ধানের পর মাছের সর্বনাশ দ্রুত ব্যবস্থা নিন

ধানের পর এবার মাছের মড়ক লেগেছে। শোনা যাচ্ছে হাঁসের মড়কের কথাও। অর্থাৎ হাওর নির্ভর অর্থনীতির যেসব উপাদান তার সবগুলোই আজ মহা বিপন্ন। সবকিছু মিলিয়ে এক মানবিক মহাবিপর্যয়ের সামনে আজ জেলার মানুষ। এই দুর্যোগ কীভাবে সামাল দেওয়া যাবে সে নিয়ে রাষ্ট্র যেমন চিন্তিত তেমনি দুশ্চিন্তায় এলাকার বিপন্ন মানুষগুলো। রাষ্ট্রপতির সরেজমিন হাওর পরিদর্শনের পর গতকাল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী ঘুরে গেলেন। সকলের উদ্দেশ্য একটাই, আসন্ন দুর্যোগকে (এই দুর্যোগ কার্যত শুরু হয়ে গেছে) কীভাবে মোকাবিলা করা যায় সেটি বের করা। আশার কথা হলো মানুষের এই বিপদের দিনে রাষ্ট্র ও সরকার হাত গুটিয়ে বসে নেই। সরকার প্রধান প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন হাওরাঞ্চলের একটি মানুষও না খেয়ে মারা পড়বে না। বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও আর্থিক সক্ষমতা এখন যে পর্যায়ের তাতে হাওরাঞ্চলের এই দুর্যোগ মোকাবিলা খুব কঠিন কাজ হবে না বলেই মনে করা হচ্ছে। তবে সেজন্য সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জড়িতদের আন্তরিকতার উপর নির্ভর করে এর সফলতা।
হাওরে কাঁচা ধানগাছগুলো ডুবে যায়। এখন ওই ধানগাছগুলো পানির নীচে পঁচতে শুরু করেছে। ধানগাছে ছিটানো হয়েছিলো ব্যাপক হারে কীটনাশক। জমিতে দেয়া হয়েছিলো রাসায়নিক সার। ধানগাছ পঁচন ও এইসব রাসায়নিক বিক্রিয়াজনিত কারণে হাওরের পানিতে তৈরি হয়েছে বিষাক্ত এমোনিয়া গ্যাস। কমে গেছে পানির অক্সিজেন। প্রতিক্রিয়ায় জলজ প্রাণী মারা পড়ছে। মরে ভেসে উঠছে মাছ। এখন হাওরের এই বিষাক্ত পানি নদীতে এসে যাচ্ছে। সুরমা নদীর নানা স্থানে মাছ মরার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এদিকে হাওরের উপর নির্ভরশীল এই এলাকার হাঁসখামারীরা। হাওরে বিচরণ করতে যেয়ে নানা জায়গায় হাঁসগুলোও আক্রান্ত হচ্ছে। হাওরের দূষিত পানি বিশুদ্ধ হওয়ার প্রধান উপায় হলো প্রচুর বৃষ্টিপাত। প্রাকৃতিকভাবে পানি প্রবাহের মধ্য দিয়ে বিষাক্ত উপাদানগুলো অপসারিত হতে হতে ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ বাড়তেই থাকবে। সরকারি উদ্যোগে কিছু চুন ও অন্যান্য পানি বিশুদ্ধকরণ সামগ্রী ছাড়া হচ্ছে বটে তবে বিশাল হাওর অঞ্চলের তুলনায় তা সমুদ্রের মাঝে একবিন্দু বারি সম। রাসায়নিক বিক্রিয়ায় মাছের কী পরিমাণ ক্ষতি হচ্ছে তার একটি চিত্র পাওয়া যায় সিলেট বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের উপ পরিচালক মোশায়েফ হোসেনের দেয়া তথ্যে। জগন্নাথপুরের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ঘুরে গণমাধ্যম কর্মীদের মঙ্গলবার তিনি জানিয়েছেন, ‘গত তিন দিনে জগন্নাথপুরের বিভিন্ন হাওরে এমোনিয়া গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে ৫.২৫ মেট্রিক টন মাছ মারা গেছে’। তাঁর এই বক্তব্য থেকে পুরো হাওর অঞ্চলে ইতোমধ্যে ক্ষতি সাধিত এবং ভবিষ্যতে ক্ষতি হবে এমন মৎস্যসম্পদের একটি ধারণা পাওয়া যায়। কৃষকদের সর্বনাশের পর এবার মৎস্যজীবীদের জীবন-জীবিকায় যে ভয়াবহ সর্বনাশের সূচনা হলো তা জেলার অর্থনীতির মেরুদ- ভেঙ্গে দিবে।
মৎস্য অধিদপ্তরের নিকট আমাদের অনুরোধ, মিঠাপানির মাছের প্রধান উৎস এই হাওরাঞ্চলের মৎসসম্পদ রক্ষায় দ্রুত যা ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিৎ তা করুন। এখন মাছেদের প্রজননকাল। অধিকাংশ মাছই ডিমওয়ালা। তাই এখন একটি মাছ মরে যাওয়ার অর্থ কয়েক লক্ষ মাছের জন্মকে আটকে দেয়া। এরকম মৎস্যবিপর্যয়ের প্রতিক্রিয়া সামনের অনেকগুলো বছরেও কাটিয়ে উঠা সম্ভব হবে না। সুতরাং ক্ষয়-ক্ষতি সর্বনি¤œ পর্যায়ে রাখতে বিশাল হাওরের সর্বত্র রাসায়নিক বিষক্রিয়াকে নষ্ট করার ওষুধপত্র প্রয়োগ করতে হবে।
আক্রান্ত মাছ ধরা ও খাওয়া থেকে বিরত থাকতে সরকারিভাবে মানুষের প্রতি আহ্বান জানানো হচ্ছে। এই বিষাক্ত মাছগুলো মানবদেহের জন্য ক্ষতির কারণ। আমরাও সর্বসাধারণকে এই ধরনের মাছ ধরা ও খাওয়া থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাই।