পাকতে শুরু হয়েছে বোরো ধান, করোনাকালে ধান কাটা শ্রমিকের সংকট হাওরাঞ্চলজুড়ে

বিশেষ প্রতিনিধি
হাওরাঞ্চলের জেলা সুনামগঞ্জের একমাত্র ফসল বোরো ধান পাকতে শুরু হয়েছে। চৈত্রের মাঝামাঝি অর্থাৎ এপ্রিলের শুরুতেই হাওরাঞ্চলে ধান পাকা শুরু হয়। গ্রামে গ্রামে হয় নবান্নের আয়োজন। মাঠে মাঠে দরাজকণ্ঠে কৃষকরা গেয়ে থাকেন নবান্নের গান। এবার সেই আয়োজন নেই বললেই চলে। করোনার সক্রমণ রোধে ঘরে থাকা কৃষকরা মাঠের সোনালী ধান দেখে দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন। পাকা ধান কেটে আনার উৎকণ্ঠা প্রতিটি হাওরপাড়ে।
জেলার দিরাই উপজেলার রাজাপুর গ্রামের বড় কৃষক আব্দুস ছাত্তার জানালেন, বিশ^ম্ভরপুর উপজেলার চিনাকান্দি থেকে প্রতিবছর ৫০ থেকে ৬০ জন শ্রমিক তাদের গ্রামে যায়। তাঁর জমি ছাড়াও কালিয়াকুটা হাওরে থাকা গ্রামের কৃষকদের অন্তত ২০-২৫ হাল জমির ধান কাটে তাঁরা। এবার এই শ্রমিকরা এখনো পৌঁছাতে পারেনি। আসার জন্য পরিবহনও পাচ্ছে না।
তিনি বলেন, ‘আমরা যোগাযোগ করেছিলাম, তারা জানিয়েছে, দ্বিগুন ভাড়া দিয়েও পরিবহনের ব্যবস্থা করতে পারছে না। যারা প্রতিবছর আসে তারাও অনেকে আসতে চাচ্ছে না। আগামী শুক্রবার জুময়ার পরে যেভাবে হোক রওয়ানা দেবে, কোথাও পুলিশ আটকালে আমরা যাতে ছাড়ানোর ব্যবস্থা করি সেই অনুরোধও করেছে।’
তিনি জানালেন, পুরো হাওরাঞ্চলেই এমন সংকট তৈরি হয়েছে। করোনার ভয়ও আছে শ্রমিকদের মধ্যে। অন্যান্য বছর প্রতি একর জমি ছয় থেকে সাড়ে ছয় হাজার টাকায় কাটানো যেত, এবার যে কত দাবি করবে সেই দুশ্চিন্তাও রয়েছে গৃহস্থদের মধ্যে। এই কৃষক মনে করেন ধান কাটার মেশিন কম্বাইন হারভেস্টার বা রিপার মেশিন দিয়ে একটু নিচু এলাকার ধানই কাটা সম্ভব নয়।
কৃষি অফিসের দেওয়া তথ্য মোতাবেক সুনামগঞ্জের ১১ উপজেলার হাওরে এবার বোরো চাষাবাদ হয়েছে ২ লাখ ১৯ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১২ লাখ টন।
হাওরাঞ্চলের একাধিক কৃষকদের দেওয়া তথ্য মোতাবেক এক হেক্টর বোরো জমির ধান একদিনে কাটতে ১৫ জন শ্রমিকের প্রয়োজন। সেই হিসাবে ২ লাখ ১৯ হাজার ৩০০ হেক্টর জমির ধান একদিনে কাটতে শ্রমিক লাগবে ৩২ লাখ ৯১ হাজার ৭৫০ জন। বোরো ধান কাটার সময়কাল ১৫ থেকে ২০ দিনের বেশি পাওয়া যায় না। ২০ দিনে সুনামগঞ্জের উৎপাদিত ধান কাটতে শ্রমিক লাগবে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৫৮৭ জন।
এই অবস্থায় করোনাকালে সময়মত ধান কাটার শ্রমিক পাওয়া যাবে কী না, অকাল বন্যা হয় কী-না, পানি আসার আগে ধান কাটা মাড়াই শেষ হবে কী না, এমন আলোচনা কৃষকের ঘরে ঘরে হাওরাঞ্চলজুড়ে।
সুনামগঞ্জ জেলা সিপিবি’র সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এনাম আহমদ বলেন, দেশের খাদ্যভা-ারকে সমৃদ্ধ রাখা ও সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের উৎপাদিত ধান ঘরে তোলা নিশ্চিত করতে সরকার ধান কাটা শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। ডাক্তারদের যেভাবে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে, ধান কাটা শ্রমিকদেরও উৎসাহিত করতে হবে।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড’এর দায়িত্বশীলরা জানান, ২০১৭ সালে হাওর ডুবা শুরু হয়েছিল ২৯ মার্চ থেকে, ২০১৮ তে ৭ মে এবং ২০১৯’এ হাওরে পানি এসেছিল ২ মে। এসব বিবেচনায় আসন্ন বিপদ থেকে রক্ষা পেতে ধান কাটার যন্ত্রপাতি দ্রুত কৃষকদের সরবরাহের কথা বললেন সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী।
তিনি বলেন, করোনা পরিস্থিতির কারণে মাইগ্রেটেড শ্রমিক কম আসবে। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে এই বিষয়টি জেলা প্রশাসক ও কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগকে জানিয়েছি আমরা। এছাড়া এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে বৃষ্টিও বেশি হবার আবাস দিয়েছে আবহাওয়া বিভাগ।
সিলেট আবহাওয়া বিভাগের আবহাওয়াবিদ আবু সাঈদ চৌধুরী জানালেন, মার্চ মাসে সুনামগঞ্জে ১৬৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হবার কথা ছিল। হয়েছে ২২ মিলিমিটার। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে অন্যান্য বছর কমপক্ষে ২০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়, এখনো পর্যন্ত এই পরিমাণ বৃষ্টি হয়নি। শুস্ক আবহাওয়া বিরাজমান। এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে বেশি পরিমাণে বৃষ্টিপাত হবে।
সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের বিভাগের উপ-পরিচালক সফর উদ্দিন বলেন, ময়মনসিংহ, নেত্রকোণাসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ধান কাটা শ্রমিকদের এই জেলায় আসা, সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে থাকা এবং ধান কেটে ঘরে আনতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। হাওর এলাকার স্কুল কলেজগুলোতে এবং আলাদা আলাদা তাবু তৈরি শ্রমিকদের থাকার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। জেলায় ধান কাটার ১৩১ টি কম্বাইন হারভেস্টার মেশিন রয়েছে নতুন করে আরও ৩৩ টি দেওয়া হচ্ছে। রিপার আছে ২৮৫ টি নতুন করে আরও ১৭ টি দেওয়া হচ্ছে।