সুমনকুমার দাশ
[সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন আয়োজিত চার লোককবি স্মরণে ‘হাওরপাড়ের গল্প’ শীর্ষক উৎসবের দ্বিতীয় দিনে বাউলসাধক দুর্বিন শাহকে নিয়ে মূলপ্রবন্ধ পাঠ করেন লোকসংস্কৃতি গবেষক সুমনকুমার দাশ। তাঁর প্রবন্ধটি দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর-এর পাঠকদের জন্য মুদ্রিত হলো।]
বাউলসাধক দুর্বিন শাহকে (১৯২০-১৯৭৭) ‘জ্ঞানের সাগর’ অভিধায় চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। মূলত যে-কারণে এই অভিধা, এখানে তার উল্লেখ করা যেতে পারে। ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে বাউলসাধক শাহ আবদুল করিম ও দুর্বিন শাহ প্রবাসীদের আমন্ত্রণে বিলেত সফরে গিয়েছিলেন। সেখানে তাঁরা দুজন গান গেয়ে দর্শক-শ্রোতাদের আপ্লুত করেছিলেন। তাঁদের গান রচনার ধরন ও গায়নভঙ্গিতে মুগ্ধ হয়ে প্রবাসীরা শাহ আবদুল করিমকে ‘রসের সাগর’ এবং দুর্বিন শাহকে ‘জ্ঞানের সাগর’ অভিধায় অভিষিক্ত করেছিলেন।
কেউ কেউ দুর্বিন শাহের পদাবলির সঙ্গে বাউলসাধক লালন শাহ (১৭৭৪-১৮৯০)-এর পদাবলির তত্ত্বগত সাদৃশ্যও খুঁজে পান। অতীতে গ্রামীণ মানুষের মধ্যে দুর্বিন শাহের পদাবলি ব্যাপক আবেদন সৃষ্টি করলেও সেগুলো নাগরিক সমাজে ততোটা প্রচলিত ছিল না। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দুর্বিন শাহের গানের প্রতি সর্বত্র আগ্রহ পরিলক্ষিত হচ্ছে।
দুই
বাউলদের সাধনপদ্ধতি এবং এ সম্পর্কিত পদাবলি তাঁদের গোপন-সাধনার অংশবিশেষ। বাউলেরা তত্ত্বসমৃদ্ধ গানগুলি কেবল নিজেদের মধ্যেই আলোচনায় সীমাবদ্ধ রাখতেন। তবে সিলেট
ও নেত্রকোনা অঞ্চলের বাউলেরা এসব গান সাধারণ মানুষদের মনোরঞ্জনের জন্য মঞ্চেও পরিবেশন করতেন। ফলে গোপন-তত্ত্ব সমৃদ্ধ এসব পদাবলির ভাবার্থ শ্রোতাদের কেউ কেউ বুঝতেন, আবার কেউ বুঝতেন না।
দুর্বিন শাহ এই বাউল-পরম্পরারই সার্থক উত্তরসূরি। ভবতোষ দত্তের অভিমত : ‘বাউলকবিদের গানের রূপ চিরকাল একই রকম’। বাউলদের সম্পর্কে তাঁর আরও বক্তব্য :
কবিদের ব্যক্তিগত জীবনের ছাপ তাদের গানে নেই বলে এবং গানগুলি তত্ত্বমূলক বলে তাদের বক্তব্যেও কোনও বিভিন্নতা নেই। কয়েকজন যথার্থ শক্তিমান বাউলকবির রচনা ছাড়া অন্যদের রচনাকীর্তিও একই রকম। যাঁরা শক্তিমান তাঁদের রচনার সৌন্দর্য ভাষায়, বক্তব্যে কোনও বৈচিত্র্য নেই।
