পবিহনের ভাড়া বৃদ্ধি চলমান ধন বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে তুলবে

ঠিকই ভাড়া বাড়িয়ে নিলের পরিবহন ব্যবসায়ীরা। বেড়েছে তেলের দাম কিন্তু পরিবহন ব্যবসায়ীরা গ্যাসে চালিত যানবাহনের ভাড়া বাড়ানোর মওকা খোঁজছেন। তেলের দাম বাড়ার কারণে গ্যাস চালিত যানবাহনের ভাড়া কী পরিমাণ বাড়লো তার তথ্য এক দুই দিনের মধ্যে জানা যাবে। তেল চালিত যানবাহনের ভাড়া জ¦ালানী মূল্য বাড়ার চাইতে কত বেশি বৃদ্ধি করে নিয়েছেন কুশলী সড়ক-ব্যবসায়ীরা তার সরকারি হিসাবটা জানা গেছে। মাঠে কত বাড়ানো হয়েছে সেই কথাও জানা যাবে। সরকারি হিসাব মোতাবেক বাস-মিনিবাসের ভাড়া বাড়ানো হয়েছে ২৬-২৮%। লঞ্চের ভাড়া বেড়েছে ৩৫%। ডিজেলের দাম প্রতি লিটারে ১৫ টাকা বাড়ানোর ফলে জ¦ালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির হার ছিলো ২৩%। যেকোনো যানবাহনের মোট খরচের এক তৃতিয়াংশের বেশি নয় জ¦ালানী খরচ। সেই হিসাবে যানবাহন চালানোর খরচ বাড়ার কথা শতকরা ২৩ ভাগের চাইতে অনেক কম। ধরে নিলাম সেটা ১২-১৫ ভাগ। ১৫ ভাগ খরচ বাড়ানোয় ভাড়া বাড়ানো হলো ২৮%। বাস্তবে হয়তো বর্ধিত ভাড়া বৃদ্ধির হার দাঁড়াবে ৩০-৩৫% পর্যন্ত। তাহলে তেলের দামের অজুহাতে ভাড়া বাড়িয়ে মুনাফার ঝুলিটা বেশ বড় করার সুযোগটি ভাল করেই নেয়া গেছে। বিশিষ্ট অনেকেই বলেছেন বুধবার থেকে ৩ দিন পরিবহন খাতের যে অযৌক্তিক ও ঘোষণাহীন ধর্মঘট চলেছিলো সেটি ছিলো পাতানো খেলা। দুর্ভোগ বাড়িয়ে ভাড়া বাড়ানোর জায়গায় মানুষের মানসিকতা তৈরির জন্য এই ধর্মঘট ছিলো এক কৌশলী চাল। সরকার ও পরিবহন ব্যবসায়ীরা এখানে মোটামুটি খেলার উদ্বোধনী সংগীতটি এক সুরে গাইতে পেরেছেন। এতে সাধারণ মানুষের কতোটা গলা কাটা গেল কিংবা তারা এই চাপ সইতে পারবেন কিনা তা ভাবার জন্য এই খেলায় কাউকে পাওয়া যায়নি।
গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো করোনাকালে দারিদ্রতা বাড়ার আশঙ্কাজনক পরিসংখ্যান সামনে নিয়ে এসেছে। দেশে নাকি নতুন করে তিন কোটি লোক দরিদ্র হয়ে গেছেন করোনার অভিঘাতে। মানুষের দারিদ্রতা বাড়লে তার ক্রয় ক্ষমতা কমে যায়। পরিবহন ভাড়া বাড়ানোর ফলে দারিদ্রতার এই জায়গাটি আরও বড় হবে নিঃসন্দেহে। জ¦ালানি তেলের দাম বাড়ার অভিঘাত পড়বে আরেক জায়গায়। সেটি হলো কৃষি খাত। সামনেই ধান উৎপাদনের বড় মৌসুম বোরো ফসল চাষাবাদের সময়। বোরো চাষাবাদে সেচযন্ত্রসহ অপরাপর যন্ত্রপাতি মূলত ডিজেল নির্ভর। ডিজেলের ২৩% মূল্য বৃদ্ধির ফলে কৃষি উৎপাদনের ব্যয় বেড়ে যাবে। শুধু বোরো চাষাবাদ নয়। সামনের শীতকালীন সবজি চাষাবাদের খরচও এতে বাড়বে। আমাদের কৃষকরা এখনও উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পান না। ঠাকুরগাঁওয়ের হিমাগারগুলোতে উৎপাদিত আলুর ৫০% এখনও অবিক্রিত থাকার খবর পাওয়া গেছে। লোকসান দিয়ে বিক্রি করেও আলুর মজুদ শেষ করা যাচ্ছে না। ধানের যে বর্ধিত মূল্য দেয়ার তৃপ্তির আমেজ রয়েছে গত দুই বছর যাবৎ সেখানেও রয়েছে শুভঙ্করের ফাঁকি। গবেষকরা এক মণ ধানের উৎপাদন খরচ ১ হাজার টাকার বেশি বলে দাবি করেন। আর ধানের সরকারি মূল্য ১ হাজার ৮০ টাকা। ধানের দাম তাহলে বাড়লো কোথায়? সাধারণ মানুষের এমন অসহায়ত্বের সময় দেশের মাথাপিছু গড় আয় বাড়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এই তথ্য থেকে বুঝা যায় দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটছে কিন্তু সেটি ভীষণ অসম। উন্নয়ন গস্খহণযোগ্য পর্যায়ে বিন্যস্ত থাকলে জাতীয় আয় বাড়ার সময়ে নতুন করে তিন কোটি মানুষের দরিদ্র হওয়ার কোনো কারণ থাকতে পারে না। করোনা পরিস্থিতির কারণে মানুষের আয় কমে যাওয়ার সাথে জ¦ালানি তেল এবং দ্রব্যমূল্য ও পরিবহন ব্যয়ের উর্দ্ধগতি চলমান আয় ও ধন বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে তুলবে।
যাহোক ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধির প্রভাব যাতে গ্যাসে চালিত যানবাহনে না পড়ে তা নিশ্চিত করার জন্য আমরা সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই। ডিজেলে চালিত যানবাহনের ক্ষেত্রে যাতে ভাড়া অযৌক্তিক পরিমাণে না বাড়ানো হয় তাও নিশ্চিত করা জরুরি।