পদ নিয়ে কাড়াকাড়ি

বিশ্বজিত রায়, জামালগঞ্জ
জামালগঞ্জের সাচনা বাজারের আলাদা সুনাম ও সুখ্যাতি রয়েছে। ভাটির বন্দর হিসাবে খ্যাত এটি। পূর্বের কালীগঞ্জ বাজার থেকে সাচনা বাজারে নামান্তরিত হওয়া এই হাটের পরিচিতি জেলার বাইরেও বিস্তৃত আছে। হাওর জনপদে ব্যবসার প্রাণকেন্দ্র প্রাচীন এই বাজারে অতীতে ব্যবসায়ীদের মাঝে বড় ধরনের কোনো বিভেদ-বিভাজন ছিল না। বর্তমানে ব্যবসায়ীদের মধ্যে বিভাজন তৈরি হয়েছে। দুই পক্ষের মধ্যে বণিক সমিতির পদ নিয়ে কাড়াকাড়ি অব্যাহত আছে।
সাচনা বাজার বণিক কল্যাণ সমিতি গঠন নিয়ে এই অনৈক্যের সূচনা হয়।
ব্যবসায়ীরা জানান, গত ২৯ আগস্ট সাচনা বাজার বণিক কল্যাণ সমিতির একাংশ সভা আহবানের মাধ্যমে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণা করে। এর আগের দিন কমিটি গঠনের জন্য মাইকিং করে বাজার ব্যবসায়ীদের আমন্ত্রণ জানায় জামালগঞ্জ উত্তর ইউপি চেয়ারম্যান মো. রজব আলীর নেতৃত্বাধীন পক্ষ। তাদের এই তৎপরতা দেখে ঐ দিন রাতেই জরুরী সভায় মিলিত হয় জেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি রেজাউল করিম শামীম সমর্থিত আব্দুল খালেকের নেতৃত্বাধীন অপর ব্যবসায়ী পক্ষ। এই পক্ষ সভায় বসে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে কমিটি গঠনের ব্যাপারে অপর পক্ষের সাথে আলোচনার জন্য ৭ সদস্যের লিয়াজু কমিটি গঠন করে।
তাদের পক্ষ থেকে ঐ রাতেই লিয়াজু কমিটির নূরু মিয়া বিপক্ষ দলের মুখপাত্র রজব আলীর কাছে ফোন দিয়ে পরের দিনে কমিটি গঠনের যে সভা আহবান করা হয়েছে, সেটা পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানান।
জবাবে রজব আলী তার পক্ষের ক’জনের সাথে আলোচনা করে সকালে মতামত জানাবেন বলে নূরু মিয়াকে আশ্বস্ত করেন। পরদিন দুপুরে ব্যবসায়ী নূরু মিয়া ও অনন্ত পাল রজব আলীর সাথে দেখা করতে গেলে তিনি তাদের সকল প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।
পরবর্তীতে ঐ দিন( ২৯ আগস্ট) সন্ধ্যায় ব্যবসায়ী চিত্তরঞ্জন পাল ও প্রয়াত ইউসুফ আল আজাদের ছোট ভাই আসাদ আল আজাদের নাম সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ঘোষণা দেয়। এর মাধ্যমে দুই পক্ষের বিরোধিতা প্রকাশ্যে রূপ লাভ করে।
এই কমিটি গঠনতন্ত্রবিরোধী হয়েছে দাবি কওে ৩ সেপ্টেম্বর উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবরে লিখিত অভিযোগ দেয় শামীম সমর্থিত অপর ব্যবসায়ী গ্রæপ।
অভিযোগে গঠনতন্ত্রের ১৬, ১৭ ও ১৮ নম্বর ধারা লঙ্ঘনের মাধ্যমে কমিটি ঘোষণার পাশাপাশি সভায় সমিতির বৃহৎ অংশ অনুপস্থিত ছিল বলে উল্লেখ করা হয়। এর প্রেক্ষিতে ৫ সেপ্টেম্বর সমঝোতার জন্য দু’পক্ষকে নিয়ে বসেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। উভয় পক্ষের শুনানী শেষে (সভাপতির মৃত্যুতে) কমিটির সিনিয়র সহ সভাপতি চিত্তরঞ্জন পালের
