পরস্পরকে দোষারোপেই ব্যর্থতা ঢাকার চেষ্টা

বিশেষ প্রতিনিধি
দায়িত্বশীলদের অনুগত (ব্যক্তিগত পছন্দের) ও অজনপ্রিয়দের দলীয় মনোনয়ন দেওয়া এবং স্থানীয় গ্রুপিংয়ের কারণে দলীয় প্রতিপক্ষের শক্তিশালী বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় ৪র্থ ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সুনামগঞ্জের তিন উপজেলার ৫ ইউনিয়নে (আওয়ামী লীগের ঘাটিতে) জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে দলের মনোনীত প্রার্থীদের। আরও ৬ ইউনিয়নে প্রতিদ্বন্দ্বিতাই গড়তে পারেন নি দলীয় মনোনীতরা। দলের এমন বিশৃঙ্খল অবস্থায় একে অপরকে দোষারোপ করছেন দায়িত্বশীলরা।
দিরাই উপজেলার ৯ ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে কুলঞ্জ, ভাটিপাড়া ও দিরাই সরমঙ্গল ইউনিয়নে জামানত হারিয়েছেন আওয়ামী লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থীগণ।
কুলঞ্জ ইউনিয়নে আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী মো. মিলন মিয়া পেয়েছেন ১৭৮১ ভোট। এই ইউনিয়নে মোট ভোটার ২১ হাজার ২৯৪ জন। ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন ১৫ হাজার ৫৯৩ জন। এরমধ্যে বৈধ ভোটের সংখ্যা ১৫ হাজার ১৯৫ এবং বাতিল ভোটের সংখ্যা ৩৯৮। জামানতের জন্য ১ হাজার ৯৫০ ভোট পাওয়া প্রয়োজন ছিল আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর।
ভাটিপাড়া ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ মনোনীত মাহমুদুল হাসান চৌধুরী পেয়েছেন ১২৭১ ভোট। এই ইউনিয়নে মোট ভোটার ১৪ হাজার ৯৭০ জন। ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন ১১ হাজার ২২০ জন। এরমধ্যে বৈধ ভোটের সংখ্যা ১১ হাজার ৬৯ এবং বাতিল ভোটের সংখ্যা ১৫১। জামানতের জন্য ১ হাজার ৪০৩ ভোট পেতে হতো তাঁকে।
সরমঙ্গল ইউনিয়নে জামানত হারিয়েছেন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী রঞ্জিত রায়। তিনি পেয়েছেন ১০১৪ ভোট। এই ইউনিয়নে মোট ভোটার ১১ হাজার ৪৯৫ জন। ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন ৮ হাজার ৯২১ জন। এরমধ্যে বৈধ ভোটের সংখ্যা ৮ হাজার ৬৬২ এবং বাতিল ভোটের সংখ্যা ২৫৯। জামানতের জন্য ১ হাজার ১১৬ ভোট প্রয়োজনীয় ছিল তাঁর।
বিশ^ম্ভরপুর উপজেলার ধনপুর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী মো. হযরত আলী ১১১৬ ভোট পেয়েছেন। এই ইউনিয়নে মোট ভোটার ২৭ হাজার ৭৯১ জন। ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন ২০ হাজার ৪৫৩ জন। এরমধ্যে বৈধ ভোটের সংখ্যা ১৯ হাজার ৯৬৬ এবং বাতিল ভোটের সংখ্যা ৪৮৭। জামানত ফিরে পেতে প্রার্থীদের ২ হাজার ৫৫৭ ভোট প্রয়োজন ছিল ।
ফতেপুর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী মো. হেলাল উদ্দিন পেয়েছেন ৭৯৫ ভোট। এই ইউনিয়নে মোট ভোটার ১৯ হাজার ৪৯২ জন। ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন ১৪ হাজার ৮৭৬ জন। এরমধ্যে বৈধ ভোটের সংখ্যা ১৪ হাজার ৬৩০ এবং বাতিল ভোটের সংখ্যা ২৪৬। জামানত ফিরে পেতে প্রার্থীদের ১ হাজার ৮৬০ ভোট প্রয়োজন ছিল।
এছাড়া বিশ^ম্ভরপুরের পলাশ, বাদাঘাট দক্ষিণ, জগন্নাথপুরের পাইলগাঁও, চিলাউড়া-হলদিপুর, দিরাইয়ের রাজানগর ও তাড়ল ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতাই গড়তে পারেন নি।
বিশ^ম্ভরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বর্মণ বললেন, তৃণমূলে প্রার্থীদের অবস্থা যাচাই না করেই নেতাদের ব্যক্তিগত পছন্দে প্রার্থী করা হয়েছে। ফতেহপুর আওয়ামী লীগের ঘাটি, ওখানে কখনোই নৌকার পরাজয় হয় নি। এবার হয়েছে। এই ইউনিয়নের দুই বারের চেয়ারম্যান জনপ্রিয় মানুষ প্রবোধ চন্দ্র রায়কে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয় নি। একারণে আওয়ামী লীগের ভোটাররা বিরক্ত হয়েছেন। ধনপুরেও জনপ্রিয় প্রার্থীকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয় নি।
দিরাই উপজেলা যুবলীগের সভাপতি রঞ্জন রায় বললেন, প্রমাণ দিতে পারবো না, এজন্য নাম বলবো না, তবে দলীয় মনোনয়ন প্রদানে এই উপজেলায় কারো কারো বিরুদ্ধে আর্থিক লেনদেনের কথাও শুনা যায় । তৃণমূলের মতামতকে গুরুত্ব না দিয়ে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। মনোনয়ন দেবার পর প্রার্থীদের জয় নিশ্চিতের জন্যও কোন ধরণের উদ্যোগ ছিল না। প্রয়াত সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের উপজেলা এটি, এখানে আওয়ামী লীগের এমন লজ্জাজনক হার হবার কথা ছিল না।
