পবিত্র লাইলাতুল বরাত

হাফিজ আতাউর রহমান লস্কর
ইসলামী আকীদা ও বিশ্বাস মতে বছরের প্রতিটি মাস, মাসের প্রতিটি সপ্তাহ, সপ্তাহের প্রতিটি দিন, দিনের প্রতিটি ঘণ্টা, ঘণ্টার প্রতিটি মিনিট, মিনিটের প্রতিটি সেকেন্ড মানুষের জন্য  কল্যাণকর। কোনো সময়ের ব্যাপারে অকল্যাণ ও অশুভ হওয়ার ধারণা করা ইসলামী আকীদা বিরোধী। কেননা, রাসূল (সাঃ) এরশাদ ফরমান, কোনো সময় ও কাল তো আল্লাহ পাকের বিশেষ এক অবস্থা, জমানাকে অকল্যাণকর মনে করার অর্থই হল আল্লাহ পাককে অকল্যাণকর মনে করা। তবে বরকত ও মর্যাদার দিক থেকে কোনো মাস অন্য মাসের উপর, কোনো দিন অন্য দিনের উপর, কোনো রাত অন্য রাতের উপর এবং কোন সময় অন্য সময়ের উপর শ্রেষ্ঠত্ব রাখা ভিন্ন কথা। বরকত ও মর্যাদার দিক থেকে এ ধরণের শ্রেষ্ঠত্বের কথা কুরআন ও হাদীসের মাধ্যমে উম্মতকে জানানো হয়েছে। যে সকল রাতের মর্যাদা, শ্রেষ্ঠত্বও বিশেষত্বের কথা কুরআন শরীফে এসেছে তা হল, শবে মেরাজ, শবে বরাত, শবে কদর ও দুই ঈদের রাত্রি। শবে বরাত কুরআন শরীফে  মোবারকের রাত্রি,  হাদীস শরীফে   লাইলাতুল বরাত ও সাধারণ মুসলমানদের মাঝে শবে বরাত নামে প্রসিদ্ধ।
আরবী ভাষায় বরাত অর্থ নাজাত বা মুক্তি। আর এই রাত্রিটি এমন যার মধ্যে আল্লাহ পাক অগণিত মানুষের গুনাহ ক্ষমা করে জাহান্নামের শাস্তি থেকে তাদেরকে মুক্তি দেন। এ জন্য রাত্রটির নামকরণ করা হয়েছে লাইলাতুল বরাত বা শবে বরাত। তা ছাড়া এ রাত্রিতে মানুষের প্রয়োজনীয় এক বৎসরের বিষয়াদির ফয়সালা করা হয়। আর এ রাত্রটি শা’বানের পনেরতম রাত যা চৌদ্দ তারিখ সূর্য অস্ত যাওয়ার পর থেকে শুরু হয়ে সুবহে সাদিকের পূর্ব পর্যন্ত বাকি থাকে।
এ রাতটি ঈদুল ফিতর কিংবা ঈদুল আযহার ন্যায় খুশি উদ্যাপনের রাত নয়। ইসলামী শরী’আতে এর পর্যায় এতটুকুই যে, এটা একটি মোবারক ও বরকতপূর্ণ রজনী। এ রাত্রে রাসূলুল্লাহ (সা:) অন্যান্য রাতের তুলনায় অধিক পরিমাণে ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল থাকতেন। মৃত ব্যক্তিদের ইসালে সাওয়াবের জন্য কবরস্থানে তশরীফ নিয়ে যেতেন। আর এর পরের দিন রোজা রাখতেন। এ হল শবে বরাত পালনের মূল পদ্ধতি যে, এ রজনীতে বেশী বেশী ইবাদত-বন্দেগী করবে। স্বীয় গুনাহ-খাতার জন্য আল্লাহ পাকের দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করবে এবং কবরস্থানে গিয়ে সুন্নত তরিকা মতে নিজের মাতা-পিতা, আত্মীয় স্বজন এবং সকল মুসলমান নর-নারীর জন্য আল্লাহ পাকের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবে। আর পরের দিন রোজা রাখবে। (মুহাম্মদ রাফ’আত কাসেমী)
জিবরাইল (আ:) এর আগমন
হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করেছেন যে, শা’বান মাসের ১৫ পনের তারিখ রাত্রিতে জিবরাইল আ. আমার নিকট এসে বললেন,  হে মুহাম্মদ  (সাঃ) আপনি আসমানের দিকে তাকান আমি আসমানের দিকে তাকিয়ে দেখলাম যে, আসমানের সব কয়টি দরজা উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে।
প্রথম দরজায় এক ফেরেশতা দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিচ্ছে, যে ব্যক্তি এ রাত্রিতে সেজদা করবে, সে অনেক ভাগ্যবান হবে। দ্বিতীয় দরজায় আরেক ফেরেশতা দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিচ্ছেন, যে বান্দা এ রাত্রিতে সেজদা করবে, সে অনেক ভাগ্যবান হবে। তৃতীয় দরজায় আরেক ফেরেশতা দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিচ্ছেন যে বান্দা এ রাত্রিতে আল্লাহ পাকের নিকট দু’আ করবে, সে অনেক ভাগ্যবান। চতুর্থ দরজায় আরেক ফেরেশতা দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিচ্ছেন যে বান্দা এ রাত্রিতে আল্লাহর যিকিরে মশগুল থাকবেন, সে অনেক ভাগ্যবান।
