ধর্মপাশা প্রতিনিধি
বজলু মিয়া তাঁর অসুস্থ্য স্ত্রী রাহিমা আক্তারকে ধর্মপাশা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেছেন গত শনিবার সকালে। শনিবার সকাল থেকে সোমবার দুপুর পর্যন্ত রাহিমা আক্তার নারী ওয়ার্ডের টয়লেট ব্যবহার করতে গিয়ে পানির সমস্যায় ভুগেছেন। হাসপাতাল ভবনের ওপর বসানো ট্যাংকিতে পানি না থাকায় বজলু মিয়া হাসপাতাল চত্বরে থাকা নলকূপ থেকে বালতি দিয়ে টয়লেটে পানি সরবরাহ করেছেন। মহিলা ওয়ার্ডের পশ্চিমে অবস্থিত পুরুষ ওয়ার্ডেরও একই অবস্থা। কোনো টয়লেটেই পানি নেই। ফলে রোগীর সাথে আসা লোকজন বজলু মিয়ার মতই নিচ থেকে দুতলায় পানি তুলে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
সোমবার দুপর একটার দিকে সরেজমিনে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার পাইকুরাটি ইউনিয়নের গাছতলা গ্রামের বজলু মিয়া মহিলা ওয়ার্ডের সামনে একটি খালি বিছানায় হতাশ হয়ে বসে আছেন। তিনি বলেন, ‘কল থাইক্যা হানি টাইন্যা উপরে আনন লাগে। রাইত অইলে ঠিকমতো বাত্তি জ্বলে না। আইছি থাইক্যা কারেন্ট নাই।’
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট (ইপিআই) গোলাম আসকার জানান, ‘জেনারেটর চালিয়ে কোনো রকমে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির সাত প্রকারের ৩/৪ হাজার টিকা ফ্রিজে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। যদি জেনারেটরে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়া তাহলে কুল (ঠান্ডা) বক্সে বরফ দিয়ে টিকাগুলো সর্বোচ্চ চারদিন সংরক্ষণ করা যাবে।’
হাসপাতালের জুনিয়র মেকানিক আব্দুর রাজ্জাক জানান, বিদু্যুৎ সরবরাহ না থাকায় পানি উঠানো যাচ্ছে না তাই হাসপাতালে পানি সংকট দেখা দিয়েছে। হাসপাতালের আবাসিক ভবনগুলোতে পানি নেই।’
ধর্মপাশায় গত শুক্রবার সকাল থেকে সোমবার বিকেল তিনটায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। নেত্রকোনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির অধীনে ধর্মপাশায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। শুক্রবার সকালে নেত্রকোনা জেলা সদরসহ বিভিন্ন উপজেলায় প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় হলে ধর্মপাশা, মোহনগঞ্জ, বারহাট্টা, কলমাকান্দা উপজেলায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিছিন্ন হয়। এতে করে ওইসকল উপজেলার গ্রাহকদেরকে তিনদিন ধরে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকায় ধর্মপাশা উপজেলার মানুষজনের পানীয় জলের অভাব, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতাসহ বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিয়েছে। বিদ্যুৎ নির্ভর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে। যদিও জেনাটের দিয়ে কোনো রকমে ব্যবসায়ীরা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন তবে এ ক্ষেত্রে সেবা নিতে গ্রাহকদেরকে বাড়তি টাকা গুণতে হচ্ছে। ব্যাটারী চালিত অটো রিকশা, ইজিবাইজের চালকেরা পড়েছেন বিপাকে। জেনারেটর দিয়ে অটোরিকশা, ইজিবাইক চার্জ করাতে ২০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে চালকদের। ফলে উপজেলা বিভিন্ন সড়কে চলাচলকারী যাত্রীদের অতিরিক্ত ভাড়া গুণতে হচ্ছে। মোবাইল ফোনে চার্জ না থাকায় কারও কারও জরুরি যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। নেত্রকোনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঘূর্ণিঝড়ের কারণে নেত্রকোনার সদর উপজেলার বড়গাড়া ও ছোটগাড়া নামক স্থানে বৈদ্যুতিক লাইনের কযেকটি খুঁটি ভেঙে যাওয়ায় এ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।
ধর্মপাশা থানা রোডের বাসিন্দা খলিলুর রহমান বলেন, ‘বিদ্যুৎ না থাকায় ফ্রিজে রাখা প্রয়োজনীয় খাবার সামগ্রী নষ্ট হয়েছে। ফ্রিজে রাখা মাছ শুটকি দিয়ে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। পানির জন্য কষ্ট করতে হচ্ছে।’
উপজেলার কোর্ট গেইট সংলগ্ন স্বপ্ন কম্পিউটারের মালিক বিদ্যুৎ কুমার সিংহ বলেন, ‘বিদু্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকায় ব্যবসায় খুব ক্ষতি হচ্ছে। জেনারেটর চালিয়ে সেবা দিচ্ছি।’
উপজেলার মধ্যনগর বাজারের বাসিন্দা আলাউদ্দিন জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ না থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন মধ্যনগরবাসী। পর্যাপ্ত নলকূপ না থাকায় নদীর পানি দিয়ে গৃহস্থালী কাজসহ গোসলের কাজ করা হচ্ছে। তবে খাওয়ার পানির জন্য চরম কষ্ট ভোগ করতে হচ্ছে।
ধর্মপাশা সদরের অটো রিকশা চালক রানা মিয়া জানায়, ইজিবাইকের ব্যাটারী চার্জ করতে গিয়ে অতিরিক্ত টাকা লাগছে। ফলে দিন শেষে মালিকের আমদানির টাকা দিতে গিয়েই হিমশিম খেতে হচ্ছে।
নেত্রকোনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জিএম মুজিবুর রহমান জানান, বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে তাঁদের সর্বাত্মক চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। সোমবার সন্ধ্যার মধ্যে ধর্মপাশায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হতে পারে বলে জানান তিনি।


