পাঠ-প্রতিক্রিয়া : কবি সুখেন্দু সেনের কাব্য ‘স্থির হয়ে আছে’ অস্থির সময়ের নিদারুণ সন্তাপ

কুমার সৌরভ
[ স্থির হয়ে আছে (কাব্য)। কবি সুখেন্দু সেন। অস্তিত্ব, ১০/২ পুরনো পল্টন (২য় তলা), ঢাকা। ফেব্রুয়ারি ২০২২। প্রচ্ছদ— ধ্রুব এষ]
সুখেন্দু সেন সময়ের কৃতবিদ্য লেখক। জেলার নাগরিক মঞ্চে তিনি সুপরিচিত, সম্মানীয় এবং সরব। শরণার্থী ৭১ নামের বইয়ে তিনি একাত্তরের প্রায় অনালোচিত অথচ গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ শরণার্থী ক্যাম্পসমূহে উদ্বাস্তু বাঙালি জীবন ও এর অন্তর্গত মানুষের সংগ্রাম ও বেদনা, রাজনৈতিক ঘুর্ণিমালার সাথে শরণার্থীদের সম্পর্ক আবিষ্কার, এ নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতির মোড় বদল প্রভৃতি বিষয়গুলো একজন নিষ্ঠ গবেষকের দৃষ্টিতে তোলে এনেছেন। তাঁর এই শ্রম ও ভালবাসায় সৃষ্টি হওয়া শরণার্থী ৭১ বইটি এখন জাতীয় পর্যায়ে আদৃত ও গ্রহণীয়। বইটির কয়েকটি সংস্করণ প্রকাশ এর প্রমাণ। এ কাজটির জন্য মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার জায়গায় তাঁর একটি বিশেষ স্থান নির্ধারিত হয়ে গেছে। তবে সুখেন্দু সেনের পরিচয় শুধু এই গবেষণায় সীমাবদ্ধ নেই। তাঁর কলমের বহুগামীতা, বৈচিত্রময়তা পাঠক মাত্রই অবগত। স্থানীয় পত্র পত্রিকাগুলো সুখেন্দু সেনের বিচিত্র বিষয়ের লেখা প্রকাশ করে ধন্য হয়। তাঁর লেখালেখির একটি পর্ব কবিতার প্রিয়তায় উদ্ভাসিত। অবশ্য তিনি নিজের কবি পরিচয়কে কখনও মুখ্য স্থান দিতে রাজী নন। কখনও তিনি নিজেকে কবি হিসাবে পরিচয় দিতে অথবা কেউ দিলে, অপ্রসন্ন না হলেও প্রসন্ন হন না। তারপরেও বাঙালি মাত্রই কবি। কল্পনার মনোরথে চড়ে বাঙালি মাত্রই আকাশের অসীম ক্ষমতাধর সূর্য, বিভাবতী চাঁদ, দূর পথে চলে যাওয়া রূপসীর বেনীর মতো নদী, রঙের জাদু ও সৌন্দর্যের মোহ মাখা ফুলের পাঁপড়ি, কলরব মুখর পাখি, নির্বাক নিশ্চল হয়ে থাকা পরম আশ্রয় ও ভরসার বৃক্ষরাজি দেখে দেখে জাদুবাস্তবতার অন্য এক জগতে ডুব দিতে ভালবাসেন। বয়সের বাঁকে বাঁকে আবেগের যে পরিবর্তন ঘটে, অনুরাগ তৈরি হয়, সংক্ষোভ ও বেদনার ছায়াপাত ঘটে; তা ধারণ করতে কবিতা অবিকল্প আধার। এই আধারে কৈশোরের অবাক বিষ্ময়, যৌবনের বাঁধ ভাঙা উচ্ছ্বাস, প্রৌঢ়ত্বের বোধিজ্যোতি, বার্ধক্যের বিপন্ন হাহাকার; সবকিছু তোলে রাখা যায়। নিজের অস্ফুট বাসনার কথা যেমন কবিতার পঙি্ক্ততে বাঙময় করা যায় তেমনি চেনা শত্রুর শক্তিমত্ততাকে অস্বীকার করে তাকে বিদ্রোহের আগুনে পুড়িয়ে ফেলা যায়। কবিরা নিজেদের সার্বভৌম ভাবতে পছন্দ করেন। তারা নিজেদের শৃঙ্খলের বন্দিত্বে আটকে রাখতে একেবারেই অনিচ্ছুক।
