কুমার সৌরভ
সাহিত্য সংকলন প্রকাশকে আজকাল নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর শামিল গণ্য করা হয়। বাঁকা চোখের অনেকে এই জাতীয় ব্যক্তিদের অকর্মার ঢেঁড়ি বলতেও দ্বিধা করেন না। কিন্তু এই ধরনের সমালোচনা উপেক্ষা করেই যুগ যুগে কিছু সাহিত্য-সাধক নিজেদের জীবনের কিছুটা সময় সাহিত্য সংস্কৃতির প্রসারে নিয়োজিত করেছেন। এই কাজের জন্য তাঁদের অনেকেই সমাজ থেকে তেমন প্রশংসাধন্য হননি। তাঁরা সেটির আশাও করেন নি। অন্তরের টানে নিজের সৃষ্টিশীলতার আনন্দে বিভোর হয়ে এমন স্বার্থহীন কাজে নিয়োজিত থেকেছেন। তাঁদের কারণেই বাংলা সাহিত্য আজ বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
নীল নোয়া জোৎস্না নামক একটি সাহিত্য সংকলন নিয়মিত তিন তিনটি সংখ্যা প্রকাশ করে গেছেন একজন নিভৃত সাহিত্যপ্রেমিক সুদূর যুক্তরাজ্য থেকে। টাকা রোজগার করতেই বাঙালিরা বিদেশ পাড়ি দেয়। সেখানে বসে এমন অ-অর্থকরী কাজ যিনি করতে পারেন তিনি অবশ্যই আমাদের শ্রদ্ধাভাজন হওয়ার উপযুক্ত। সুন্দর প্রচ্ছদ ও বাঁধাইয়ে অফসেট কাগজে ঝকঝকে ছাপায় সংকলনটি হাতে নিলেই একরাশ আনন্দের হাওয়া গা ছুঁইয়ে যায়। নামের কাব্যিকতার মতোই প্রচ্ছদের সুশোভন মায়াবী নীলাঞ্জন। সংকলনের সম্পাদক যুক্তরাজ্য প্রবাসী সাহিত্যসাধক ইমানুজ্জামান মহী কে সাধুবাদ এমন একটি মহতি ও সৃজনশীল উপহার আমাদের দেয়ার জন্য। তিনি অবশ্য সহযোগিতা পেয়েছেন আরও অনেক প্রবাসী সুনামগঞ্জীর। এর মধ্যে উপদেষ্টাম-লী হিসাবে যাদের নাম সংকলনে উল্লেখ আছে তাঁরা হলেন আলী হায়দার, শাহগীর বখত ফারুক, এলাইছ মিয়া মতিন, আবুল লেইছ, শাহেদা বেগম মীনা, ফাতেমা চৌধুরী স্বপ্না, মৃদুল কান্তি দাশ মনি, গোলাম রব্বানী সুহেল, শেরজাহান রাজা, পীরজাদা কাওছার আহমদ, আশিন আমরিয়া, আবু তারেক চৌধুরী, জাহেদ চৌধুরী অপু ও আহমেদ হাবিব মারুফ। দেশে সহযোগী সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন আবু সালেহ। সুদূর বিদেশে বসে বাঙালি সংস্কৃতি সাধনায় তাঁদের এই অবদান আমরা মনে রাখব কাল নিরবধি।
নীল নোয়া জোৎ¯œা কোন নামসর্বস্ব চটি সাইজের যতœহীন সংকলন নয়। এর স্তরে স্তরে মমতার পরশ বুলানো। ১৪৪ পৃষ্ঠার সংকলনটিকে কোন অবস্থাতেই ছোট বলার উপায় নেই। এই ১৪৪ পৃষ্ঠায় সম্পাদক ৪৪ জন লেখকের সৃষ্টিসম্ভারকে জায়গা করে দিয়েছেন। এখানে যেমন আছেন প্রবাসী লেখক তেমনি সুনামগঞ্জের সাহিত্যাঙ্গনে আনাগুনা আছে এমন অনেকেরই লেখা স্থান পেয়েছে। অর্থাৎ লেখা সংগ্রহ করতে যেয়ে সম্পাদক যে প্রচুর পরিশ্রম করেছেন তার প্রমাণ মিলবে লেখকসূচী ও লেখার বিন্যাস দেখলেই। সংকলনে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক ৪টি, ১টি স্মৃতিচারণ, ১টি আত্মানুসন্ধান, ১২টি নিবন্ধ-প্রবন্ধ, ১৮টি কবিতা ও ৮টি গল্প প্রকাশ করা হয়েছে। তার মধ্যে অনেকগুলোই মানোত্তীর্ণ, সুখপাঠ্য, তথ্যবহুল। সম্পাদক সংকলনটিকে সাহিত্যের ছোট কাগজ অভিধায় উল্লেখ করেছেন। এটিকে কট্টর কেউ যদি নীরিক্ষাধর্মী ছোট কাগজ বা লিটল ম্যাগ বলতে দ্বিধা করেনও তারপরেও এটিকে একটি স্বার্থক সংকলন বলতে একচোখা কোন ব্যক্তিও আপত্তি তুলবেন বলে মনে করি না। লিটিল ম্যাগ প্রকাশ করার ঝক্কি অনেক। ভবিষ্যতে পরিশ্রমী সম্পাদক এটিকে সঠিক অর্থে লিটল ম্যাগ হিসাবে নিয়মিত প্রকাশ করতে সক্ষম হবেন, এমন বিশ্বাস পোষণ করি আন্তরিকভাবে।
মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ে স্মৃতিচারণমূলক নিবন্ধ লিখেছেন সুজাত মনসুর, গৌরাঙ্গ চন্দ্র দেশী, বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু ও ইমানুজ্জামান মহী। শেষোক্ত তিন জনের লেখায় সুনামগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধের সমকালীন কিছু ইতিহাসের সাথে তিনটি অনুপম চরিত্রের পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়েছে পাঠকের সাথে। এ্ই তিন মহান চরিত্র হলো বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম গোলাম রব্বানী, লিয়াকত আলী ও নানু মিয়া মোক্তার। লেখকদের সুরচনার কারণে চরিত্রগুলো পাঠকদের কাছে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। এর মধ্য দিয়ে বর্তমান প্রজন্ম এই অঞ্চলের তিন বীর মুক্তিযোদ্ধার কথা জানতে পারলো। মুক্তিযুদ্ধ চর্চায় এ এক আবশ্যকীয় কর্তব্য আমাদের।
আবু আলী সাজ্জাদ হোসাইনের বাউল বিষয়ক গবেষণাধর্মী মূল্যবান লেখাটিতে বিদগ্ধ পাঠক মাত্রই চিন্তার খোরাক পাবেন। যেমন পাবেন অ্যাড, শহীদুজ্জামান চৌধুরীর লেখা এই অঞ্চলে দুর্নীতির বিস্তার ও এতদবিষয়ক আইনের ধারাবহিকতা নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী প্রবন্ধটিতে। প্রফেসর সৈয়দ মহিবুল ইসলাম স্মৃতিচারণ করেছেন জনপ্রিয় দুই শিক্ষক আব্দু মিয়া ও সীতেশ রঞ্জন আচার্যকে নিয়ে। এই দুই উদার শিক্ষক সম্পর্কে লেখকের পরিবেশিত তথ্য যদি এখনকার শিক্ষকরা নিজেদের মধ্যে ধারণ করেন তাহলে সমাজের মঙ্গল। ইশতিয়াক রুপু আহমদ সুনামগঞ্জের প্রাণ হাওরের উপর যে নিবন্ধটি লিখেছেন সেটিতে লেখকের অর্ন্তদৃষ্টির প্রখরতা সহজেই অনুমেয়। এনামুল কবির সংস্কৃতির সংকট প্রবন্ধে তাত্ত্বিক আলোচনার মধ্য দিয়ে বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করেছেন যা বিদগ্ধ মহলের দৃষ্টি কুড়াতে সক্ষম হবে। উজ্জ্বল মেহেদী বাউল স¤্রাট শাহ আব্দুল করিমকে ঘিরে নিজের কিছু স্মৃতি বর্ণনা করেছেন তাঁর সহজাত সুখপাঠ্য লেখনির দ্বারা। মফর ফোরকান সাংবাদিকতা জীবনের বাস্তব কিছু অভিজ্ঞতা পাঠকের সাথে শেয়ার করেছেন যা থেকে সাংবাদিকতার অন্দরমহল সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়। আরও কয়েকটি নিবন্ধ লিখেছেন ফাতেমা চৌধুরী স্বপ্না, কুহিনুর বেগম, এআর রাসেল, তুলিকা ঘোষ চৌধুরী, জয়ন্ত পাল জয় প্রমুখ। সুলেখক সুখেন্দু সেন তাঁর ধারাবাহিক রচনা শরণার্থী-৭১ এর একটি অংশ প্রকাশ করেছেন যেখানে শরণার্থী জীবনের করুণগাঁথা ও ওইসময়ের কিছু মূল্যবান ঐতিহাসিক তথ্য জানার সুযোগ পাবেন পাঠকরা। মুক্তিযুদ্ধের একটি অপরিহার্য অংশ অথচ প্রায় অবজ্ঞাত-অবহেলিত বিষয় একাত্তরের শরণার্থী শিবির। লেখক পরিশ্রম করে এই বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করে যে লেখাগুলো উপহার দিচ্ছেন তা ইতিহাসের নিরিখে খুবই মূল্যবান।
