কুমার সৌরভ
যৌথভাবে জ্ঞান চর্চার নাম পাঠচক্র। এই চর্চা বহু প্রাচীন। প্রাচীন গ্রীস বা ভারতীয় সভ্যতায় যৌথ পাঠগ্রহণের ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যায়। সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান, রাজনীতি এমনসব বিষয়ের জটিল ও তাত্ত্বিক দিকগুলোকে যৌথভাবে বিচার বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করে সঠিক ধারণায় পৌঁছানোর সহজ জায়গা হচ্ছে পাঠচক্র। আমাদের সমাজে ধর্মীয় পাঠচক্র একটি বহুল প্রচলিত চর্চা। রামায়ন, মহাভারত, শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত, শ্রীমদ্ভাগবদ, গীতা এমনসব ধর্মীয় গ্রন্থাদি যৌথভাবে পাঠ ও আলোচনা করার দৃশ্য আমাদের গ্রামীণ এমনকি শহুরে সমাজের স্বাভাবিক দৃশ্য। সম্প্রতি মহিলামহলের এমন ধর্মীয় গ্রন্থালোচনা ব্যাপকতা পেয়েছে। সকল ধর্মের পবিত্র গ্রন্থাদি পাঠের ক্ষেত্রে একই দৃশ্য এখন নৈমিত্তিক। এর বিপরীতে আধুনিক সাহিত্য, দর্শন ও রাজনৈতিক গ্রন্থ পাঠের ক্ষেত্রে এমন চর্চার পরিমাণ কম হলেও একেবারে শূন্য নয়। বামপন্থী রাজনৈতিক দল ও সুজনশীল সাহিত্যকর্মীরা এমন পাঠচক্রকে নিজেদের চেতনা ও উপলব্ধির জায়গাকে সমৃদ্ধ করার বলিষ্ঠ উপকরণ হিসেবে মনে করেন।
সুনামগঞ্জে কিছুদিন আয়ু পাওয়া এমন একটি পাঠচক্রের অভিজ্ঞতা বর্ণনা এই লেখার উপজীব্য। কৃষি ব্যাংক, সুনামগঞ্জ অঞ্চলের আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক মরহুম আব্দুল হান্নানের উৎসাহ ও উদ্যোগে এই পাঠচক্র প্রতিষ্ঠা পেয়ে নিয়মিত সাপ্তাহিক অধিবেশন চালু থাকে কয়েক মাস। ২ আগস্ট ১৯৯৬ তারিখে শুরু হয়ে ১৪ মার্চ ১৯৯৭ তারিখ পর্যন্ত ৩০টি সাহিত্য অধিবেশন পরিচালনা করা হয়। ২ আগস্ট ১৯৯৬ তারিখে অ্যাডভোকেট শহীদুজ্জামান চৌধুরীর বাসায় রণধীর দাস ননী’র সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একটি সভা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মনন পাঠচক্র নাম দিয়ে যাত্রা শুরু হয় এই চর্চার। জনাব আব্দুল হান্নানকে আহ্বায়ক, কুমার সৌরভ ও সুবাস উদ্দিনকে সদস্য করে প্রথম আহ্বায়ক কমিটি গঠিত হয়। পরবর্তীতে ২৯ নভেম্বর ১৯৯৬ তারিখে কুমার সৌরভকে আহ্বায়ক এবং আব্দুর হান্নান ও শাহনেওয়াজ চৌধুরী নিয়াজকে সদস্য করে আহ্বায়ক কমিটি পুনর্গঠিত হয়।
আগেই বলা হয়েছে মনন পাঠচক্র ১টি সাংগঠনিক সভাসহ মোট ৩০টি সাহিত্য অধিবেশনে মিলিত হয়। অধিবেশনগুলোর বৈশিষ্ট্য ছিলো, প্রতিটি অধিবেশনে পূর্বনির্ধারিত কোন বিষয়ে একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি আলোচনা করবেন। উপস্থাপিত বিষয়বস্তুর উপর অন্যরা আলোচনা করবেন। এরপর প্রত্যেকে স্বরচিত লেখা পাঠ করবেন। সবশেষে পরবর্তী অধিবেশনের আলোচ্যসূচী ও আলোচক নির্ধারণ করে বৈঠকের সমাপ্তি ঘটত। মনন পাঠচক্র যেসব বিষয়ে আলোচনা করেছে সেগুলোর পর্যায়ক্রমিক তালিকা