বস্তুত রচনাশৈলীর কিছু ভিন্নতা ছাড়া প্রায় সব বাউলের গানের অর্থ একই। এর বাইরে নন দুর্বিন শাহও। লালনের মাধ্যমে বাউলগান নতুন উচ্চতায় আসীন হয়েছে, এটি প্রায় সকল গবেষকের ধারণা। বলা যায়, লালনের একক প্রভাবেই তৎকালীন নদীয়া, বীরভূম, কুষ্টিয়া, যশোর, রাজশাহী অঞ্চলে বাউলগানের ধারা বেগবান ও প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছিল। তবে নীরবে-নির্ভৃতে লালনেরও জন্মের আগে থেকে সিলেট অঞ্চলে বাউল-ফকিরদের একটি তাৎপর্যপূর্ণ ধারা যেভাবে এগিয়ে চলছিল, কোনও কারণে সেটা গবেষকদের দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। সিলেটের সপ্তদশ শতকের দীন ভবানন্দ ও সৈয়দ শাহনুর (১৭৩০-১৮৫৫)-সহ অন্যরা সে চর্চা অব্যাহত রেখেছিলেন। পরবর্তী সময়ে মৌলভীবাজারে ফকির ইয়াসিন শাহ (১৮ শতকের শেষ দিকে জন্ম), সিলেটের শিতালং শাহ (১৮০০-১৮৮৯) হয়ে সে ধারা পার্শ্ববর্তী ময়মনসিংহ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল। সেই সময়টাতেই বাউল-ফকিরদের আধিক্য বেড়ে যায়।
দীন ভবানন্দ কিংবা সৈয়দ শাহনুরদের প্রভাবে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ ও কিশোরগঞ্জ জেলায় ফকিরি ও বাউলগানের স্বতন্ত্র একটি ধারা তৈরি হয়েছিল। সে ধারাটিতে একেক সময় একেক ফকির ও বাউলসাধক নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এঁদের মধ্যে দৈখোরা, শিতালং শাহ, ইয়াসিন শাহ, শেখ ভানু (১৮৪৯-১৯১৯), হাসন রাজা (১৮৫৪-১৯২২), উকিল মুনশি (১৮৮৫-১৯৭৮), রশিদ উদ্দিন (১৮৮৯-১৯৬৪), জালাল উদ্দীন খাঁ (১৮৯৪-১৯৭২), শাহ আবদুল করিম (১৯১৬-২০০৯), আবদুস সাত্তার (১৯১৮-১৯৩৯) এবং দুর্বিন শাহ উল্লেখযোগ্য।
তিন
প্রকৃতি, পরিবেশ এবং আঞ্চলিক তারতম্যের কারণে কুষ্টিয়া অঞ্চলের বাউলগানের সঙ্গে সিলেট তথা ময়মনসিংহ অঞ্চলের বাউলগানে আচরণ ও রীতিনীতির মধ্যে কিছুটা ভিন্নতা থাকলেও বাউল-দর্শনের মোটেই ব্যত্যয় ঘটেনি। কুষ্টিয়া-নদীয়া-বীরভূম-যশোর অঞ্চলে বাউল মতবাদে বিশ্বাসী অসংখ্য সাধকের সন্ধান পাওয়া গেলেও তাঁদের মধ্যে পদাবলি রচয়িতার সংখ্যা খুবই নগণ্য। উপর্যুক্ত অঞ্চলে লালন, কুবির গোঁসাই, জাদুবিন্দু, লালশশী, দুদ্দু শাহ, পাঞ্জু শাহসহ আরও কিছু সংখ্যক পদকর্তাদের নাম পাওয়া যায়। কিন্তু সিলেট-সুনামগঞ্জ-নেত্রকোনা অঞ্চলে পদকর্তাদের তালিকা বেশ দীর্ঘ। সে তালিকার শ্রেষ্ঠ পদকর্তাদের মধ্যে দুর্বিন শাহের নাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দুর্বিন শাহর গানে দেহতত্ত্ব এবং বাউল-দর্শনের গুহ্য ও নিগূঢ় বিষয়াবলি পরিস্ফুট হয়েছে। তাঁর গানের ভাষা পূর্বসুরি বাউলসাধকদের চেয়ে কিছুটা ব্যতিক্রম এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ। কোরান-পুরাণ-শরিয়ত-মারিফত বিশ্লেষণের পাশাপাশি দেহের নানা পরিপাকযন্ত্র ও রেচন-প্রক্রিয়াকে উপজীব্য করে তিনি গানের কাঠামো তৈরি করেছেন। এ কাঠামোর পরতে পরতে রয়েছে নানা রকমের সাংকেতিক ভাষা এবং বাউলদের গোপন তত্ত্ব। তবে এসব তত্ত্বপূর্ণ কথা কোনও অধ্যাত্মবাদী চেতনার প্রতিফলন নয়, বরং তাঁর গান অধ্যাত্মবাদ সম্পর্কিত শব্দগুলো ধারণ করে বস্তুবাদী চেতনারই প্রকাশ ঘটিয়েছে। এমনকি জাতিগত বিদ্বেষ এবং ধর্মীয় হানাহানির বিপরীতে তাঁর গান এক সমন্বয়বাদী চেতনার উৎস। মানবতাবাদ তাঁর গানের অন্যতম অবলম্বন।