পঞ্চম  দরজায় আরেক ফেরেশতা দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিচ্ছেন যে বান্দা এ রাত্রিতে আল্লাহর নিকট কান্নাকাটি করবে, সে অনেক ভাগ্যবান। ষষ্ঠ দরজায় আরেক ফেরেশতা দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিচ্ছেন আজকে সকল মুমেন-মুসলমানদের জন্যই সৌভাগ্য। সপ্তম দরজায় আরেক ফেরেশতা ঘোষণা দিচ্ছেন আছে কি আল্লাহর নিকট চাইবার মত কোনো মানুষ? সে যা চাইবে, তাকে তা দেওয়া হবে। অষ্টম দরজায় আরেক ফেরেশতা ঘোষণা দিচ্ছেন, আজকে যে বান্দা আল্লাহর নিকট স্বীয় গুনাহের ক্ষমা প্রার্থনা করবে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেন,  আমি জিবরাইল (আঃ) কে জিজ্ঞাসা করলাম আসমানের এ দরজাগুলো কখন পর্যন্ত খোলা থাকবে। উত্তরে তিনি বললেন, রাত্রির প্রথম প্রহর থেকে সকাল হওয়া পর্যন্ত খোলা থাকবে। তারপর জিবরাইল (আঃ) বললেন! হে মুহাম্মদ (সঃ) এ রাত্রিতে আল্লাহ পাক এ পরিমাণ বান্দাদেরকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিবেন। যে পরিমাণ পশম কালব গোত্রের বকরীর গায়ে রয়েছে। (গুনিয়াতুত তালেবীন: ৩৬২) হাদীস শরীফে আছে পনেরই শা’বান রাতে আল্লাহ তায়ালা দুনিয়ার নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করে দুনিয়াবাসীর প্রতি বিশেষ রহমতের দৃষ্টিপাত করেন এবং বনুকালব গোত্রের লোকদের বকরীপালের পশমের সংখ্যার চেয়েও অধিক সংখ্যক লোককে ক্ষমা করা দেন। (তৎকালীন আরবে বনু কালব গোত্রের বকরীর পরিমাণ ছিল সবচেয়ে বেশি।) কিন্তু এমন রহমত, বরকতপূর্ণ সাধারণ ক্ষমার রাতেও কিছু হতভাগা ব্যক্তি আল্লাহতায়ালার দয়া ও অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত থাকে। যেমন ১) আল্লাহতায়ালার সাথে অংশীদার স্থাপনকারী অর্থাৎ শিরককারী ২) হিংসুক ৩) আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারী ৪) লুঙ্গি, পায়জামা, প্যান্ট, জুব্বা ইত্যাদি টাখনুর নিচে ঝুলিয়ে পরিধানকারী। পিতামাতার অবাধ্য সন্তান ৬) মদ্যপানে অভ্যস্ত ব্যক্তি ৭) অন্যায়ভাবে ট্যাক্স উসুলকারী  ৮) জাদুকর ৯) গায়েবের সংবাদ প্রদানকারী ১০) হাতের রেখা দেখে ভালোমন্দ নির্ধারণকারী  ১১) পুলিশ বা সৈনিক হয়ে জুলুমকারী  ১২) তাশ ও অন্যান্য অনর্থক খেলাধূলায় লিপ্ত ও দেখায় মত্ত ব্যক্তি   ১৩) গান-বাদ্যে লিপ্ত ব্যক্তি। সুতরাং এদের উচিত তওবার মাধ্যমে এসব অপকর্ম ছেড়ে এ রাতের বরকত লাভের চেষ্টা করা।
এ রাতের নফল আমলসমূহ সম্মিলিত নয়, ব্যক্তিগত :
১৪ শাবান দিবাগত রাতে জাগ্রত থেকে নফল ইবাদত বন্দেগী, জিকির আযকার, দুরূদ শরীফ, তিলাওয়াতে কুরআন ও নফল নামাযে মশগুল থাকা। নফল নামায যে কোন সূরা দিয়ে পড়া যায়।
আতা ইবনে ইয়াছার (রঃ) বর্ণনা করেন যে, সা’বান মাসের পনেরতম রাত্রিতে আল্লাহ পাকের সামনে বান্দাদের আমল সমূহকে পেশ করা হয়। অনেক মানুষ লম্বা লম্বা ভ্রমণে বের হয়। অনেকে বিবাহ-শাদির কাজে নিজেকে ব্যস্ত করে নেয়। অথচ আল্লাহ পাকের দরবারে তার নাম মৃতদের তালিকায় লিখা হয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ মানুষ কত ধরণের প্ল্যান প্রোগ্রাম করতে থাকে। অথচ আল্লাহ পাকের এখানে তার মৃত্যু লিখা হয়ে গিয়েছে। (গুনিয়াতুত তালিবীন) আল্লাহ পাক সকলকে প্রতিটি মুহূর্তকে পরকালের কাজে ব্যয় করার তওফিক দান করুন। আমীন  
লেখক ইমাম, খালেকাবাদ জামে মসজিদ, সুনামগঞ্জ।