দুঃস্বপ্ন কাটুক জাগুক লক্ষ্মীস্বপ্ন

খ্রিস্টিয় ২০১৭ সনের শেষ দিনটি অতিবাহিত হচ্ছে আজ। আজকের সূর্যাস্তের পর নবীন যে সূর্যোদয় হবে তা নিয়ে আসবে নতুন এক বছর। পুরাতনকে ঝেড়ে ফেলা মানে হতাশাকে চিরবিদায় জানানো আর নতুনকে স্বাগত জানানোর অর্থই হলো ভরসার সন্ধান। যে বছরটি গেছে সেই বছরের যত অপ্রাপ্তি যত ক্ষোভ বেদনা দুঃখগাঁথা তার সবকিছু কালের গর্ভে ছুঁড়ে ফেলে মানুষ নতুন বছরের শুরুর ক্ষণ থেকেই আশায় বুক বাঁধতে চায়। কিন্তু মানুষ চাইলেই ঐন্দ্রজালিক কোন অলৌকিকতা তার জীবনকে বদলে দেয় না-দেয়নি কখনও। মূলত আজ ও আগামীকালের মধ্যে পার্থক্য তেমন কিছু নেই। আজকের অন্তিম রেশটুকুই আগামীকাল প্রত্যুষে বয়ে নিবে। সুদূর কিংবা নিকট অতীতের জেরই অনাগত ভবিষ্যতের রাস্তা তৈরি করে। তবুও ব্যক্তি মানুষ সব শুরুতেই শুভবোধের জাগরণ আশা করে। মনে করে এই শুরুতে হয়তো পালটে যাবে অতীতের মন্দ প্রপঞ্চ। সুতরাং আজকের যে দিনটি বিদায় জানাচ্ছে একটি বছরকে তার সকল ভাল- মন্দের হিসেব-নিকেশ মনের ভিতরে রেখে সকলের প্রত্যাশা আগামীকাল থেকে শুধুই ভাল’র অনুরণন চলবে সর্বত্র।
অতিক্রান্ত হওয়া খ্রিস্টিয় সনটি সুনামগঞ্জবাসীর জন্য খুব একটা ভাল কাটে নি। জাতীয়ভাবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানা প্রাপ্তিযুগ থাকলেও এবং অবশ্যম্ভাবী এর সুফল জেলাবাসীর কপালে জুটলেও বোরো ফসল হারানোর কষ্ট কিছুতেই ভুলা সম্ভব নয় এই জেলার মানুষের। বছরটি শুরু হয়েছিল বোরো ফসল ঘরে তোলার এক লক্ষ্মীস্বপ্ন দিয়ে। কিন্তু অচিরেই সেই স্বপ্নে দানবের হানা পড়লো। ফেব্রুয়ারি থেকেই তলিয়ে যেতে শুরু করল হাওর। এপ্রিলে এসে ষোলকলা পূর্ণ করার মতো জেলার সকল হাওর গিলে খেল রাক্ষসী বান। এক গুটা ধান ঘরে তুলতে পারেনি জেলার কৃষককূল। এই যে বিশাল ফসল হানি, এর পিছনে প্রাকৃতিক দুর্যোগের চাইতেও বেশি আলোচিত ছিল কিছু লোভী মানুষের উদগ্র লোভের ইতিকথা। ওই সর্বগ্রাসী লোভের কবলে পড়ে জেলার ফসল রক্ষা বাঁধগুলো আক্ষরিক অর্থে অরক্ষিত থেকে গিয়েছিল। কোন কাজ না করেই সমুদয় টাকা আত্মসাতের যে সর্বগ্রাসী ক্ষুধা তার কাছে পরাভূত হলো জেলার কৃষক সমাজ। আজ যখন বছর শেষ হচ্ছে তখনও ওই উপসর্গ থেকে মুক্ত হওয়া সম্ভব হয় নি। বরং এবারও আরেক প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে সামনে রেখে জেলার কৃষকরা নতুন বছর শুরু করতে যাচ্ছেন। এই সময়ে যখন অন্যান্য বছর বোরো ধান রোপনের কাজ শেষ পর্যায়ে চলে আসত তখন এবার অধিকাংশ জমিতে রোপনের কাজই শুরু করা যায় নি। কারণ জেলার প্রধান প্রধান হাওর থেকে পানি নিষ্কাশিত হচ্ছে না। নদীর নাব্যতা সংকট, খাল ও নালা ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ। অথচ সারা বছরই জেলার সকলের দাবি ছিল হাওরের সংকটের স্থায়ী সমাধানের উপায় উদ্ভাবন। সেই স্থায়ী সমাধানটি যখন বছর শেষেও দেখা মিলে নি তখন নতুন বছরে নতুন আশা নিয়ে বাঁচতে ভয়ে বিহ্বল হওয়া ছাড়া আর কিইবা করার থাকে?
মানুষ বাঁচে আশায়। আশাহীন জীবন মৃত্যুর নামান্তর। আর আশাকে বাস্তবায়নের প্রধান অবলম্বন হলো নিরন্তর প্রয়াস। নতুন বছরে সকলের কর্মপ্রয়াস পরিচালিত হোক আশার বাসা স্থায়ী করার, এই কামনা আমাদের। বিদায় ২০১৭।