দুর্বিন শাহের ক্ষেত্রে শুধু নয়, মানবতাবাদ দর্শনটিই বাউলসাধনার প্রধানতম শর্ত। আর সেটিই ধরা পড়ে গণগীতিকার হেমাঙ্গ বিশ্বাসের একটি লেখায়। তাঁর ভাষ্য :
মোল্লা মওলানার শরিয়ত কিংবা সনাতন ব্রাহ্মণ্যধর্মের মনুর বিধানকে অবজ্ঞা করে, সমাজপতিদের লাঞ্ছনাকে অগ্রাহ্য করে, বৈষ্ণব, সুফী ও সহজিয়া বাউলের ভাবধারা সংমিশ্রণে এক অপূর্ব মানবতত্ত্ব গড়ে উঠেছিল। জাতপাত আচারবিচারের শুকনো বালুচরে তাদের এই নবভাবের বন্যায় যে মানবধর্মের পলিমাটি পড়েছিল তাতে আমাদের পল্লিপ্রান্তর সবুজ প্রাণের ফসলে ভরে উঠেছিল। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের এই নিরক্ষর দার্শনিকদের কথা ভাবলেই প্রথমে মনে পড়ে মুসলমান কবিদের কথাÑশানাল ফকির, সেখ মদন, শরিয়তী শাহ প্রভৃতি নাম শিক্ষিত শহুরে সমাজে আজও পরিচিত। কিন্তু কত ছোট বড় জ্ঞাত অজ্ঞাত লোককবি দেহের খাঁচার মধ্যে হীরামন পাখির সন্ধান দিয়ে মানবদেহকে পবিত্রতম ঘোষণা করে স্বর্গ ও বেহেশতের উপরে স্থান দিয়ে গেছেন তার ইয়ত্তা নেই। […]
[…] বাউল বলতে এক কথায় আমরা যা বুঝি তা বাংলায় সুফী আর বাউল সাধনার ধারার সমন্বয়ে সৃষ্ট জীবনদর্শন। এই বাউল ও সুফীরা যে মানুষের সন্ধানী হয়েছিলেন তা আপাতদৃষ্টিতে গূঢ়তত্ত্বের ব্যাপার হলেও সামাজিক দৃষ্টিতে তা ছিল জাত পাত ধর্মের উপরে মানবতা প্রতিষ্ঠা!
বাউল-অনুরাগী কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতামতও ছিল অভিন্ন। তিনি জানিয়েছিলেন, ‘বাউল সাহিত্যে বাউল সম্প্রদায়ের সেই সাধনা দেখি, এ জিনিস হিন্দু-মুসলমান উভয়েরই। তারা একত্র হয়েছে অথচ কেউ কাউকে আঘাত করেনি। […] হিন্দু-মুসলমানের জন্য এক আসন রচনার চেষ্টা করেছে, এই বাউল গানে তারই পরিচয় পাওয়া যায়।’ লালন যেমনটা তাঁর গানে বলেছিলেন, ‘মানবতত্ত্ব যার সত্য হয় মনে/ সে কি অন্য তত্ত্ব মানে।’ একই সাম্যবাণীর কথা যেন প্রতিধ্বনিত হয় দুর্বিন শাহের গানের পঙ্ক্তিতে : ‘গরিব দুঃখী চাষি মজুর সবার সমান অধিকার’।
সাম্যবাদ, বাউলতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব যেমন দুর্বিন শাহের গানের পঙ্ক্তিতে উপস্থাপিত হয়েছে, তেমনি অসংখ্য বিচ্ছেদগানের রচয়িতাও তিনি। খালেদ চৌধুরী যেসব গানকে ‘বাউলা গান’ হিসেবে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন, তাঁর অভিমত অনুযায়ী বিচ্ছেদ গানও সেই পর্যায়ভুক্ত। বোধ করিÑগীতিকার দুর্বিন শাহ মঞ্চ কিংবা গানের আসরের দর্শক-শ্রোতাদের মনোরঞ্জনের জন্য এসব গান রচনা করেছিলেন এবং শিষ্য-ভাবশিষ্যদের নিয়ে দলবলসহ গেয়েছিলেন। বিচ্ছেদ গোছের হলেও এসব গানের ভাবার্থ এবং দ্যোতনা শ্রোতাদের কাছে নান্দনিক আবেদন সৃষ্টি করে।