সুখেন্দু সেন শব্দমালী। তাঁর বাগানে থোকা থোকা বর্ণমালা কমলার মতো রসে টইটম্বুর। তিনি শব্দ দিয়ে মালা গাঁথতে পারেন অনায়াস দক্ষতায়। শব্দ যেন তাঁর অধীন। গাছে গাছে অজ¯্র ফুল ফুটে থাকলেও কিংবা সাজিতে থরে থরে নয়ন মনোহর পুষ্পাদি সাজানো থাকলেও দক্ষ মালীর অভাবে সেগুলো মালা হতে পারে না। শব্দও তেমন। উপযুক্ত শব্দশিল্পীর ছোঁয়া না পেলে সেগুলো অভিধানের নিরস রাজ্য থেকে চয়িত হয়ে রসের নহর বইয়ে দিতে অক্ষম। সুখেন্দু সেন এক সাবলীল শব্দশিল্পী। তিনি যখন কথা বলেন, কিছু লিখে প্রকাশ করেন; তাঁর সর্জিত কথামালা হয়ে উঠে অনিন্দসুন্দর, অগ্নিকঠিন, মৃত্তিকামমতাময়, ঊর্মিমালা—দৃঢ় । তাঁর রচিত যেকোনো গদ্য পাঠেও পাওয়া যায় কাব্যসুধার তৃপ্তি। এমন একজন কথাকার কবিতা লিখবেন না, তাঁর কোনো কাব্য প্রকাশ হবে না, এরকম সুষমাহীন বাস্তবতাই বর্তমান ছিলো এতদিন। এমন নিদারুণ বর্তমানের অবসান ঘটেছে অবশেষে। প্রকাশিত হয়ে রাশি রাশি মুক্তা ছড়িয়েছে সুখেন্দু সেনের কাব্য ‘স্থির হয়ে আছে’। এ উপলক্ষেই ভনিতার আকারে এত কথকতা। স্থির হয়ে আছে কাব্যে ৪৭ টি কবিতা অন্তর্ভুক্ত আছে। কবিতাগুলো মূলত কবির চেতনা ও আকাঙ্ক্ষার ঠাই। কবিতা কেমন হবে তা নির্ভর করে কবি কেমন তার উপর। এখানে আমাদের কবি সুখেন্দু সেন একজন সমাজভাবুক, একজন গভীর পর্যবেক্ষক, একজন পরিবর্তন প্রত্যাশী (ভাল পরিবর্তন অর্থে) সর্বোপরি একজন সুন্দর মনের সুশীল মানুষ। কবিতার শব্দে শব্দে, চরণে চরণে, পঙক্তিতে পঙক্তিতে এই বৈশিষ্ট্যগুলোই ফুটে উঠেছে।
তাঁর অন্তরজুড়ে মা। মার মাঝে তিনি শান্তি পেয়েছেন। এখন মার অবর্তমানে তাঁর স্মৃতির মাঝেই খোঁজে ফিরেন সেই অপার শান্তি। মায়ের চোখ কবিতায় তাই তিনি বলে উঠেছেনÑদু’টি চোখ ছায়ার মতো অনুসরণ করে আমাকে। অর্থাৎ মর্ত্যলোকে যেমন তিনি মায়ের চোখের আড়াল হতে পারেননি, মা এখন স্বর্গলোকে, তারপরেও একই চোখের সীমাতেই রয়েছেন কবি। এই একটি লাইনেই মায়ের প্রতি তাঁর গভীর দরদের অভিব্যক্তি প্রকাশিত। গ্রন্থের প্রথম ভুক্তি হিসেবে এই কবিতাটিকে বাছাই করার মধ্য দিয়ে কবি নিজের মাতৃঅন্তপ্রাণের পরিচয় দিয়েছেন।
কবি প্রকৃতিবিলাসী। প্রকৃতির সবকিছু তাকে সুখ দেয়। তিনি প্রকৃতি, পরিবেশ থেকে জীবনরস আহরণ করেন। আকাশ তোমার কবিতায় তিনি যেমন বলছেন, ‘আকাশ তোমার কোন সাজটি প্রিয়?/মেঘের কালো খোঁপায় বিজলি গুঁজে দিলে/ মন খারাপের ক্ষত যখন বৃষ্টি হয়ে গলে/ সিঁদুর মেঘের ওড়না যখন অস্তাচলে দুলে/ যখন তোমার উঠোন জুড়ে তারার প্রদীপ জ¦লে/ভোরের রবি ছড়ায় যখন আবীর পূর্বাচলে/ নীল শাড়িটা রাঙ্গাও যখন মেঘসাদা ছাপ ফুলে।/ কোন সে রূপে বিভোর থাকো কোন সে খেয়ালে?’ কী কল্পনাশক্তি, কী আবেগ কবির। এমন আবেগেরই প্রকাশ দেখি আমার শহর, গ্রীষ্মের কাব্য, অভিমানী মেঘ, ভদ্র চাঁদ, মেঘছায়া রোদ, জোছনায় বাস, বসন্ত আসে, কাশবনে আগুন, বৈশাখের যজ্ঞ, বিষাদ মেঘের চিঠি প্রভৃতি কবিতায়। প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানকে তিনি নিজের বান্ধব মনে করে বিশ^মঙ্গলের কাজের কাজী হিসাবে বিবেচনা করেন। নিজের ভিতরের কষ্টগুলোকে উড়ে চলা মেঘের সাথে উদ্যাম হাওয়ায় ভাসিয়ে দিতে চান। তিনি যখন বলেনÑ ‘আমার একলা থাকা মন/ উদাস হাওয়ায় উড়ে/ ভাবনাগুলো উতল ধারা/ শ্রাবণ হয়ে ঝড়ে।’’ (অভিমানী মেঘ) তখন বিষন্ন কবির কাছে প্রকৃতি হয়ে উঠে আত্মার গভীরের আরেক অস্তিত্ব। আবার নৈরাশ্যের গহ্বর থেকে বেরিয়ে আশার ভালবাসার দেখা মিলে যখন কবি বলে উঠেনÑ ‘কষ্টরা সব যায় দূরে সরে, ফিরে আসে ভালো লাগারা,/ চেয়ে দেখি দূরে মেঘলা দুপুরে রোদেলা পাহাড় চূড়া।’ (মেঘছায়া রোদ)। ওই দূরের পাহাড় চূড়ায় লেগে থাকা রোদই তো আমাদের সকলের শেষ ভরসা। ওই রোদই তো আমাদের বাঁচিয়ে রাখে, মরতে মরতে আমরা বেঁচে থাকি, হারতে হারতে একবার জিতার স্পৃহা জমিয়ে রাখতে পারি।
কবি প্রকৃতিঘনিষ্ট হলেও বাস্তবতাবিলগ্ন নন। নিজের চারপাশ সম্পর্কে সমান সচেতন তিনি। বিভিন্ন কবিতায় তাঁর সমকালীন পরিবেশের বিষয়টি উঠে এসেছে বলে আমরা দেখতে পাই। তুমি কার কবিতায় তিনি যখন বলেনÑ ‘রাষ্ট্র তুমি কার?/ লুটেরার।/ আইন তুমি কার?/ সে তো টাকার।/বিচার তুমি কার?/ কেবল ক্ষমতার/ সুযোগ তুমি কার?/ যারা চাটুকার’ তখন বুঝতে অসুবিধা হয় না কবি কতোটা সচেতনতা ধারণ করেন চেতনার গভীর মর্মমূলে। কবি বাস্তবতাকে পর্যবেক্ষণ ও ব্যাখ্যা করেই থেমে থাকেননি। কী কর্তব্য সে সম্পর্কেও সমান সজাগ থেকেছেন। তিনি যখন বলেনÑ ‘হয় যুদ্ধ করো না হয় আত্মসমর্পণ,/ প্রাচীন বৃক্ষের মতো সহনশীল/ আর কালের নির্মোহ সাক্ষী থেকে কী লাভ/ জীবনটা শুধুই যুদ্ধ আর সক্রিয় অংশগ্রহণ।’ (জয়—পরাজয়)। কবিকে যে সংগ্রামী হতে হয়, চিন্তকদের যে কর্মী হতে হয়, দার্শনিকদেরও বদলে দেয়ার কারিগর হতে হয়, এই কবিতায় কবি সেই ইঙ্গিতই দিয়েছেন। মানুষের অসম্ভব ক্ষমতায় বিশ^াসী কবি। তিনি মনে করেন সবকিছুই মানুষের সৃজনশীল হাতে নতুন করে বানানো যায়। মানুষ সাময়িক পরাভূত হতে পারে আবার সেই মানুষই গ্রহণকাল কাটিয়ে অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী হয়ে উঠার ক্ষমতা রাখে। এমন চিন্তার বহিঃপ্রকাশ দেখি হে সুন্দর কবিতায়। কবিতায় তিনি বলছেনÑ‘ মানুষই গড়ে ইতিহাস/ধ্বংসে, সৃষ্টিতে, স্থিতিতে/ প্রেমে ভালোবাসায়/ শ্রম, ঘাম, রক্ত, অশ্রম্ন/ মেধায় মননে।’ মানুষের এই অপার ক্ষমতার উদ্ভাসন কবি আরও বহু কবিতায় সমভাবে উচ্চারণ করেছেন।
