নদী যখন কষ্ট হয়ে দাঁড়ায়..

আসাদ মনি
নদী শুকিয়ে যাওয়ায় (পাটনাই নদী) ৩০ বছর ধরে কষ্টে আছেন সুনামগঞ্জের তাহিরপুর সীমান্তের প্রায় দেড় লাখ মানুষ। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বৃহৎ শুল্ক স্টেশন বড়ছড়া’র প্রায় ৪০০ আমদানীকারকের দুঃখ হয়ে আছে এই নদী। আমদানীকারকরা ভারতের মেঘালয় থেকে কয়লা-পাথর আমদানী করে প্রায় ৫ গুণ পরিবহন খরচ দিয়ে একেক সময় একেকভাবে কয়লা-পাথর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে দিচ্ছেন।
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর সীমান্তের বড়ছড়া শুল্ক স্টেশন চালু হয় ১৯৯১ সালে। সেই থেকেই ভারতের মেঘালয় থেকে শুস্ক মৌসুমে কয়লা পাথর আমদানী হয়ে আসছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কয়লা-পাথর সরবরাহ হয় শুষ্ক সময়েই বেশি। সম্ভাবনাময় এই শুল্কস্টেশনের আমদানীকারকদের কষ্ট এখন পাটনাই নদী। পাহাড়ি এই নদী শুকিয়ে যাওয়ায় হেমন্তে কয়লা বুঝাই নৌকা চলাচল করতে পারে না।
প্রবীণ আমদানীকারকরা জানালেন, শুল্ক স্টেশন চালু হবার শুরুর দিকে পাটনাই নদীর ডাম্পেরবাজার নতুনবাজার এলাকায় বাঁধ দিয়ে পানি আটকে রাখা হতো। তখন এই ৫ কিলোমিটার ছোট ছোট নৌকা দিয়ে ৪-৫ টন করে কয়লা ডাম্পেরবাজার পর্যন্ত নেওয়া হতো। পরে বাঁধের কাছে নদীরপাড়ে কয়লা আনলোড করে আবার বড় বাল্কহেড বা ট্রলারে তুলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কয়লা পাথর পৌঁছে দিতেন আমদানীকারকরা। বছর বছর নদীর বুকে বাঁধ দেওয়ায় এই দুঃখ আরও বেড়েছে। পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে নেমে আসা পলি ও বালিতে নদী ভরাট হয়েছে বছর বছর। গত প্রায় ৬ বছর হয় ডাম্পের বাজারে বাঁধ দিলেও বড়ছড়া থেকে ডাম্পের বাজার পর্যন্ত শুকনো মওসুমে নৌকা চালানো যায় না। ভাটির দিকে শ্রীপুর পর্যন্ত নদী ভরাট হয়েছে।
তাহিরপুর কয়লা আমদানীকারক গ্রুপের সদস্য সচিব রাজেশ তালুকদার বললেন, ১৯৯১ সালে বড়ছড়া শুল্ক স্টেশন চালু হবার পর নদীতে বাঁধ দিয়ে পানি আটকে রেখে শুকনো মওসুমের কয়েক মাস বড়ছড়া থেকে ডাম্পেরবাজার বাঁধ পর্যন্ত ছোট নৌকা দিয়ে কয়লা পরিবহন করা হয়েছে। বাঁধের পাশে নদীরপাড়ে কয়লা নামিয়ে শেষে আরেক ট্রলারে বা বাল্কহেড’এ তুলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ হতো। এখন নদী আরও বেশি ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি আটকানো হয় না। বাঁধের একটি অংশ দিয়ে পানি ছেড়ে দেওয়া হয়। ছোট ছোট ট্রলি দিয়ে টেকেরঘাট হয়ে ডাম্পেরবাজার পর্যন্ত ৫ কিলোমিটার অংশ মাটির সড়ক দিয়ে কয়লা পরিবহন করা হয়। নদীর বুকে দেওয়া বাঁধ দিয়ে ওপারে কয়লা পরিবহনের পর আবার ছোট নৌকা দিয়ে শ্রীপুর জনতা উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশে নেওয়া হয় কয়লা। শেষে বাল্কহেড বা ট্রলারে কয়লা বোঝাই করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয়। রাজেশ জানালেন, নদী খননের দাবি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবসহ দায়িত্বশীল কর্র্তৃপক্ষের নিকট আবেদন করা হয়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে বাঁধ অপসারণ করে নদী খনন করতে হবে।
