দেখার কেউ নেই, হাওরাঞ্চলে বেপরোয়া ট্রলি চালাচ্ছে অদক্ষরা

বিশ্বজিত রায়, জামালগঞ্জ
হাওরাঞ্চলে বোরো ধানের কাটা মাড়াই শেষে বহনের ক্ষেত্রে প্রধান বাহন সেলু মেশিনচালিত চার চাকার ট্রলি। তবে এসব ট্রলি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অদক্ষ অপ্রাপ্ত বয়স্করা চালাচ্ছে। এই কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। প্রাণ হারাচ্ছে শিশুরাও। ট্রলি চালনায় নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেবার দাবি স্থানীয়দের। বিশেষ করে অপ্রাপ্ত বয়স্ক বাচ্চারা যাতে ট্রলি নিয়ে বের না হয় সেই বিষয়টি খেয়াল রাখার দাবি স্থানীয়দের।
হাওরাঞ্চলের বাসিন্দারা জানান, ধান কাটার মওসুমে হাওরে ট্রলির প্রয়োজন রয়েছে, তবে দানবের মতো ধেয়ে আসা এসব গাড়ির গতিবিধি অত্যন্ত বিপজ্জনক। এর মাঝে চলাচলরত অবস্থায় চালকের সিগারেট টানা এবং মোবাইল হাতে কথোপকথনে এগিয়ে যাওয়ার খামখেয়ালিপনায় যেকোন সময় ঘটে যেতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা। মাঝে মধ্যে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ট্রলি পার্শ্ববর্তী বাড়ি কিংবা ক্ষেতে নেমে পড়ার ঘটনাও ঘটছে। এছাড়া সম্প্রতি এর বেপরোয়া চাকায় পিষ্ট হয়ে জামালগঞ্জে ২ শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।
গত ২১ মার্চ জামালগঞ্জ উত্তর ইউনিয়নের আলীপুর-শরীফপুর গ্রামে ট্রলি দুর্ঘটনায় ৭-৮ বছরের এক শিশু নিহত হয়েছে। অপরদিকে ৮ এপ্রিল একই ইউনিয়নের পূর্ব কালীপুর গ্রামে আরেকটি দুর্ঘটনা ঘটে। এতে সাফায়াত হোসেনের শিশুপুত্র মো. জিসান মিয়া (৪) মারা যায়। ওইদিন শিশু জিসান বাড়ির পার্শ্ববর্তী জমিতে পরিবারের লোকজনের সাথে আলু তুলতে বের হয়। আলু তুলে বাড়ি ফেরার পথে পেছন থেকে একটি ট্রলি তাকে ধাক্কা দেয়। এ সময় ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে শিশুটির লাশ উদ্ধার করে। ঝুঁকিপূর্ণ এসব ট্রলি কেবল বোরো ধান নয়, মাটি আনাসহ সরকার নির্মিত ঘরের ইট, বালু, পাথর আনার কাজেও ব্যবহৃত হচ্ছে।
জামালগঞ্জের কমরেড বরুণ রায় স্মৃতি পরিষদের সহ সভাপতি মো. আলী আমজাদ বলেন, বর্তমানে সড়কে যে ট্রলি চলছে। এসব চালকের বিন্দুমাত্র কোন বৈধতা নেই। সম্পূর্ণ অনিয়মতান্ত্রিকভাবে অদক্ষরা এসব ট্রলি চালাচ্ছে। এসব ট্রলি ও চালকদের প্রশাসন কর্তৃক নিয়মতান্ত্রিকতার মধ্যে আনা জরুরী।
উপজেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক সম্পাদক সমরেন্দ্র আচার্য্য শম্ভু বলেন, ট্রলি কারা চালাচ্ছে, তার এতো বড় একটি যানবাহন চালানোর দক্ষতা আছে কি-না, এসব যাচাই হয় বলে জানা নেই আমার।
সাচনা বাজারের ব্যবসায়ী মো. মহসিন কবীর বলেন, এই গাড়ি যারা চালাচ্ছে তারা আনকোরা এবং অদক্ষ। এদের আচরণও মূর্খের মতো। কেউ কিছু বলতে চাইলে তারা খারাপ আচরণ করছে মানুষের সাথে। ধান কাটা মাড়াইয়ের হাওরে ট্রলি কৃষকদের উপকারে আসে। কিন্তু মাঝে মধ্যে বাজারে উপজেলা সদরের অলিগলিতে বেপরোয়া ট্রলি চালানোয় জননিরাপত্তা হুমকির মধ্যে পড়ছে।
জামালগঞ্জ উত্তর ইউপি চেয়ারম্যান মো. রজব আলী বলেন, কমবয়সী ছেলেরা ট্রলি চালাচ্ছে। যে দুইটা এক্সিডেন্ট ঘটছে সেগুলোও শিশুবয়সী চালকেরাই ঘটিয়েছে। আমার পরিষদের পক্ষ থেকে মাইকিং করিয়েছি যেন ১৮ বছরের নীচে কোন চালক ট্রলি, অটো ও রিকশা না চালায়।
জামালগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোহাম্মদ আলী বলেন, যেসব ড্রাইভার ট্রলি চালায় এদের বয়স কম। এছাড়া এই ট্রলি সম্পূর্ণ অবৈধ। কয়দিন আগে আমাদের কালীপুরের ৪ বছরের এক শিশুকে মেরে ফেলা হয়েছে। আমাদের এখানে এই সময়ে ধান টানার জন্য যেহেতু এইটা ব্যবহৃত হয়, সেহেতু এটা বন্ধ করা যাবে না। তবে প্রাপ্তবয়স্ক দক্ষ চালক যেন সতর্কতার সাথে এটা চালায় সেদিকে নজর রাখতে হবে।
এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিশ্বজিত দেব বলেন, ট্রলি আসলে গ্রামীণ রাস্তায় চলাচল করছে, সেটা তো আর বড় সড়কে চলাচল করছে না। তারপরও যদি কোন সমস্যার কারণ হয় তাহলে ইউনিয়ন পরিষদ ব্যবস্থা নিবে, নয়তো আমাদেরকে জানাবে। এছাড়া কৃষি পরিবহনের প্রয়োজনে সেটা ব্যবহৃত হবে, তবে অদক্ষ এবং ১৮ বছরের নীচে কেউ যাতে চালাতে না পারে সে মোতাবেক সকল ইউনিয়ন পরিষদকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।