নি¤œরূপÑ(১) পাঠচক্রের প্রয়োজনীয়তা (মূল আলোচক-মো: আব্দুল হান্নান, (২) সুনামগঞ্জে সাহিত্য চর্চার সমস্যা (মূল আলোচক- মো: সুবাস উদ্দিন), (৩) শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস-শিক্ষার ভবিষ্যৎ (মূল আলোচক- আব্দুল মালেক) (৪) রাজনীতিকদের সন্ত্রাস লালন (মূল আলোচক- রতন মজুমদার), (৫) নজরুলের কবিতায় স্বদেশ প্রেম ও সমাজ চেতনা (মূল আলোচক- মো: আব্দুল হান্নান) (৬) সুকান্তের কবিতায় শ্রেণি চেতনা (মূল আলোচক- কুমার সৌরভ), (৭) ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর:জীবন ও কর্ম (মূল আলোচক-ইকবাল কাগজী) (৮) প্রসঙ্গ: নারী স্বাধীনতা (মূল আলোচক-সাথী চৌধুরী), (৯) জীবনানন্দের সাহিত্যকর্ম (মূল আলোচক- মো: আব্দুল হান্নান), (১০) স্বাধীনতার ২৫ বছর: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি (মূল আলোচক-ইকবাল কাগজী) (১১) বাংলা সাহিত্যে মীর মোশারফ হোসেনের অবদান (মূল আলোচক-কুমার সৌরভ), (১২) আক্তারুজ্জামান ইলিয়াসের জীবন ও সাহিত্য (মূল আলোচক- ইকবাল কাগজী), (১৩) অভাবে পড়া (মূল আলোচক- মো: আব্দুল হান্নান) (১৪) একুশের চেতনা এবং বর্তমান প্রেক্ষাপট (মূল আলোচক-রতন মজুমদার)।
মাসে একটি অধিবেশনে শুধু নিজেদের লিখা পাঠ ও আলোচনার জন্য সংরক্ষিত রাখা এবং কিছু ক্ষেত্রে নির্ধারিত সপ্তাহে নির্ধারিত আলোচনা না হওয়া, কয়েকটি অধিবেশনে শুধুমাত্র সাংগঠনিক আলোচনা করা, স্বল্প উপস্থিতিজনিত কারণে অধিবেশন স্থগিত রাখা, একটি অধিবেশন পাঠচক্রের সক্রিয় সদস্য মালেক আহমদ’র অকাল মৃত্যুতে শোকসভায় রূপান্তর ইত্যাদি কারণে ৩০টি সাহিত্য অধিবেশনে মাত্র ১৪টি বিষয়ে আলোচনা করা সম্ভব হয়েছে। অধিকাংশ আলোচনাই মূল আলোচক লিখিত স্ক্রিপ্ট ছাড়া করায় এসব মূল্যবান আলোচনার লিখিত কপি নেই। এটি একটি দুর্বলতা ছিলো।
বিভিন্ন অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেছেন অ্যাডভোকেট শহীদুজ্জামান চৌধুরী, রণধীর দাস (ননী), মো: আব্দুল হান্নান, ব্রজেন্দ্র কুমার দাস, ইকবাল কাগজী, সুবাস উদ্দিন, রতন মজুমদার, মোস্তাফিজুর রহমান, সাথী চৌধুরী, গোলাম রাব্বী, জিতেশ গোপ ও ফজলুল হক।
অধিবেশনগুলো সাপ্তাহিক বন্ধের দিন শুক্রবার সকাল বেলা অনুষ্ঠিত হতো। অধিকাংশ অধিবেশনই অনুষ্ঠিত হয়েছে কালিবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। কয়েকটি অধিবেশন হয়েছে অ্যাডভোকেট শহীদুজ্জামান চৌধুরীর বাসভবন, অ্যাডভোকেট জালাল উদ্দিন রুমির বাসভবন ও মোস্তাফিজুর রহমানের বাসভবনে।
প্রথম থেকে ত্রিশতম অধিবেশনে উপস্থিতির সংখ্যা ছিলো যথাক্রমে ৮, ৭, ৬, ৯, ৭, ৭, ৮, ১১, ১২, ৬, ৬, ৭, ৩, ৩, ১০, ১১, ৬, ১০, ৫, ৮, ৮, ৯, ৫, ১০, ৮, ৬, ৭, ৭, ৭, ৪ ও ৮ জন। অধিবেশনগুলোতে উপস্থিতির সর্বোচ্চ সংখ্যা ১২ ও সর্বনি¤œ ৩ জন। গড় উপস্থিতি ৭ জন। উপস্থিতির এই সংখ্যা নিশ্চিতভাবেই হতাশাজনক ও সাহিত্য সংস্কৃতি তথা মননশীলতার চর্চার ক্ষেত্রে আমাদের সমাজ কতোটা উদাসীন এটি হলো এর উদাহরণ।