দুর্বিন শাহ মানুষের আবেগ ভালোভাবেই উপলব্ধি করতে পেরেছেন। সেটা সম্ভব হয়েছে বলেই মানুষের প্রেম-বিরহ-দহন-ভালোবাসা নতুন মাত্রা পেয়েছে তাঁর গানে। কোনও গানে পৌরাণিক রাধা-কৃষ্ণ চরিত্র কিংবা কোনও গানে নিজেকেই নারী ভেবে মূল চরিত্র হিসেবে কল্পনা করে প্রাঞ্জল ভাষায় গানের কাঠামো সাজিয়েছেন। ফলে এসব গান সাধারণ মানুষের কাছে পেয়েছে অমরতা। বিচ্ছেদে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয়ে দুর্বিন শাহর উক্তি :
আমার অন্তরায় আমার কলিজায়
প্রেমশেল বিঁধিল, বুক ছেদে পিঠ পার হইল গো ॥
মারিয়া ভুজঙ্গ তীর, কলিজা করিল চৌচির
কেমনে শিকারী তীর মারিল গো
বিষ মাখিয়া তীরের মুখে, মারিল তীর আমার বুকে
দেহ থইয়া প্রাণটি লইয়া গেল গো ॥
[…]
উপর্যুক্ত গানের আবেদনে বিরহী শ্রোতাদের অন্তরে চিরস্থায়ী ‘বিরহ-দহন’ সৃষ্টি হয়। এ-রকম বেদনা থেকেই হয়তো গীতিকারের আর্তিÑ‘বন্ধু আইও, আইও আমার বাড়ি, বন্ধু আইও/ আইও বন্ধু, আইও বন্ধু, আইও আমার বাড়ি ॥’ বন্ধুকে নিজের কাছে একান্তে পেলেই কেবল ‘প্রেমশেল’ দ্বারা বিদ্ধ হওয়ার কিংবা অসহনীয় বিরহ যন্ত্রণার আশঙ্কা থাকে না। যুগে-যুগে কালে-কালে ‘অবলা নারীরা’ পুরুষের ‘প্রেমের ফান্দে’ পড়ে ধুঁকে ধুঁকে মরছে, অথচ সেই দুঃখ প্রকাশ করার ভাষাও যেন তাঁদের নেই। বন্ধুর বাঁশির সুরে পাগলপ্রায় নারীর অন্তর তাই কেঁদেই চলছে এই ভাবনায় :
নির্জন যমুনার কূলে বসিয়া কদম্বতলে
বাজায় বাঁশি বন্ধু শ্যামরায় ॥
বাঁশিতে কি মধুভরা আমারে করিল সারা
আমি নারী গৃহে থাকা দায়
কালার বাঁশি হলো বাম বলে শুধু রাধা নাম
কুলবধূ কুলমান মজায়
বাঁশির সুরে অঙ্গ জ্বলে ঘরের জল বাইরে ফেলে
মনে লয় যাব যমুনায় ॥
[…]
বন্ধুর প্রতি হৃদয়ের এতই টান, যে টানে চিত্ত সর্বদা ব্যকুল। কীভাবে সার্বক্ষণিক বন্ধুকে নিজের কাছে রাখা যায়Ñসে চিন্তায় অস্থির প্রেমিকাচিত্ত। তাই বন্ধু-বিরহে আকুল প্রাণ চায় : ‘বন্ধু যদি হইত নদীর জল/ পিপাসাতে পান করিয়া পোড়াপ্রাণ করতাম শীতল ॥’
এই বিচ্ছেদগান রচনার পাশাপাশি বারমাসিও রচনা করেছেন। এই বারোমাসিতে প্রেমিকবিহীন এক অবলা-অসহায় নারীর বেদনাতুর চিত্র পরিস্ফুট হয়েছে। ‘এই পিরিত প্রেমের পাশাপাশি বাউলদের গানের আরেকটা বড় ধারা আছে দেহতত্ত্ব’Ñবলেছিলেন খালেদ চৌধুরী। তিনি এও বলেছিলেন :
দেহতত্ত্ব অনুসারে এ গানের মধ্যে দিয়ে বাউলদের যে বিশ্বাস প্রতিফলিত হয় তা হলো দেহে পরম ব্রহ্মের অবস্থান। পরমাত্মার সঙ্গে ‘আমি’ ক্ষুদ্রাত্মার মিলনের জন্য যে বিশেষ সাধন প্রক্রিয়া, শরীরের মাপ ও মন, এসব আলোকিত হয়েছে।
