দোয়ারাবাজার উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদের উপনির্বাচনে শতকরা ২৩ ভাগ ভোট কাস্ট হওয়া কিছুদিন আগের ইউপি নির্বাচনের সাথে ভীষণ অসংগতিপূর্ণ। এমন না যে, উপজেলা পরিষদ নির্বাচনটি প্রতিদ্বন্দ্বিতা শূন্য ছিল। রীতিমত ইউনিয়ন পরিষদের মেজাজ নিয়েই এই উপনির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগের মূল প্রার্থী তো ছিলেনই, অবধারিতভাবে ছিলেন শক্তিশালী বিরোধী প্রার্থী। নামে না হলেও কাজে ছিলেন বিএনপি ও জাতীয় পার্টির প্রার্থী। সকলেই জিতে আসার জন্য প্রচারণামুখর পর্ব পার করে এসেছেন। তারপরেও ইউনিয়ন পরিষদের মত ভোটারদের আকৃষ্ট করতে পারেননি তারা। ইউপি নির্বাচনে যেখানে ৬০ শতাংশের মত ভোট পড়ে সেখানে কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে অনুষ্ঠিত এই উপনির্বাচনে মাত্র ২৩ শতাংশ ভোট কাস্ট হওয়ার কোন যুক্তি খোঁজে পাওয়া যায় না। ভোটাররা কি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন ইউপি নির্বাচনের চরম গরম পরিস্থিতির কারণে? নাকি প্রার্থীরা তেমন করে তাদের টানতে পারেননি? এর বহুবিধ উত্তর হতে পারে। যেমন আওয়ামী লীগের মূল প্রার্থী গণমাধ্যমকে ভোটের পর বলেছেন, তিনি বুঝে নিয়েছিলেন ভোটের ফলাফল কেমন হতে পারে, তাই শেষ দিকে এতটা সিরিয়াস হননি। একই ধরনের কথা বলেছেন ওই উপজেলার আওয়ামী লীগ নেতা ডিনি সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানও বটে, তিনি বলেছেনÑ নৌকার প্রার্থী একজন ব্যবসায়ী। তিনি প্রচারণাপর্বে ব্যবসায়ীসুলভ আচরণের বাইরে বেরিয়ে আসতে পারেননি। তিনি গুরুতর অভিযোগ যেটি তোলেছেন সেটি হলÑ প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে তৃণমূলের মতামত প্রাধান্য পায়নি। তৃণমূল, জেলা স্তর কিংবা কেন্দ্র, প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে সমন্বয়হীনতার অভিযোগ ইউপি নির্বাচনের শুরু থেকেই শোনা যাচ্ছে। ইউপি নির্বাচনে নৌকার ব্যাপক পরাজয় এই সমন্বয়হীনতার ফল হিসাবেই দেখছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। যা হোক, এ না হয় নৌকার প্রার্থীর বেলায় ঘটল। তাহলে অন্য প্রার্থীদের ক্ষেত্রে? সেখানে তো এরকম সমন্বয়হীনতার কোন যোগসূত্র ছিল না। দেখা যাচ্ছে সকলেই এই একটি জায়গায় সমানভাবে ব্যর্থ হয়েছেন, ভোটারদের কেন্দ্রে নিয়ে আসতে।
উপনির্বাচন বলে হয়ত ভোটাররা সিরিয়াস কম ছিলেন। ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন না থাকার কারণে কেন্দ্রমুখী করতে ভোটারদের উপর চাপও কম ছিল। বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি দলীয় পরিচয়ে নির্বাচন করেনি। তাই তারা ঠিক রাজনৈতিক মেজাজে প্রচারণা চালাতে পারেনি। আর নৌকার প্রার্থী ছিলেন নিষ্প্রভ। এর মাঝে কিছুটা উজ্জ্বল ছিলেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী। তিনি এর ফল কুড়িয়েছেন। মোট ভোটারের মোটামুটি ১২ শতাংশ আর কাস্টিং ভোটের ৫৩ শতাংশ সমর্থন নিয়ে তিনি সামনের দুই বছরের জন্য দোয়ারাবাজার উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের চেয়ারটি নিজের দখলে নিলেন। অভিনন্দন তাঁকে। তাঁর মাধ্যমে ওই উপজেলার সর্বোচ্চ স্তরের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষমতা দেখাবে এই আমাদের কামনা।
নির্বাচন মানেই গণতান্ত্রিক অনুশীলন। আমরা জাতিগতভাবে সর্বাবস্থায় নির্বাচনের মাধ্যমেই জনপ্রতিনিধি বেছে নেয়ার বিষয়টিকে পছন্দ করি। তাই যেকোন নির্বাচন আসলেই সকলে একে উৎসবে পরিণত করে ফেলেন। এই অভ্যাস জনসাধারণের গণতান্ত্রিক পদ্ধতির প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের পরিচয় বহন করে। এই গণতন্ত্রপ্রীতিই হতে পারে আমাদের একমাত্র রক্ষাকবচ, জাতীয় ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখার সর্বোত্তম পদ্ধতি। তাই রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দল; সকলকেই এই নির্বাচনী ব্যবস্থাকে আস্থায় রাখতে হবে। সদ্যসমাপ্ত ইউপি নির্বাচনগুলো অনেক সমালোচনার মধ্যেও একটি জায়গায় আলো ছড়িযেছে, সেটি হলোÑ নিরপেক্ষতা। নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করা হয়েছে, এমন অভিযোগ শোনা যায়নি কারও মুখ থেকে। তাই ক্ষমতাসীন দলের নেতারা দলে দলে পরাজিত হলেও এ নিয়ে কোন টু শব্দ পাওয়া যায়নি। জনরায় এমনই। পক্ষে বা বিপক্ষে গেলে সমানভাবে গ্রহণ করতে হয়। এই জায়গায় দোয়ারাবাজার উপজেলা পরিষদের উপনির্বাচনের ফলাফলও গণতন্ত্রের বিজয়। গণতন্ত্রের এমন বিজয় সামনের দিনে আরও আলো ছড়াক এই আমাদের কামনা।
- নদীতে নিয়োজিত সেন্ট্রিদের বিরুদ্ধে তাহিরপুরে বিক্ষোভ মিছিল
- লজ্জাজনক ভোট পেলেন আ.লীগ ও জাপার প্রার্থী