কবিতা নিয়ে আলোচনার সময় কবিতার বিশুদ্ধতা বিষয়টি সামনে চলে আসে। আঙুল গুণে ছন্দ হিসাবের প্রয়াসও দুর্নীরিক্ষ নয়। কবিতায় বিশুদ্ধতার একটি বিষয় তো আছেই। ব্যাকরণ মানা কিংবা না মানা, সে কবির ইচ্ছাধীন। ব্যাকরণের শৃঙ্খল কেউ অস্বীকার করতে চাইলে সেই বিদ্রোহী কবিকে অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই। এই লেখক (নিবন্ধকার) কখনও কবিতায় ছন্দের বিষয়ে তেমন মনোযোগী নন। বরং পাঠে তৃপ্তি ও বক্তব্য বিষয়টিকে সবচাইতে মুখ্য অবস্থানে রাখতে পছন্দ করেন। শিল্প যদি হয় জীবনের প্রয়োজনে তাহলে কেন এত শৃঙ্খলিত হওয়ার সচেতনতা? বরং যে কবিতা মানুষের কথা বলে, মানুষকে প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়, দুনিয়াকে ভাল দিকে পরিবর্তনে উদ্বুদ্ধ করে; সেই শব্দসম্ভারকে কবিতা বলতে আপত্তি কোথায়? ছন্দের প্রতি অমনোযোগী থেকেও যদি ভাল চিত্রকল্প তৈরি করা যায়, উপমার বন্ধনে এমন চিত্রপট তৈরি করা যায় যা মানুষের মনকে সহজেই টানে, শব্দের গাঁথুনী যদি কবিমনের ে¯্রাতধারা আরও বহু মনে প্লাবন তৈরি করে, তাহলে সেই শব্দমালাই আমার আরাধ্য। আমি সেই জীবনমুখী কবির কবিতা নামক সৃষ্টিসম্ভারকে সম্মান করি। কবি সুখেন্দু সেন রচিত কবিতাগুলোতে তাই ছন্দের অঙ্ক মিলাতে যাওয়া এক অর্থহীনতা মাত্র। তাঁর কবিতা পড়তে ভাল লাগে, চয়িত শব্দ মনে অন্য ধরনের ভাবের জন্ম দেয়, কবিতায় বলা কথা কবির মন পেরিয়ে আরও বহু মনে জায়গা করে নেয়, উদ্দীপ্ত করে। এতসব গুণের সমারোহ যে—সব কবিতা, সেগুলোই তো আমার অপার শান্তি আর শৌর্যের আধার। সুখেন্দু সেনের কবিতায় পাঠক মাত্রই এরকম বিচিত্র অভিজ্ঞতার পথে হাঁটবেন, আমার স্থির বিশ^াস।
কবি গ্রন্থভুক্ত কবিতাগুলোকে বলেছেনÑ ‘অস্থির সময়ের নিদারুণ সন্তাপ/ প্রতিদিনের নিত্য পাঠ মৃত্যুসমগ্র/ সময়ের কাছে চুকিয়ে জীবনের অর্ঘ্য/ বুকে বুকে লিখে রাখা এপিটাফ।’ আমরা এখন যে সময় পারি দিচ্ছে সত্যিকার অর্থেই তা অনেক বেশি ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ। এই দুঃসহ সময়ের কালবেলা কাটিয়ে এক শান্তিময় পৃথিবী দেখতে সকল বিবেকবান ব্যক্তি আজ প্রতীক্ষমাণ। কবি তাই নিজের কবিতাতেই জীবনের অর্ঘ্য সাজিয়েছেন। আসুন আমরাও সেই অর্ঘ্যস্পর্শে একটুখানি সচকিত হই আর সন্তাপকালকে বলিÑ তুমি দীর্ঘ নও, অবিনশ^র নও। মানুষই শেষ অর্থে বিজয়ী। আমরা পৃথিবীটাকে মানুষেরই করে তোলব।
সময়ের ঋষি—প্রচ্ছদশিল্পী ধ্রুব এষের প্রচ্ছদ বইয়ের মান বহু গুণ বাড়িয়েছে নিঃসন্দেহে। কবি ও প্রচ্ছদশিল্পীকে আমাদের উষ্ণ অভিনন্দন।