[…] গুরুভজন, দেহতত্ত্ব আর মনঃশিক্ষা এই তিনটিই বাউল সম্প্রদায়ের প্রধান সাধন প্রক্রিয়া। সাধন প্রক্রিয়া শিক্ষা দিতে গিয়ে গুরু বলেছেন, তুমি নিজেকে জানো। তোমার দেহের মধ্যেই পরমাত্মা বিরাজ করছেন।
বাউলসাধনায় যেহেতু গুরু/মুর্শিদের প্রধানতম শর্তই হচ্ছে নিজের স্বরূপ চেনা/উদ্ঘাটন। তাই এ মতবাদে বিশ্বাসীরা সারাক্ষণ নিজের ভেতরের সত্তার সন্ধানে ব্যাকুল থাকেন। এই সত্তা খুঁজতে গিয়ে ‘আপন দেহের খবর’ জানতে হয়। শরিয়তকে ব্যবহার করে মারফতি ঢঙে দুর্বিন শাহ বলছেন, ‘নিজকে নিজে না চিনিলে নমাজ হবে না’। নিজেকে চেনার মন্ত্রও তিনি জানিয়ে দিয়েছেন এভাবেই :
[…]
মানুষ আছে ব্যাপিয়া, দুনিয়া জুড়িয়া
দেখে তাল্লাশিয়া কার আছে রে হুঁশ
মানুষ চিনো নয়নে ধরো যাইয়া চরণে
না চিনে মরিও না কেউ হইয়া বেহুঁশ ॥
[…]
আত্মস্বরূপেতে দেখিবে নিরালাতে
সর্বদায় মনেতে হইবে আক্রোশ
ভ্রহ্মজ্ঞানের ধারায় যাইয়া প্রেমতলায়
আনন্দমনে হও সিদ্ধ পুরুষ ॥
[…]
‘গুরুর পদে ধরো যদি পাবে সে ভেদবিধি’। এই ‘ভেদবিধি’ সংক্রান্ত রীতিনীতির ধারণা কেবল ‘গুরু’-ই দিতে পারেন। গুরুপ্রাপ্ত ‘ভেদবিধি’/‘ভ্রহ্মজ্ঞান’ অর্জন করেই ‘আত্মস্বরূপ’ উন্মোচন সম্ভব। সেই স্বরূপ উন্মোচনের জন্য গুরুর প্রতি একনিষ্ঠতা প্রয়োজন। সেই একনিষ্ঠতা থেকেই মানুষরূপী এই সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্য পাওয়ার আশায় ভক্ত/শিষ্য সার্বক্ষণিক ব্যাকুল থাকেন। তাই তো দুর্বিন শাহ গভীর আর্তি নিয়ে উচ্চারণ করেন :
জন্মে জন্মে অপরাধী তোমারই চরণে রে
হায়রে আমারে নি আছে তোমার মনে ॥
বন্ধুয়া রে, শুনিয়াছি নামটি তোমার পতিতপাবন
দয়াময় দয়াল তুমি পাতকী তারণ
কিঞ্চিৎ দয়া করো যারে ও তার ভয় নাই ঘোর নিদানে রে ॥
বন্ধুয়া রে, মনপ্রাণ যৌবন দিলাম চরণে তোমার
পদছায়া দিয়া রাখো জেনে দুরাচার
আশাতে নিরাশ কইরো না আমি দীনহীনে রে ॥
বন্ধুয়া রে, কৃপাসিন্ধু ভক্তের অধীন
নিজ গুণে করো দয়া বাসিও না ভিন
দুর্বিন শাহ তোর চিরদাসী জিয়নে মরণে রে ॥
সেই পরম গুরু, যিনি একজন বাউলের আরাধ্য, লালন যাকে বলেন ‘মনের মানুষ’। তাঁরই চরণ পাওয়ার আশায় ‘জন্মে জন্মে’ শিষ্যের আরাধনা চলতেই থাকে। ‘ভক্তের অধীন’ হয়ে কূলের কা-ারি হওয়ার জন্যই শিষ্যের বারবার নিবেদনসূচক আর্তি। লোকতাত্ত্বিক সুধীর চক্রবর্তী সম্পাদিত বাংলার বাউল ফকির গ্রন্থে লেখক রণজিৎ সিংহ বাউলদের সম্পর্কে লিখেছিলেন :