অনিকেত ছদ্মনামে নিজের প্রবাস জীবন নিয়ে আত্মানুসন্ধান করেছেন একজন। প্রবাস জীবনের নানা খুঁটিনাটি উঠে এসেছে তাঁর লিখায়। গল্প লিখেছেন স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ, মোজাম্মেল আলী, আহমেদ মামুন, মুরাদুল ইসলাম, মোবারক হোসেন রুবেল, কল্পনা আক্তার ও শায়লা ইসলাম নীপা। কথাসাহিত্যিক স্বপন কুমার দেব জমজ শীলা ও মালার ভালবাসা ও স্বার্থত্যাগ নিয়ে যে অনুপম গল্পটি লিখেছেন তা এককথায় পাঠকতৃপ্তি মিটাতে সক্ষম হবে। তেমনি অন্য গল্পগুলোও সুখপাঠ্য। মুহাম্মদ ইমদাদ কবিতা বিষয়ক একগুচ্ছ ভাবনার প্রকাশ ঘটিয়েছেন নিজের লেখায়। বিমূর্ত শিল্পকর্মের মতোই তাঁর লেখাটির তাৎপর্য অনুভব করতে আগ্রহী পাঠককে কাছে টানবে। কবিতার জগতে যাদের বসবাস তাদের এই লেখাটি পড়া অবশ্য কর্তব্য।
কবিতা লিখেছেন প্রবীণ শিক্ষক মু, আব্দুর রহীম, রোকেস লেইস, হোসনে আরা হেনা, অদিতি শিমুল, চুননু জামান, আজমল সায়েম, বুশরা জান্নাত, শাহরিয়ার বিপ্লব, মো: মুত্তাকিন আহমদ, ইউ.এম. নাবিল রহমান, ঝুমা কিবরিয়া, তাওয়াকুল আজিজ চৌধুরী তায়েফ, তহুর আহমদ, আলমগীর হোসাইন, লিখন আহমদ, সামিনা চৌধুরী ও সাহিদা চৌধুরী রুবি। বাঙালি যে সহজাতভাবে কবি এর প্রমাণ আবারও মিলল কবিতার দীর্ঘ তালিকা দেখে। কবিতা হলো সেইসব পঙক্তি যেখানে কবি নিজের অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেন উপমা, উৎপ্রেক্ষা আর শব্দের কারুময়তার মধ্য দিয়ে। অনেকগুলো কবিতাই পাঠকের মন ছুঁয়ে যাবে এ আমাদের স্থির বিশ্বাস।
সংকলনের কিছু বানান ভুল সচেতন পাঠকের দৃষ্টিপীড়ার কারণ হবে। বিদেশে বসে সম্পাদককে এর দায় দেয়া হলে সেটি হবে বেমানান। বরং দেশে যারা প্রকাশনা ও সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন তাঁরা আরও যতœশীল হতে পারতেন। একটি সুন্দর সংকলনে এমন বানানবিভ্রাট শোভনীয় নয়। যাই হোক সবশেষে সম্পাদকের নিজের প্রতিশ্রুতিরই প্রতিধ্বনি করে বলতে চাই, ‘সাহিত্যের কাগজ নিয়মিত প্রকাশ করার দুঃসাহস নিয়ে মাঠে নেমেছি আমরা। আমাদের উদ্দেশ্য একটাই পুরাতন লেখকদের পাশাপাশি নতুন লেখক সৃষ্টি করা। অতীত ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার আমাদের চেষ্টা অব্যাহত থাকুক। সকলের সহযোগিতা কামনা করি।’। এই প্রত্যাশাই আমাদের। প্রত্যাশাটা আরও বড় হয় যখন সম্পাদক এমন কথা বলতে পারেন ‘আমাদের সদিচ্ছার অভাব নেই। আর্থিক সমস্যা নেই’ । আমরা জানি সদিচ্ছার সাথে টাকার জোগান থাকলে যেকোনো অসাধ্যও সাধন করা সম্ভব। নীলনোয়া জোৎ¯œার পরবর্তী প্রতিটি সংখ্যা আরও আকর্ষণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ লেখা দ্বারা সমৃদ্ধ হোক এই কামনা।
- দিরাই-শাল্লা আওয়ামীলীগে আবারও অস্বস্তি- সুরঞ্জিতের দিরাইয়ে সক্রিয় মতিউর
- দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে নেতৃত্ব দিতে হবে আওয়ামী লীগকেই