আহবানে পুনঃরায় সভা ডেকে ব্যবসায়ীদের সমস্যা সমাধানের বিষয়টি ব্যবসায়ীদের উপরই ছেড়ে দেন তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সমঝোতায় পৌঁছতে পারেনি দু’পক্ষ।
গত ৯ সেপ্টেম্বর ইউএনওর নির্দেশ মোতাবেক একটি সভাও আহবান করেন সহ সভাপতি চিত্তরঞ্জন পাল। দুই পক্ষের ৫ জন করে মোট ১০ জন এবং মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ব্যবসায়ী ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম নবী হোসেনকে সভায় আমন্ত্রণ জানানো হয়। আলোচনায় বনিবনা না হওয়ায় একপর্যায়ে এম নবী হোসেন সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক দুই পক্ষে ভাগাভাগি করে সভাপতি যে পক্ষ নিবে অপর পক্ষ নেবে সিনিয়র সহ সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক যে পাবে বিপরীত পক্ষ ১ম যুগ্ম সম্পাদক নেবে প্রস্তাব দিলেও রজব আলীর পক্ষ তা মানতে রাজি হননি।
১৭ সেপ্টেম্বর আরেকটি পাল্টা কমিটি ঘোষণার ডাক দিয়ে বাজারে মাইকিং করে শামীম সমর্থিত অপর ব্যবসায়ী পক্ষ। তারা সভায় বসলে স্থানীয় সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতনের উধৃতি দিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ তাদেরকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করার জন্য আহŸান জানান।
সাচনা বাজারের নিউ মহসিন ষ্টোরের স্বত্বাধিকারী মো. জসীম উদ্দিন বলেন, ‘সব সংগঠনেরই একটা গঠনতন্ত্র থাকে। সে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী আলোচনার ভিত্তিতে ভোটাভোটি হোক আর প্রস্তাব আকারেই হোক একটা গ্রহণযোগ্য কমিটি চাই। ব্যবসায়ী আবু তাহের তালুকদার বলেন, ‘প্রত্যেক ব্যবসায়ীকে ভোটার তালিকায় এনে তাদেরকে ভোটের অধিকার দিয়ে প্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগ দিলে হয়তো ভালো হবে।’
মো. নূরু মিয়া বলেন, ‘বাজারের প্রকৃত ব্যবসায়ী এবং বয়োজ্যেষ্ঠদের গুরুত্ব দিয়ে দু’পক্ষের সমঝোতার ভিত্তিতে কমিটি আমরা চাই।’
মো. রজব আলী বলেন, ‘ইউএনও মহোদয় বলার পর আমরা দু’পক্ষ বসেছি এবং অনেক আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যস্থতাকারী ছিলেন এম নবী হোসেন সাহেব। তিনি প্রস্তাব দিলেন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক দু’পক্ষে ভাগাভাগি করার। আমরা সেটা মানি নি কারণ, বাজারের অধিকাংশ ব্যবসায়ী হিন্দু সম্প্রদায়ের হওয়ায় চিত্ত বাবুকে সভাপতি এবং প্রয়াত ইউসুফ আল আজাদ দীর্ঘদিন সমিতির সভাপতি থাকায় তাঁর পরিবারের আসাদ আল আজাদকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে। তারা তাদেরকে না মানায় সমঝোতা হয়নি।’
এ ব্যাপারে সাংসদ ইঞ্জিনিয়ার মোয়াজ্জেম হোসেন রতন বলেন, ‘এটা নিত্যান্ত ব্যবসায়ীদের ব্যাপার। আমি ২০ সেপ্টেম্বর জামালগঞ্জে আসব। আসার পর দুই পক্ষ যদি আমার কাছে আসে, তখন ইউএনও সাহেবকে বলেছি ব্যবসার পরিবেশ ঠিক রাখার স্বার্থে দু’পক্ষের দ্ব›দ্ব নিরসনে আমরা বইসা সেটা ঠিকঠাক করে দিব।’