নারী পুরুষের শ্রমে শক্ত হচ্ছে হাওরের অর্থনীতি

স্টাফ রিপোর্টার
হাওর ধান কাটতে ব্যস্ত সময় পাড় করছেন কৃষক। বছরের এই সময়ে অবসর বা দম ফেলার ফুসরত নেই তাদের। ২ লক্ষাধিক পুরুষ শ্রমিক ও এক হাজার হারভেস্টার মেশিনে ধান কাটলেও খলায় ধান শুকানোসহ গোলায় তোলার জন্য ধান প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজ করছেন নারীরা। হাওর ঘুরে দেখা গেছে, নারী পুরুষের শ্রমেই এবার ৩ হাজার ৮শ কোটি টাকার ধান গোলায় উঠছে।
সুনামগঞ্জে এবার ২ লাখ ২২ হাজার ৭৯৫ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে। আবাদকৃত জমিতে ধান উৎপাদানের লক্ষমাত্রা ধরা হয়েছে ১৩ লক্ষ ৫৩ হাজার মে. টন। যা চালের পরিমাণে দাড়ায় ৯ লাখ ২ হাজার মে. টন। আর টাকার অংকে প্রায় ৩ হাজার ৮শ’ কোটি টাকা।
জেলায় মোট ৩ লক্ষ ৭৮ হাজার কৃষক পরিবার রয়েছে। এই পরিবারগুলো সরাসরি হাওরে ধান চাষাবাদের সঙ্গে যুক্ত। পরিবারের পুরুষ সদস্যরা জমিতে বীজ বপন, রোপন ও ধান কাটাতে কাজ করেন। অপরদিকে পরিবারের নারী সদস্যরা, গবাদিপশুর জন্য খড় শুকানো, খলায় ধান শুকানো, উড়ানোর (ছাটা হওয়া ধান আলাদাকরণ) কাজসহ গোলায় তোলার প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজ করেন। এভাবেই নারী পুরুষের সম্মিলিত শ্রমে মজবুত হচ্ছে হাওরের অর্থনীতি।
শনির হাওর, মাটিয়ান হাওর, খরচার হাওর, ঝাওয়ার হাওর ও দেখার হাওরের কয়েকটি গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, হাওরে ধান কাটতে পুরুষ এবং মাঠে কাজ করছেন নারী। পুরুষরা ধান কাটলেও নারীরা মেশিনে মাড়াই, খড় নাড়া, ধানখলা তৈরি, ধান শুকানোসহ নানা কাজ করছেন। তাদের সঙ্গ দিচ্ছে স্কুল-কলেজ পড়–য়া শিক্ষার্থীরা। শুধু চাষী পরিবারের নারীরাই নন, শ্রমজীবী নারীরাও কাজে নেমেছেন হাওরে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বৈশাখী মওসুমে ধান কাটার সময় হাওরের চাষী পরিবারের নারী পুরুষ সাধারণত বাড়িতে থাকেন না। পুরুষরা হাওরের ধান কাটার কাজ করেন। নারীরা বাড়ি থেকে বেরিয়ে সেই ধান মাড়াই, গবাদিপশুর জন্য খড় সংগ্রহ, ধান শুকানো, খলাঘর তৈরিসহ সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করেন। অনেক নারী পরিবারের পুরুষের সঙ্গে হাওরের কান্দায় সাময়িক তৈরি খলাঘরেও অবস্থান করেন। কৃষক পরিবারের পাশাপাশি দরিদ্র ও শ্রমজীবী পরিবারের নারীরাও শ্রমিক হিসেবে হাওরে নেমে কাজ করতে দেখা গেছে।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের গোয়াছড়া গ্রামের বাসিন্দা আদরজান বিবি। দেখার হাওরে এবার ৫ কেয়ার (৩০ শতাংশে ১ কেয়ার) জমিতে বোরো ধান আবাদ করেছেন তার পরিবার। হাওরের কিনারে খলায় ধান শুকাতে কাজ করছিলেন তিনি।
এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমার ছেলে ৫ কেয়ার জমি করছে। ছেলে ধান কেটে খলায় এনে রেখেছে। পরে মেশিন দিয়ে মাড়াই করা হয়েছে। এখন খলায় ধান শুকাই, উড়াই, খেড় শুকাইতাছি।’
একই গ্রামের বাসিন্দা কামরুল নাহার বলেন, ‘আমরা ৪ কেয়ার জমিতে ধান চাষ করেছি। আমার স্বামী জমি থেকে ধান কেটে খলায় আনতেছে। পরে সেগুলো মাড়াই করে খলায় শুকাইছি। গরুর লাগি খড় শুকাইতাছি।’
সালেমা বিবি বললেন, ‘বৈশাখে বেডাইনতে কাছি দি (কাস্তে) ধান কাটে, বেডিনতে মাথা বইয়া মুইটের পোঝা (আটি বেঁধে) আনে, এরপরে ধানরে রৌইদে পুকানো লাগে, উড়ানো লাগে, বস্তাত ভড়া ও বাড়িতে নেওয়া লাগে, খলা ফুরন (পরিষ্কার করা) লাগে, বেডিনতের কষ্ট বেশি।’
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বিমল চন্দ্র সোম বলেন, মঙ্গলবার পর্যন্ত হাওরের ৮৩ ভাগ ধান কাটা শেষ হয়েছে। এছাড়াও নন হাওরে ২২ ভাগ ধান কাটা শেষ হয়েছে। গড়ে ৬৭ ভাগ বোরো ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে।
তিনি বলেন, এবছর ১ হাজার হারভেস্টার মেশিনের পাশাপাশি ২ লাখ ৬৫ হাজার শ্রমিক হাওরে ধান কাটছে। ধান মাড়াইয়ের পর শুকানো কাজে ৩ লক্ষ ৭৮ হাজার কৃষক পরিবারের নারী সদস্যরা কাজ করছেন। এবছর রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়া থাকায় প্রত্যেকে খুশি মনে কাজ করছেন। আমরা আশা করছি বাম্পার ফলনে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ফলন পাবো।