মানুষের মধ্যেই তাঁরা মনের মানুষ, অধর মানুষ, সহজ মানুষ, রসের মানুষ, সোনার মানুষ, আলেক মানুষ, ভাবের মানুষ কিংবা এদেরই প্রতীক অচিন পাখি-কে খোঁজেন। খোঁজা চলে মানবদেহের মধ্যেই। তার প্রাপ্তিতে বাউলের সিদ্ধি। প্রেমের সাধনায় বাউলকে গুরুর নির্দেশ পালন করতে হয়। সেইমতো ক্রিয়াকরণ করতে হয়। সেই সাধনমার্গের তিন অবস্থার নাম প্রবর্ত, সাধক ও সিদ্ধ। সমগ্র বাউলগান এই তিন অবস্থার গান।
সাধারণের কাছে বাউলগান, তত্ত্বের গান অথবা সাধনার গান হিসেবেই আসে। বেশির ভাগ গানেই তাঁরা সোজাসুজি তত্ত্বের কথা অথবা সাধন পদ্ধতির কথা বলেছেন।
দুর্বিন শাহ অপরাপর বাউলের মতো দেহতত্ত্ব এবং সাধনতত্ত্বের অসংখ্য গান রচনা করেছেন। সাধনায় পথ চলতে হলে ‘পঞ্চতত্ত্বের ভেদ’ জানা আবশ্যক। তাই দুর্বিন শাহ উত্তরসূরিদের আগেই সতর্ক করে দিচ্ছেনÑ‘পঞ্চতত্ত্বের ভেদ বুঝিয়া করো রে মন সাধনা/ দেহে আছে পঞ্চতত্ত্ব তারে আগে চিনো না’। সে চেনা সম্ভব হলেই মনোবাঞ্ছা পূরণ হবে। তাই দুর্বিনের সাবধানবাণীÑ‘পাঁচ-পাঁচা-পঁচিশের তত্ত্ব এই দেহতে আছে সত্য/ যে জনায় করেছে আয়ত্ত, এই দেহ লয় হবে না ॥’
বাউল মতবাদ অনুসারীদের দেহের কামভাব ও শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ না-করতে পারাটাই চরম ব্যর্থতা। এক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে ‘ওপারে’ যাওয়া সম্ভব নয়। তাই ‘মায়াসাগরে’ পরিভ্রমণ করার ক্ষেত্রে সতর্কতার আশ্রয় নেওয়ার আহ্বান জানান দুর্বিন শাহ। একই ধরনের সতর্কতার আহ্বান জানিয়েছিলেন তাঁর পূর্বসূরিরাও। দুর্বিন শাহ যেমন বলেছিলেন, ‘না জানিয়া ডুব দিও না ওই মায়া সাগরে/ কত মাঝির ভরা খাইল মারা পড়িয়া নদীর চক্করে ॥’
এই ‘নদীর চক্কর’ মানে কামবোধ। কামবোধের যাতনা এতই তীব্র যে, ‘নদীর পাকে পড়ে কত সাধু মরে’। তাই ‘যখন নদী হয় উতলা’ তখন সাবধানে পাড়ি দিতে হয়। নতুবা ‘ধরে কামকুম্ভীরে হইয়া পাগেলা’। তবে এই ‘কুম্ভীর’-এর হাত থেকে বাঁচার উপায়ও রয়েছে। সঠিক পদ্ধতিতে সাধন-প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে পারলেই ‘অকূলে গতি’ পাওয়া সম্ভব। এ সম্পর্কিত নির্দেশনা দুর্বিন শাহ জানাচ্ছেন এভাবেই : ‘যদি যাবে সাধনপথে, ও যদি যাবে সাধনপথে/ মায়া বন্ধন করে ছেদন বসো যাইয়া কুম্ভকেতে ॥’ সাধনপথে টিকে থাকার জন্য দুর্বিন শাহ প্রাণায়াম, শ্বাস-নিয়ন্ত্রণ ও কাম-ক্রোধকে বশে আনার নির্দেশনার কথাও উল্লেখ করেছেন।
বাউল মত শুধু ভেক ধরার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি সাধন-পদ্ধতির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। এটি যে একটি দর্শনÑসেটিই পরিস্ফুটিত হয়েছে দুর্বিন শাহের পদাবলিতে। ষড়রিপু থেকে মুক্ত হয়ে জাগতিক সব ধরনের লোভ, লালসা, কাম থেকে দূরে সরে থাকাই বাউলের জীবনাচরণের অন্যতম শর্ত। সেই জীবনাচরণ ও সাধনায় পথ দেখাতে পারেন একমাত্র গুরু/মুর্শিদ। তাই তাঁর উক্তিÑ‘মুর্শিদ নাম ভরসা করি বাদামও উড়াও রে মাঝি’ অথবা ‘জীর্ণ তরি উঠে পানি, ঢেউ দেখে মোর কান্দে প্রাণী/ ঘুচাও আমার পেরেশানি চরণে বিনয় করি’। মুর্শিদের প্রদর্শিত পথে অগ্রসর হলে কেবল ‘ভাঙা তরি লইয়া’ ‘ভব নদী বাইয়া’ যাওয়া সম্ভব।