পাটলাই নদীর পাড়ের গ্রাম দুধের আউটার বাসিন্দা মো. মমরুল ইসলাম বললেন, নদীর বুকে বাঁধ দেওয়ায় পাহাড়ি ঢলের পানি ভাটির দিকে নামতে বাধাগ্রস্ত হয়, একারণে নদী বেশি ভরাট হয়েছে। পাহাড়ি ঢল এখন বাড়িঘরের ক্ষতি করছে।
বালিয়াঘাটের বাসিন্দা মোশাহিদ খাঁন স্বপন বললেন, নদীতে বাঁধের কারণে নদীর স্বাভাবিক গতি নষ্ট হয়েছে। এ কারণে পাটনাইয়ে নাব্যতা সংকট বেড়েছে।
সুনামগঞ্জ পরিবেশ আন্দোলনের (সুপা) সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. মলয় চক্রবর্ত্তী রাজু বললেন, বাংলাদেশের নদ নদীর সংশোধিত আইনে বলা হয়েছে নদী একটি জীবন্ত সত্ত্বা। নদীর দখল, অবকাঠামো নির্মাণ, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করে কাজ করা আইন বিরোধী। পাটনাই নদীতে বাঁধ দেওয়া পরিবেশের বিপর্যয়ের কারণ হচ্ছে। শুকিয়ে যাওয়া নদী এখন মরুভূমিতে রূপ নিয়েছে।
তাহিরপুর কয়লা আমদানীকারক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক মোশারফ হোসেন বললেন, পাটনাই নদী খনন করে নৌচলাচল স্বাভাবিক হলে এখন যে কয়লা প্রতিদিন এই পথ দিয়ে ট্রলি দিয়ে বহন করা হয়, এর ৪-৫ গুণ বেশি কয়লা বহন করা সম্ভব হবে। আশপাশের এলাকার মাটিয়ান হাওরসহ ছোট বড় হাওরের ফসলি জমি অকাল বন্যা থেকে রক্ষা পাবে।
তাহিরপুর কয়লা আমদানিকারক গ্রুপের সভাপতি আলকাছ উদ্দিন খন্দকার বললেন, আগে নদীতে বাঁধ দেয়া হতো। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিষেধাজ্ঞা আসায় বাঁধ ভেঙে দেয়া হয়। এরপর প্রায় ৬ বছর কয়লা আমদানি রপ্তানি বন্ধ ছিলো। এখন নদীতে পানি নেই, বিকল্প কোনো সড়ক না থাকায় পানি নিস্কাশনের ব্যবস্থা রেখে নদীর বুকে বাঁধ দেওয়া হয়েছে। এই বাঁধের উপর দিয়ে ট্রলি দিয়ে কয়লা বহন করা হচ্ছে।
তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান করুণা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল বললেন, পাটনাই নদী খনন জরুরি, আমদানীকারকরা বহুবছর ধরে কষ্টে আছেন, নদী খননের বরাদ্দ হলেই কেবল চলবে না, খনন কাজে আমদানীকারক সমিতিকে যুক্ত করতে হবে, না হয় কেবল টাকার অপচয় হবে, কাজের কাজ হবে না কিছুই।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জহুরুল ইসলাম বললেন, তাহিরপুরের সীমান্ত নদী পাটনাই ও বৌলাই নদী খননের সমন্বিত একটি প্রজেক্ট প্রফর্মা (ডিপিপি) পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। প্রকল্প অনুমোদন হলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।