নৌপথে শ্রমিক হত্যা দায়িত্বশীলদের কর্তব্যবোধের জাগরণ কামনা করি

চাঁদাবাজি রুখতে নৌপথে চাঁদাবাজির দৌরাত্ম্য এতোটাই বেড়ে গেছে যে, ছাতকে একজন নৌশ্রমিককে চাঁদাবাজরা পিটিয়ে মেরে ফেলেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নৌযান মালিক ও শ্রমিকদের সংগঠন ঐক্যবদ্ধভাবে জেলার নৌরুটগুলোতে অনির্দিষ্ট কালের জন্য ধর্মঘট আহ্বান করেছেন। নৌ ধর্মঘটের ফলে জলপথে পণ্য পরিবহনসহ এর সাথে জড়িত হাজার হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। কর্তৃপক্ষ গণমাধ্যমকে বলেছেন, ধর্মঘট পরিস্থিতি নিয়ে নৌশ্রমিকদের সাথে আলোচনা হয়েছে, প্রশাসন তাদেরকে ধর্মঘট প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে অবিলম্বে শ্রমিক নিহতের সাথে জড়িত ব্যক্তিবর্গের দ্রুত বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন। সর্বশেষ সংবাদে জানা গেছে, আপাতত শ্রমিকরা ধর্মঘট প্রত্যাহার করেছেন। কিন্তু আসল কথা হলো নৌপথে চাঁদাবাজির যন্ত্রণা কমানো না গেলে জেলার নৌপথগুলোর অবস্থা দিনে দিনে খারাপ থেকে খারাপতর হবে। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে উল্লেখ করা হয়েছে জেলার নদীপথগুলোর অন্তত ১৫টি স্পটে বেপরোয়া চাঁদাবাজি চলে। ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা আইনের দোহাই দিয়ে এসব স্থানে মোটা অংকের চাঁদা দিতে বাধ্য করা হয় নৌ শ্রমিকদের। চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে তাদের উপর নেমে আসে ভয়ংকর নির্যাতন। নির্যাতনের মাত্রা কতোটা ভয়াবহ হয় ছাতকে এক শ্রমিকের মৃত্যু এর জলজ্ব্যন্ত প্রমাণ। নদীপথের এই বেপরোয়া চাঁদাবাজি নিয়ে গণমাধ্যমে অসংখ্য সংবাদ প্রকাশ করা হলেও অবস্থার বিন্দুমাত্র পরিবর্তন দৃশ্যমান নয়। সুনামগঞ্জ জেলা বালু, পাথর ও কয়লার জন্য বিখ্যাত। এইসব অর্থকরী পণ্য জেলার বাইরে বাজারজাত করতে পরিবহনের প্রধান পথ হচ্ছে নদীপথগুলো। তাই নদীপথগুলোতে চাঁদাবাজির দৌরাত্ম কমাতে না পারলে জেলার অর্থনীতিতে প্রচ- বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়ার আশঙ্কা রয়েছে যা কখনও কাম্য হতে পারে না।
যে ১৫টি চাঁদাবাজির স্পট রয়েছে সেগুলো সদর, ছাতক, বিশ্বম্ভরপুর, তাহিরপুর, জামালগঞ্জ ও ধর্মপাশা উপজেলাব্যাপী বিস্তৃত। জেলার সীমানার বাইরে অন্য জেলায়ও নিশ্চয় এরকম আরও স্পট রয়েছে। মোটমাট পণ্য পরিবহণ খরচের সিংহভাগ অর্থ ব্যয় হয়ে থাকে চাঁদাবাজির পিছনে। শেষ পর্যন্ত চাঁদার এই টাকা যোগ হয় পণ্যের মূল্যে। সাধারণ মানুষকে অধিক মূল্য দিয়ে এসব পণ্য ক্রয় করতে হয়। যেসব স্থানে চাঁদাবাজি চলছে সেখানে কোন না কোন উপায়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ, রাজনৈতিক দল ও প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সহযোগিতার খবর পাওয়া যায়। তবে সবচাইতে বিপদজনক বিষয় হলো ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের কিছু নেতা যখন এই চাঁদাবাজির সাথে জড়িত হয়ে পড়েন তখন অপরাপর শক্তিগুলো গৌণ হয়ে যায়। ক্ষমতাসীন দল দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হলে নৌপথে চাঁদাবাজী রোধ করা কোন বিষয়ই নয় বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট সকলে।
ছাতকে শ্রমিক হত্যার সাথে জড়িত ব্যক্তিবর্গকে অবিলম্বে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টামূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। যেসব চিহ্নিত স্পটে অবৈধ চাঁদাবাজি বহাল রয়েছে সেসব স্থানকে কঠোর নিরাপত্তা দিতে হবে। নৌযান মালিক ও শ্রমিকদের মনে নিরাপত্তাবোধ জাগ্রত করাটাই এখন প্রশাসনের আসল কাজ। আমরা আশা করব তারা নিজেদের দায়িত্ব বুঝে যথাশীঘ্র ব্যবস্থা নিবেন। একই সাথে রাজনৈতিক দলগুলোকে আজ লুটেরা মানসিকতা পরিহার করে দেশ ও মানুষের স্বার্থ রক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। জেলার কয়লা ব্যবসা এখন বন্ধ হওয়ার উপক্রম। বালু ও পাথরের মজুদও কমে আসছে। এই ব্যবসাগুলো সুনামগঞ্জের কয়েক হাজার মানুষের জীবন জীবিকার ব্যবস্থা করে চলেছে। মানুষের মুখে অন্নসংস্থানকারী খাতগুলোকে রক্ষা করা রাজনীতিবিদ ও প্রশাসনের নৈতিক ও মৌলিক দায়িত্ব। আমরা এই মহান দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধের জায়গাটির জাগরণ কামনা করি।