিত তথ্য অনুসারে জমি রেজিস্ট্রির সময় সরকারি ফিসের টাকা পে-অর্ডার আকারে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জমা করতে হয়। জমি রেজিস্ট্রেশনের পর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস ওই পে-অর্ডারগুলো সরকারি কোষাগারে জমা করে থাকেন। দিরাইয়ে এরকম বেশ কিছু জমি রেজিস্ট্রির সরকারি ফি বাবদ দাখিলকৃত পে-অর্ডার সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে ব্যাংক থেকে নগদায়ন পূর্বক আত্মসাৎ করা হয়েছে। পে-অর্ডারের নির্দিষ্ট জমি কোনো কারণে রেজিস্ট্রি না হলে পে-অর্ডারের উল্টো পিঠে সাব-রেজিস্ট্রার প্রত্যয়ন করলে ব্যাংক পে-অর্ডারের টাকা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে পরিশোধ করে। আলোচ্য ক্ষেত্রে দিরাই সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দীর্ঘদিন যাবৎ এরকম পে-অর্ডার সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে ব্যাংক থেকে ভাঙিয়ে টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। পার্থক্য হলো, বর্ণিত পে-অর্ডারের বিপরীতে সকল ভূমিই রেজিস্ট্রি হয়েছে। কিন্তু দিরাই সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা/কর্মচারীদের সহায়তায় জমি রেজিস্ট্রি হয়নি মর্মে প্রত্যয়ন করে এইসব পে-অর্ডার ভাঙানো হয়েছে। আলোচ্য জালিয়াতির ঘটনাটি দাপ্তরিক নিয়মিত পরীক্ষণের মাধ্যমে ধরা পড়েনি। কেউ একজন জেলা রেজিস্ট্রারের নিকট এ ধরনের জালিয়াতি হচ্ছে বলে অভিযোগ করলে জেলা রেজিস্ট্রার কর্তৃক গঠিত একটি তদন্ত কমিটি এই জালিয়াতির ঘটনা উন্মোচন করেন। এখনও তদন্ত শেষ হয়নি। তদন্ত দল কোন সময় থেকে এ ধরনের জালিয়াতি হচ্ছে সেটি উদ্ঘাটন করতে পারেনি। তদন্ত দল বর্তমান সাব-রেজিস্ট্রারের কর্মকাল ২০১৭ সনের নভেম্বর মাস থেকে পরবর্তী সময়ের পে-অর্ডারগুলো সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে কিনা সেটি দেখছেন। যদি এর আগে থেকে অনুসন্ধান শুরু হয় তাহলে এমন আত্মসাতের পরিমাণ বাড়ারও আশঙ্কা রয়েছে।
সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলো রহস্যময় সরকারি দপ্তর। এই দপ্তরের গোপনীয়তা ও রাখ-ঢাক কর্মকা- সকলেই জানেন। এখানে স্বচ্ছতার খুব অভাব, অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। দুর্নীতির আখড়া বলেও এই দপ্তরকে অনেকে অভিহিত করেন। এখানে পে-অর্ডার জালিয়াতি করে বিশাল পরিমাণে টাকা আত্মসাতের ঘটনা অস্বাভাবিক কিছু নয়। সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলোতে অভ্যন্তরীণ তদারকি ব্যবস্থা বা নিরীক্ষণ ব্যবস্থা কতটা কার্যকর সে নিয়ে আমাদের সংশয় রয়েছে। যে অফিসের মাধ্যমে নিয়মিত সরকারি কোষাগারে রাজস্ব জমা হচ্ছে তার সকল কর্মকা- নিয়মিত তদারকিতে থাকার কথা। কিন্তু আলোচ্য ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে ২০১৭ সনের নভেম্বর মাস থেকে (ধরে নিলাম এর আগে এ ধরনের জালিয়াতি ঘটেনি) পে-অর্ডার জালিয়াতির ঘটনা ঘটে চললেও দাপ্তরিক অভ্যন্তরীণ তদারকি ব্যবস্থায় সেটি ধরা পড়েনি। সরকারি রাজস্ব আহরণকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তরের এমন দুর্বল অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ব্যবস্থা আমাদেরকে পীড়িত করে। অন্যদিকে ভূমি রেজিস্ট্রির সরকারি ফিস সরাসরি সরকারি কোষাগারে জমা দানের পরিবর্তে কেন পে-অর্ডার আকারে জমা করার বিধান রাখা হয়েছে সেটিও আমরা বুঝতে পারি না। এখন সবকিছু ডিজিটাল করা হচ্ছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বিষয়, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলোর সেবা কার্যক্রম এখনও ডিজিটাল করা সম্ভব হয়ে উঠেনি। আদৌ এই অফিসের সেবা ডিজিটাল করার কোনো পদক্ষেপ রয়েছে কিনা আমরা জানি না। ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু হলে, রেজিস্ট্রেশন ফিসের নামে অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ কিংবা এই ধরনের পে-অর্ডার জালিয়াতির ঘটনা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হত।
দিরাই’র ঘটনার পর আবারও সকলের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলোর সেবা কার্যক্রমে স্বচ্ছতা বিধান তথা দুর্নীতি রোধে ডিজিটাল ব্যবস্থা প্রবর্তন কতটা জরুরি। কর্তৃপক্ষ বিষয়টি ভেবে দেখবেন বলে আমরা প্রত্যাশা করি। কথিত পে-অর্ডার জালিয়াতির ঘটনায় জড়িত সকলের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করণার্থে কর্তৃপক্ষ যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন, এমনটাই আমাদের আশা।