সেই ‘ভাঙা তরি’ মানে অভক্ত শিষ্যের দ্বারা ‘ত্রিবেণীয়ার গাঙ’ পাড়ি দেওয়া অসম্ভব। কারণ নারীর রজঃপ্রবাহের সময় না-বুঝে সঙ্গমে গেলে জন্মবীজের অনুপ্রবেশে ‘ভবের জনম বিফল যাবে’। তাই তো বাউল-গীতিকার দুর্বিন শাহ বলছেন : ‘ত্রিবেণীয়ার তিনটা বাঁক কুম্ভীর থাকে ঝাঁকে ঝাঁক/ মাঝিদের লাগাল পাইলে এমনি ধরে ঠেঙ্গে ॥’ সাধনতত্ত্বের গানের পাশাপাশি দুর্বিন শাহ দেহতত্ত্বের বেশ গান রচনা করেছেন। বস্তুবাদী চেতনা-দর্শনে সমৃদ্ধ ছিল তাঁর বাউল সত্তা। সৃষ্টিকর্তা আছে কি নেইÑএ নিয়ে তাঁর মধ্যে চরম দ্বিধা কাজ করেছে। চিন্তা-ভাবনা করে এক সময় সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব অস্বীকার করে রচনা করেন এ-রকম কয়েকটি গান :
প্রভু নিরঞ্জন কেমনেতে পাবো শ্রীচরণ
তোমাকে দেখিব বলে সদায় মনে আকিঞ্চন ॥
আছো কোথায় লুকি দিয়া, ডাকে দাসে কাতরে
শাস্ত্র ছেড়ে আকার ধরে দিও দেখা দাসেরে
দেখা দিতে দাসের তরে, আইনের কিবা প্রয়োজন ॥
এইদিক সেইদিক চাহি, তোমাকে দেখি যে দেখি না
হাত বাড়াইয়া ধরতে চাইলে ধরতে কেন পারি না
নিজে যদি ধরা দেও না, ধরবে আবার কোনজন ॥
ফরমাইয়াছ কোরানেতে, আদম শহরে বাসস্থান
খুঁজে চাহিলাম নাহি পাইলাম মিছে শুধু অপমান
দুর্বিন শাহ হইয়াছে অজ্ঞান, দেখবার আশা অকারণ ॥
প্রকৃতপক্ষেই বাউলের বস্তুবাদী উপলব্ধি উপর্যুক্ত গানে পাওয়া যায়। এঁদের দৃষ্টিভঙ্গি যেমন অসাম্প্রদায়িক, তেমনই চিন্তা-ভাবনা বস্তুকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। তাঁদের গান-আচরণ-সাধনায় মানুষ ভজনার দৃষ্টান্তই পাওয়া যায়। এই মানুষ ভজনা করতে গিয়েই গণচেতনার বিষয়টিও বাউলদের মধ্যে দেখা দেয়। তবে সিলেট অঞ্চলের বাউলদের মধ্যে গণচেতনার প্রভাব অনান্য অঞ্চলের বাউল মতানুসারীদের চেয়ে বেশি মাত্রায় পরিলক্ষিত হয়। মানুষ-বন্দনার চিত্র এসব বাউলদের পদাবলিতে অধিক মাত্রায় প্রকটিত।
দুর্বিন শাহও পূর্বসূরি বা সমসাময়িকদের চেয়ে ব্যতিক্রম নন। তবে তুলনা করলে তাঁর গানে গণচেতনার বিষয়টি একটু কম এসেছে। তাঁর রচিত পাক বঙ্গ ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ গীতি (১৯৭০) পুস্তিকার ৬টি গান দেশাত্মবোধক-গণসংগীত পর্যায়ভুক্ত। সর্বসাকুল্যে এই ৬টি গান তাঁর সার্বিক গানের বিচারে নগণ্য হলেও এগুলোর আবেদন নিছক কম নয়। এছাড়া সোনার বাংলা সংগ্রাম গীতিকা শীর্ষক তাঁর একটি পুস্তিকা প্রকাশিত হয়েছিল। ১০ থেকে ১২টি দেশাত্মবোধক গান ওই পুস্তিকায় মুদ্রিত হয়েছিল। পুস্তিকাটি খোদ রচয়িতার পরিবারসহ কারও সংগ্রহে না-থাকায় গানগুলো দু®প্রাপ্য হয়ে পড়েছে।