পাঠচক্রের টুকিটাকি খরচ মিটানোর জন্য প্রতি অধিবেশনে জনপ্রতি ৫ টাকা করে চাঁদা আদায় করা হতো। তাও সকলে দিতেন না। পাঠচক্রের মেয়াদকাল প্রায় ৮ মাসে মোট ৪ শ’ টাকা চাঁদা সংগৃহিত হয়। বলাবাহুল্য এই ৪ শ’ টাকাই ছিলো সংগঠনের মোট খরচ। কত কম টাকায় একটি সংগঠন পরিচালনা করা যায় এটি তার উদাহরণ হতে পারে।
উপরে আলোচক ও সভাপতি হিসেবে যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে তাঁদের বাইরেও বিভিন্ন সময়ে যারা অধিবেশনে অংশগ্রহণ করেছেন তাঁরা হলেন, মফর ফোরকান, অ্যাডভোকেট নিরঞ্জন তালুকদার, মো: শামছুজ্জামান (শামীম), মো: শাহজাহান, কোহিনুর ইসলাম, চাহিনুর ইসলাম, উৎপল ভট্টাচার্য, অনামিকা আচার্য (মুন্নী), ভূদীপ বর্মন শীলু, কালীপদ দত্ত, মো: আব্দুল কাদির বাবলু, মো: হাবিজুন ইসলাম, আমানুল হক রাসেল, গোলাম মোস্তফা, রবীন্দ্র কুমার দাস, মো: ইদ্রিছ আলী, আজিজুর রহমান তহুর, বিজিত ভূষণ রায়, আব্দুল আওয়াল, মো: আব্দুল মুকিত প্রমুখ।
মূল সংগঠক আব্দুল হান্নানের বদলিজনিত কারণে পাঠচক্র বন্ধ হয়ে যায়। আর কেউ দায়িত্ব নিয়ে এটিকে সচল রাখতে সক্ষম হন নি। অভিজ্ঞতায় বলা যায় মনন পাঠচক্রে সমকালীন তরুণ সাহিত্য-সংস্কৃতিকর্মীদের ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত করা যায় নি। তারপরেও পাঠচক্রের আট মাসের চর্চায় প্রাপ্তির পরিমাণ একেবারে ফেলনা নয়। বেশ কিছু আকর্ষণীয় ও প্রয়োজনীয় বিষয়ে আলোচনা হয়েছে যা অংশগ্রহণকারীদের মননশীলতাকে নিঃসন্দেহে সমৃদ্ধ করেছে। এছাড়া পাঠচক্র চর্চার একটি বাস্তব অভিজ্ঞতাও অনেকের হয়েছে এর মধ্য দিয়ে, যে অভিজ্ঞতাকে সারাজীবন কাজে লাগানো সম্ভব।
মনন পাঠচক্রের মূল উদ্যোক্তা আব্দুল হান্নান বর্তমানে প্রয়াত। ১৪ মার্চ’১৯৯৭ তারিখে অনুষ্ঠিত শেষ অধিবেশনে তিনি স্বরচিত তিনটি লিমেরিক আবৃত্তি করেছিলেন। তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে লিমেরিক তিনটি নীচে উল্লেখ করা হলো:-
এক
যার কাছে ভাই, মধু আছে
যাচ্ছে সবাই তারই কাছে
মধু ছাড়া কথা নাই রে
যেথায় যখন মধু পাই রে
ঘুরছে মানুষ মধুর পাছে।
দুই
তুমি আমার প্রিয়তমা
আমারে করো গো ক্ষমা
নাই শাড়ী নাই বাড়ী
কিনতে পারিনি গাড়ী
ভালোবাসা আছে শুধু জমা।
তিন
যে যার পথে চলছে সবাই
বলছে- হাতে সময় যে নাই
কবিতা তার সহিত্যকর্ম
শুনলে জ্বলে গায়ের চর্ম
সময় ক্ষেপণ, আর কিছু নাই।
মনন পাঠচক্রের অভিজ্ঞতা লিখার উদ্দেশ্য হলো, মননশীলতার জায়গায় পাঠচক্রের ভূমিকাকে তুলে ধরা যাতে বর্তমান তরুণ ও বয়স্করা নিজেদের মতো করে এমন প্রক্রিয়া শুরু এবং নিজেদের শাণিত করতে পারেন। পাঠ, আলোচনা ও চর্চার কোন বিকল্প নেই। একটি যুক্তিনির্ভর সমাজ প্রতিষ্ঠায় পাঠচক্র পুষ্টিকর খাদ্যস্বরূপ।
তথ্যউৎস: মনন পাঠচক্রের সাংগঠনিক রেজিস্টার।