এই উপজেলার আরেক দলীয় নেতা নিজের পরিচয় না দেবার অনুরোধ করে বললেন, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মতিউর রহমান সুনামগঞ্জ-২ আসনে আগামী জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী হতে চান। এজন্য দিরাই উপজেলায় তার ব্যক্তিগত পছন্দের অজনপ্রিয় প্রার্থী ছিলেন কোন কোন ইউনিয়নে।
জগন্নাথপুরের চিলাউড়া-হলদিপুর ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী আব্দুল গফুর বললেন, ইউনিয়নব্যাপী দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আজিজুস সামাদ ডন ও স্থানীয় সংসদ সদস্য পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নানের অনুসারীরা দুইভাগে বিভক্ত। আমাকে নৌকা দেওয়ায় মরিয়া হয়ে বিরোধিতায় নেমেছিলেন আজিজুস সামাদ ডনের অনুসারিরা। তাদের সঙ্গে বিএনপি-জামায়াতও যুক্ত হয়েছিল। আজিজুস সামাদ ডনের কেন্দ্রে আমি ৭২ ভোট পেয়েছি। এসব কারণে আমি প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়তে পারি নি।
দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য আজিজুস সামাদ ডন বললেন, মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় ত্রুটি ছিল। ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে বর্ধিত সভা হয়েছে কী-না নিশ্চিত নই আমি। নিজের ইউনিয়নে প্রার্থী মনোনয়নে তৃণমূলের মতামত যাচাই হয় নি মন্তব্য করে তিনি বলেন, আমার কেন্দ্রে দলীয় প্রার্থীকে ভালো ভোট পাইয়ে দেবার চেষ্টা ছিল আমার। তিনি এর আগের দফার নির্বাচনে জেলার শান্তিগঞ্জের ডুংরিয়া কেন্দ্রে নৌকার পাওয়া লজ্জাজনক ভোটের কথা উল্লেখ করে দল এবং রাজনীতি সঠিক পথে পরিচালনায় সকলকে উদ্যোগি হওয়ার কথাও বললেন।
জেলার শান্তিগঞ্জের ডুংরিয়ায় সুনামগঞ্জ-৩ আসনের এমপি পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নানের বাড়ি। পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নানের মুঠোফোন বন্ধ পাওয়ায় তৃতীয় দফার নির্বাচনে ডুংরিয়া কেন্দ্রের ভোট নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলা যায় নি। মন্ত্রীর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক সহকারী হাসনাত হোসাইন বললেন, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের আগে মন্ত্রী এলাকায় আসেন নি। মন্ত্রীর নিজের গ্রামে ফরিদুর রহমান ফরিদ নামের আরেক প্রার্থী ছিলেন। এরপরও ডুংরিয়া কেন্দ্রে ৪০৮ ভোট পেয়েছিল নৌকা। বুরাখালী গ্রামে কোন প্রার্থী ছিল না বলে দাবি করেন হাসনাত হোসাইন।
জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার এম এনামুল কবির ইমন বললেন, বিশ^ম্ভরপুরের ফতেহপুরে প্রবোধ চন্দ্র রায়ের নাম কেন্দ্রীয় মনোনয়ন বোর্ডে পাঠানো তালিকায় এক নম্বরে ছিল, মনোনয়ন পেয়েছেন তালিকার তিন নম্বর ব্যক্তি। ধনপুরে বর্তমান চেয়ারম্যানের নাম তালিকায় দিতেই হয়, এজন্য দেওয়া হয়েছে, তিনি মনোনয়ন পেয়েছেন। দিরাই উপজেলার সরমঙ্গলের দলীয় মনোনীত প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হওয়ায় তিনি ভোটের প্রচারণায় থাকতে পারেন নি বলেই তার পরাজয় হয়েছে। ব্যারিস্টার ইমনের সঙ্গে কথা বলার সময় পাশে থাকা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মতিউর রহমান বলছিলেন, কুলঞ্জ ও ভাটিপাড়া ইউনিয়নে দিরাই উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ রায় স্থানীয় সংসদ সদস্যের বরাত দিয়ে বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা করেছেন। তাঁকে (সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ রায়) এজন্য শোকজ করা হবে।
দিরাই-শাল্লা আসনের সংসদ সদস্য ড. জয়া সেন গুপ্তা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির করা মন্তব্য সঠিক নয় বলে মন্তব্য করে বললেন, আমার বরাত দিয়ে কেউ বিদ্রোহী প্রার্থী মাঠে ছাড়ে নি। বিদ্রোহী প্রার্থী যারা হতে চেয়েছে আমি বলেছি, এটা করলে কোনদিন নৌকা নিয়ে নির্বাচন করতে পারবে না।