এনামুল হক, ধর্মপাশা
ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের সংগঠন ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের (টিডব্লিউ) সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার চেয়ারম্যান আশুতোষ হাজং দীর্ঘ বছর ধরে নিজ সম্প্রদায়ের জীবনমান উন্নয়নের জন্য বরাদ্দকৃত বিভিন্ন প্রকল্প নয়ছয় করে ভোগ দখল ও উপকারভোগীদের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে নিজে লাভবান হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। আশুতোষ হাজং বংশীকুন্ডা উত্তর যুবলীগের সাবেক সহ-সভাপতি হওয়ায় দলীয় প্রভাব খাটিয়ে এমনটি করছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। সপ্তাহখানেক আগে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া শিক্ষার্থীসহ স্থানীয়রা আশুতোষ হাজংয়ের বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগ নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে আসতে চাইলে বংশীকুন্ডা উত্তর ইউনয়িন পরিষদ চেয়ারম্যান বিল্লাল হোসেন বিষয়টি স্থানীয়ভাবে নিষ্পত্তি করে দিবেন বলে দায়িত্ব নেন। এ নিয়ে স্থানীয়ভাবে সালিশ বৈঠক হলে আশুতোষ হাজং উপকারভোগীদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার বিষয় স্বীকার করেন। যার ভিডিও চিত্র স্থানীয়দের কাছে সংরক্ষিত আছে। তাই আশুতোষ হাজংকে তাদের সংগঠনের পদ থেকে বহিস্কারের দাবি ভূক্তভোগীদের।
উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯-২০ অর্থ বছরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বিশেষ এলাকার উন্নয়ন সহায়তা শীর্ষক কর্মসূচির আওতায় ধর্মপাশা উপজেলার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের মাঝে ১০টি সেমিপাকা ঘর, ৩০টি বাইসাইকেল, শিক্ষা বৃত্তি, শিক্ষা উপকরণসহ ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সামগ্রীর জন্য ৩০ লাখ ৭০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। গত ১৯ মে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বংশীকুন্ডা উত্তর ইউনিয়নের ঘিলাগড়া গ্রামে অবস্থিত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক উপকেন্দ্রে ওইসব সামগ্রী উপকারভোগীদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে। কিন্তু আশুতোষ হাজং সেমিপাকা ঘর বরাদ্দের তালিকায় নাম অন্তর্ভূক্ত করার জন্য ১৫ হাজার, বাইসাইকেলের জন্য ১ হাজার, শিক্ষা বৃত্তির তালিকায় নাম অন্তর্ভূক্ত করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য কাছ থেকে ৫০০ এবং স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৩০০ টাকা করে আদায় করেছেন। এছাড়াও আশুতোষ হাজংয়ের বিরুদ্ধে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক উপকেন্দ্র নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। বছর না ঘুরতেই প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন জায়গায় ফাটল দেখা দিয়েছে। বায়োগ্যাস প্লান্ট নির্মাণ না করে এবং খামার ঘর নির্মাণ ও গোখাদ্য প্রস্তুতে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সরকারি পাওয়ার ট্রিলার ভাড়া দিয়ে চালিয়ে নিজেই টাকা আত্মসাত করে চলেছেন তিনি। গত বুধবার দুপুরে ঘিলাগড়া গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে ভূক্তভোগীদের সাথে কথা বলে আশুতোষ হাজংয়ের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের সত্যতা পাওয়া যায়।
সেমিপাকা ঘরের উপকারভোগী অনিমা হাজং ও অনামিকা হাজং জানান, ঘরের জন্য ১৫ হাজার টাকা করে আশুতোষ হাজংয়ের স্ত্রীকে দিয়েছেন। অনিমা হাজং ঋণ করে সেই টাকা সংগ্রহ করেছেন বলে জানান।
কাইটাকোনা গ্রামের বাসিন্দা অনিল চিমিম বলেন, ‘আমি ঘরের জন্য জমি বিক্রি করে ২০ হাজার টাকা সংগ্রহ করেছিলাম। কিন্তু পরে যখন জানতে পারলাম এই টাকার কথা কাউকে বলা যাবে না তখন ভাবলাম কিছুটা সমস্যা আছে। তাই আমি টাকা দেইনি আর ঘরও পাইনি।’
শাহজাহান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শিবানন্দ হাজং বলেন, ‘শিক্ষা বৃত্তি ফ্রিতে পাওয়ার কথা থাকলেও আমাদের কাছ থেকে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা করে নেওয়া হয়েছে। যারা ১ হাজার করে টাকা দিতে পেরেছে তাদেরকেই বাইসাইকেল দেওয়া হয়েছে। তালিকায় নাম অন্তর্ভূক্তের জন্য মাস তিনেক আগে টাকা সংগ্রহ করা হয়। অনেকেই টাকা দিয়েও নাম অন্তর্ভূক্ত করতে পারে না। করোনা পরিস্থিতির কারণে এখন এলাকায় অবস্থায় বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।’
স্থানীয় বাসিন্দা বিশ্বজিৎ হাজং বলেন, ‘খামারের কার্যক্রম চালু নেই। আমরা খামারে হিসাব চেয়েও পাইনা।’
নিজেকে খামারের উপকারভোগী দাবি করে রেলিমেন্ট হাজং বলেন, ‘প্রায় সাত বছর আগে খামার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তখন থেকেই আমি খামারের উপকারভোগী কিন্তু তা কিছুদিন আগে জানতে পারলাম। খামার থেকে এখন পর্যন্ত কোনো উপকার পাইনি।’
বংশীকুন্ডা উত্তর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বিল্লাল হোসেন বলেন, ‘কিছু উপকারভোগীর কাছ থেকে টাকা নিয়েছে বলে আশুতোষ হাজং স্বীকার করেছে। উপকারভোগীদের কাছ থেকে নেওয়া টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে বলে আশুতোষ হাজং জানিয়েছে।’
এ ব্যাপারে অভিযুক্ত আশুতোষ হাজং সাথে মুঠোফোনে কথা বলতে যোগাযোগ করা হলে তিনি মুঠোফোন রিসিভ করেননি। তবে সংগৃহিত সালিশের ভিডিও চিত্রে দেখা যায় আশুতোষ হাজং উপকারভোগীদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মুনতাসির হাসান বলেন, ‘আশুতোষ নামের ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে এমন অভিযোগের তদন্ত করা হবে। যদি সে দোষী সাব্যস্ত হয় তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’


