নারীর প্রতি সহিংসতা

সজীব দে
বছরের সব আলোচিত ঘটনাকে হার মানিয়েছে ১৬ ডিসেম্বর দিরাই উপজেলায় এসএসসি পরীক্ষার্থী মুন্নি হত্যা। ঘোষণা দিয়ে বখাটে ইয়াহিয়া মুন্নিকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে। এছাড়াও ১২ বছরের শিশুকে গরম রডের ছ্যাকা, ইউপি কার্যালয়ে গৃহবধূকে মারধর, বিদ্যালয়ে বখাটেদের হামলা, কয়েকটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকের যৌন হয়রানি, কু প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় ছাত্রীকে মারধর, জগন্নাথপুরে নির্যাতনের কারণে আত্মহত্যা এবং উত্যক্তের কারণে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। সারা বছর জুড়ে জেলায় নারীর প্রতি এসব সহিংসতা নিয়েই আজকের সালতামামি।
ইউপি কার্যালয়ে লাঞ্ছিত গৃহবধূ
ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০১৭
মোহনপুর গ্রামের প্রবাসীর স্ত্রীর সাথে ধান কেনার পাওনা টাকা নিয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য রইছ মিয়ার কথা কাটাকাটি হয়। ঘটনার প্রেক্ষিতে মোহনপুর ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে শালিস বৈঠকে এক পর্যায়ে ইউপি সদস্য মো. রইছ মিয়া, তার ছেলে ও শ্যালক উত্তেজিত হয়ে ওই মহিলাকে বেধড়ক মারধর করেন। ইউনিয়ন পরিষদের ৪ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সামছুন নুরসহ স্থানীয়রা ওই গৃহবধূকে উদ্ধার করে জয়নগর বাজারে গ্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে রাতে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি করেন।
যৌন নিপীড়ক শিক্ষক
শিশু শিক্ষার্থীদের যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠে     বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার বাদাঘাট (দ.) ইউনিয়নের মধুপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক সৈয়দ আলফাজ উদ্দিনের বিরুদ্ধে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তদন্তে সত্যতা পেলে ২২ দিনের ছুটি নিয়ে বিদ্যালয় ছাড়েন অভিযুক্ত সহকারি শিক্ষক সৈয়দ আলফাজ উদ্দিন। মধুপুর গ্রামের শিশু শিক্ষার্থীদের অভিভাবকগণও সহকারি শিক্ষক সৈয়দ আলফাজ উদ্দিনের শাস্তি দাবি করেন।
প্রতিবাদ করায় বিদ্যালয়ে হামলা
এপ্রিল ১১, ২০১৭
জগন্নাথপুরে পৌর শহরের আবদুল খালিক উচ্চ বিদ্যালয়ে ৭ম শ্রেণির এক ছাত্রীকে পৌর এলাকার পারুয়া বাড়ির বাসিন্দা সিরাজুল ইসলামের বখাটে পুত্র তারেক মিয়া ওরফে বাবর বিদ্যালয় ছুটির পর বাড়ি ফেরার পথে ছাত্রীর পথরোধ করে ওড়নায় টানা হেছড়া করে। ছাত্রীর চাচাত ভাই ও ওই বিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র হবিবনগর এলাকার বাসিন্দা আবদুল জব্বারের পুত্র আনহার মিয়া প্রতিবাদ করে বখাটেকে মারধর করে। এ ঘটনায় ক্ষিপ্ত হয়ে বখাটে বাবর’র নেতত্বে ৭/৮ বখাটে দেশীয় অস্ত্র সস্ত্রে সজ্জিত হয়ে পরদিন সকালে বিদ্যালয়ে গিয়ে আনহার মিয়ার ওপর হামলা চালায়। অপর শিক্ষার্থীরা এগিয়ে এলে বখাটেরা হামলা চালিয়ে ৫ শিক্ষার্থীকে আহত করে পালিয়ে যায়।
শিক্ষকের ভয়ে স্কুলে যাওয়া বন্ধ ছাত্রীর
এপ্রিল ২৭, ২০১৭