পাক বঙ্গ ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ গীতি ও সোনার বাংলা সংগ্রাম গীতিকা ছাড়াও দুর্বিন শাহ প্রণীত আরও ৬টি গানের সংকলন মুদ্রিত হয়েছে। প্রেমসাগর পল্লীগীতি প্রথম থেকে ষষ্ঠ খ- শীর্ষক এই ছয়টি গানের সংকলনে বাউলতত্ত্বকেন্দ্রিক গানের সঙ্গে বিচ্ছেদ পর্যায়ভুক্ত ৩০৮টি গান রয়েছে। মৃত্যুর আগে দুর্বিন শাহ ৭টি গানের সমন্বয়ে প্রেমসাগর পল্লীগীতি সপ্তম খ-ের পা-ুলিপিটি প্রস্তুত করে গেলেও সেটি মুদ্রিত করে যেতে পারেননি। এর বাইরে তাঁর আরও ৭টি অগ্রন্থিত গানসহ ২০০৩ খ্রিস্টাব্দে দুর্বিন শাহর গীতিমালা শীর্ষক গ্রন্থ মুদ্রিত হয়েছিল। এ সংকলনটি যৌথভাবে সম্পাদনা করেছিলেন মনিরুজ্জামান, বীরেন্দ্রকুমার দাস, সিরাজুল ইসলাম, মো. শওকতুল হাসান চৌধুরী ও আলম শরীফ। এর বাইরেও তাঁর বেশকিছু অগ্রন্থিত গান রয়েছে। গ্রন্থিত-অগ্রন্থিত সবমিলিয়ে এ-পর্যন্ত দুর্বিন শাহ রচিত সাড়ে তিনশোর কিছু বেশি গানের সন্ধান পাওয়া গেছে। বর্তমান প্রবন্ধকার কর্তৃক সম্পাদিত দুর্বিন শাহ সমগ্র-তে ৩৫৫টি গান সংকলিত হয়েছে। অগ্রন্থিত গানের মধ্যে ঋত্বিক ঘটকের যুক্তি তক্কো গপ্পো চলচ্চিত্রে একটি গান ব্যবহৃত হয়েছে। ‘নামাজ আমার হইল না আদায়’ শীর্ষক এই গানটি এ-রকম :
নামাজ আমার হইল না আদায়
নামাজ আমি পড়তে পারলাম না, দারুণ খন্নাছের দায় ॥
ফজরের নামাজের কালে, ছিলাম আমি ঘুমের ঘোরে
জোহর গেল আইতে-যাইতে, আছর গেল কামের দায় ॥
মাগরিবের নামাজের কালে, গিয়াছিলাম গোয়াল ঘরে
গাভী রইল হাওরেতে, বাছুর আমার বান্ধা নায় ॥
এশার নামাজ কালে, বিবি বলে চাউল ফুরাইছে
ছেলে মেয়ের কান্দন শুনে কান্দে পাগল দুর্বিন শায় ॥
এক চরম বাস্তব সত্যকে দুর্বিন শাহ তাঁর গানের পঙ্ক্তিতে ধারণ করেছেন। অভাবের তাড়নায় কাজের চাপে পড়ে নামাজ পড়া তাঁর সম্ভব হচ্ছে না। মুসলিম রীতি অনুযায়ী পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার বিধান থাকলেও সেই নির্দিষ্ট সময়ে সাংসারিক ঝামেলা এবং চরম অভাব তাঁকে নামাজ হতে দূরে রাখছে। তাঁর কাছে মনে হয়েছে, নামাজের চেয়ে কাজটাই অনেক বড়ো। কী বস্তুবাদী উচ্চারণ! এ-রকম অসংখ্য বস্তুবাদী চেতনা-সমৃদ্ধ পঙ্ক্তি দুর্বিন শাহের গানের পরতে পরতে ছড়িয়ে রয়েছে।
তথ্যসূত্র
১. সুমনকুমার দাশ (সম্পা.), দুর্বিন শাহ সমগ্র, উৎস প্রকাশন, ঢাকা, ২০১০;
২. , দুর্বিন শাহের গণসংগীত, বইপত্র, সিলেট, ২০১৫।
লেখক : লোকসংস্কৃতি গবেষক ও প্রাবন্ধিক; দুর্বিন শাহ সমগ্র-এর সম্পাদক।