ধর্মপাশা উপজেলার ভাটকপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সিদ্দিকুর রহমান ভূঁইয়ার ভয়ে বিদ্যালয় ছাড়ে এক ছাত্রী। পরীক্ষা হলে শিক্ষক সিদ্দিকুর রহমান ভূঁইয়া ছাত্রীর স্পর্শকাতর স্থানে হাত দেন। ছাত্রীটি পরীক্ষা শেষ করে বাড়ি ফিরে তার ভাবি ও মা কে বিষয়টি জানায়। এরপর থেকে ছাত্রীটি শিক্ষকের ভয়ে আর পরীক্ষা দিতে বিদ্যালয়ে যায় নি। ঘটনা ধামাচাপা দিতে শিক্ষকের পক্ষ থেকে ছাত্রীর পরিবারকে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি ও ছাত্রীর ছবি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ারও হুমকি দেন। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বিষয়টি জানতে পেরে ওইদিন বিকেলেই বিদ্যালয়ে তদন্তে যান এবং তিনি এ বিষয়টি লিখিতভাবে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানান। প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে শিক্ষক সিদ্দিকুর রহমান ভুইয়াকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
বিচার চাইতে গিয়ে সংঘর্ষ
জুন ১, ২০১৭
ছাতক কালারুকা ইউনিয়নের রাজাপুর পশ্চিমপাড়া গ্রামের এক কিশোরীকে উত্যক্ত করতো একই গ্রামের হানিফ আলীর পুত্র মছব্বির আলী। এ ঘটনা কিশোরীর মা তার মেয়েকে উত্যক্ত করার বিষয়ে হানিফ আলীর বাড়িতে গিয়ে বিচারপ্রার্থী হলে মছব্বির আলী ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। পরদিন এ নিয়ে উভয় পক্ষের লোকজনের সংঘর্ষে নারীসহ অন্তত ৩৫ ব্যক্তি আহত হন।
ছাত্রীকে পিটালেন শিক্ষক
জুন ৭, ২০১৭
প্রধান শিক্ষকের কুপ্রস্তাবে রাজী না হওয়ায় নিজ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির এক স্কুল ছাত্রীকে মারপিট করে আহত করেন তাহিরপুর উপজেলার কাউকান্দি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আমিরুল ইসলাম। স্কুল ছাত্রীর বাবা শিক্ষকের বিরুদ্ধে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নিকট লিখিত অভিযোগ করেন। তদন্তে সত্যতা প্রমাণিত হওয়ায় প্রধান শিক্ষক আমিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে আাইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটিকে চিঠি দেন তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম।
শিশুকে গরম রডের ছ্যাকা
জুলাই ১, ২০১৭
পৌর শহরে আপন চাচাতো ভাইয়ের স্ত্রী আকলিমা আক্তারের হাতে লোমহর্ষক নির্যাতনের শিকার হয় জলিলপুর গ্রামের পিতা-মাতাহীন ১২ বছরের এক শিশু। কথা কাটাকাটির জের ধরে শিশুর দুই হাত, বাম গাল ও ডান চোখের নিচে গরমে রডের ছ্যাকা দেয়া হয়। এতে ডান হাত ও ডান চোখের নিচের চামড়া জ্বলে ক্ষতের সৃষ্টি হয়। শিশুর কান্না শুনে পরিবার ও আশপাশের লোকজন এগিয়ে আসলে বাবার বাড়ি পালিয়ে যায় আকলিমা।
ঘরে ঢুকে ছুরিকাঘাতে স্কুলছাত্রী খুন
ডিসেম্বর ২১, ২০১৭
দিরাই পৌর শহরের আনোয়ারপুরের নয়া হাটির মাদানী মহল্লার সুমাইয়া আক্তার মুন্নীকে ১৬ ডিসেম্বর রাতে ঘরে ঢুকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে বখাটে ইয়াহিয়া। এ সময় মুন্নী ও তার ছোটভাই ঘরের ঐ কক্ষে পড়ছিল। হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যায় মুন্নী। বখাটে ইয়াহিয়াকে গ্রেফতার ও শাস্তির দাবিতে তার সহপাঠিসহ সকল স্তরের মানুষ কর্মসূচি পালন করেন। অবশেষে ২০ ডিসেম্বর রাতে মুন্নীকে হত্যাকারী বখাটে ইয়াহিয়া সরদারকে সিলেট নগরের একটি বাসা থেকে গ্রেফতার করে সুনামগঞ্জ জেলা পুলিশ। পরে দিরাই আদালতে ইয়াহিয়া চৌধুরীকে হাজির করলে ১৬৪ ধারায় সে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।