বিশেষ প্রতিনিধি
হাওরডুবির প্রাক্কালে (২৮-৩১ মার্চ ২০১৭) বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবোর্ড)’এর মনিটরিং টিম সুনামগঞ্জ জেলার মাঠ পর্যায়ে পরিদর্শন শেষে পর্যবেক্ষণসহ মতামত দেয়। তাদের পর্যবেক্ষণে প্রকল্প পরিচালক, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, নির্বাহী প্রকৌশলীসহ শাখা কর্মকর্তাদের অনিয়ম, গাফিলতির চিত্র তুলে ধরা হয়। এসময় তারা সুনামগঞ্জ পাউবোর বিভিন্ন হাওরের কাবিটা ও এডিপিভূক্ত সম্পাদিত কাজ দৈবচয়ন পদ্ধতিতে ৩০টি সাইট নির্দিষ্ট করে সরজমিনে পরিদর্শন করেন। পরিদর্শক দল পারিদর্শনকৃত সাইটগুলির কোনটিতে কাজ শেষ হয়নি বলে দেখতে পান। অনুমোদিত নকশা অনুসারে কমপ্যাকশন করা হয়নি, পার্শ্ব ঢাল রাখা হয়নি, বাঁধের টো এর সন্নিকট হতে মাটি অপসারণের মাধ্যমে বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে এসব তথ্য উপস্থাপন করেছেন বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করলেও পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি তাদের তদন্ত প্রতিবেদনে বলেছে,‘পানি সরে গেলে আবার তদন্ত করতে হবে। মামলা করতেও আরো সুনির্দিষ্ট তথ্য লাগবে।’ স্থানীয় কৃষক নেতারা বলেছেন-‘এটি দুর্নীতি ধামাচাপা দেবার কৌশল, তারাই বলছে হাওরডুবির আগেই পরিদর্শক দল অনিয়ম পেয়েছে, আবার তারাই বলছে পানি সরে যাবার পর আরো তদন্ত করতে হবে, এগুলো স্ববিরোধিতা।’ তদন্ত প্রতিবেদনে পরিদর্শক দলকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ডিজাইনে ১৫০ সস ষধুবৎ নু পড়সঢ়ধপঃরড়হ রিঃয ৭ শম ষৎড়হ যধসসবৎ করার কথা বলা থাকা সত্বেও এস্টিমেটে মাটির কাজের জন্য প্রায় ২১% অর্থের সংস্থান থাকা সত্বেও সকল সাইটে কোন ধরনের পড়সঢ়ধপঃরড়হ দেখা যায় নি। এই আইটেমে ঠিকাদার বা পিআইসিকে কোন অর্থ প্রদান করা সম্পূর্ণ অনৈতিক। কাজ না করে অর্থ পেলে ঠিকাদার বা পিআইসির মধ্যে কাজ না করার অসুস্থ মানসিকতা তৈরি হয়, তাঁরা আশা করতে থাকে হয়তো এ বছর আগাম বন্যা হবে না এবং তারা অল্প কাজ করে পার পেয়ে যাবেন।
সকল সাইটে ঝরফব ংষড়ঢ় ১:২ এর কাছাকাছিও ছিল না। সাইড স্লোপ ১:১.১ থেকে ১:১.৫ পর্যন্ত গেছে। স্লোপ স্টিপার থাকার কারণে অনেক জায়গায় পানি আসার পূর্বেই বড় ধরনের ধস দেখা গেছে। হাওর অঞ্চলে যথাযথ স্লোপ মেইনটেইন করা অত্যন্ত জরুরী। অন্যদিকে স্লোপ ঠিকমত না হলে এবং কমপ্যাকশন না করলে ঝববঢ়ধমব এর সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়, যা বাঁধ ধসের একটি বড় কারণ।
এস্টিমেটে বাঁশ দিয়ে প্রোফাইল বা আইডিয়াল সেকশন তৈরি করার জন্য আইটেম থাকলেও বাস্তবে কোন সাইটে তা দেখা যায়নি। এছাড়া অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে পিআইসির সদস্যরা জানে না বাঁধের ক্রেস্ট কোন লেভেল পর্যন্ত নিতে হবে বা সাইড স্লোপ কোন পর্যন্ত হবে। হাওর অঞ্চলে কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য এর প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।
চেইনেজের দুর্বলতার কারণে অনেক সময় কাজের স্থান নির্ধারণ করা সম্ভব হয় নাই। এডিপি ও পিআইসির কাজ অনেক জায়গায় একই স্থানে হবার ফলে চেইনেজ ব্যবস্থাপনায় আরো দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন।
মার্চ মাসে বৃষ্টিপাতের কারণে অনেক জায়গায় মাটি পাওয়া দুষ্কর হয়ে যাওয়ায় কিছু সাইটে বালি দিয়ে বাঁধ তৈরি করা হয়েছে যার কারণে ডিজাইনে উল্লেখিত কমপক্ষে ৩০% ঈষধু স্পেসিফিকেশনের ব্যত্যয় হয়েছে। বালি দিয়ে তৈরি বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ বিধায় তা পরিহার করা প্রয়োজন।
হাওর অঞ্চলে বাঁধের কাজ মনিটরিং ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। শাখা কর্মকর্তাদের কাছ থেকে মৌখিক ভাবে অগ্রগতির প্রতিবেদন নেয়া হয়। তারা কোন ধরনের পরিমাণ না করে কেবল ধারণার বশবর্তী হয়ে অগ্রগতি প্রতিবেদন দেন। তাদের ৫০% বা ৬০% অগ্রগতি ব্যাখ্যা বা আইটেম ভিত্তিক অগ্রগতি প্রতিবেদন জানতে চাওয়া হলে তারা তা প্রদান করতে পারেন নি। আইটেম ভিত্তিক অগ্রগতি থেকে খুব সহজেই জানা যাবে কমপ্যাকশন, কেরিড আর্থ বা লিডে অগ্রগতি কেমন ধরা হয়েছে এবং বাস্তবতার সাথে তা কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ।
হাওর এলাকায় কাজ শেষ হওয়ায় উপযুক্ত সময় ২৮ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু সময় বর্ধিত করে ৩১ মার্চ করা সত্ত্বেও শেষ সময়ে পিআইসি বা ঠিকাদারদের মধ্যে কাজ শেষ করার কোন প্রবণতা লক্ষ করা যায়নি। একাধিক অসম্পূর্ণ সাইটে কোন লেবার দেখা যায় নি।
পিআইসি গঠনের এবং বাতিলের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া সহজ করা প্রয়োজন। পিআইসির সদস্য মনোনয়নের সময়সীমা কঠোরভাবে অনুসরণ করা দরকার। নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে মনোনয়ন পাওয়া না গেলে মনোনয়নের ক্ষমতা নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলে যাবে এমন বিধান থাকা প্রয়োজন।
কয়েক হাজার কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের বাঁধ মেরামত ও সংস্কার কাজের যথাযথ মান নিয়ন্ত্রণের জন্য পর্যাপ্ত জনবল ও ইনস্ট্রুমেন্ট প্রয়োজন। বিশেষ করে ভালো ভার্টিক্যাল একুরেসি আছে এরকম জিপিএস প্রয়োজন। দুর্গম হাওর অঞ্চলে সব সময় ফ্লাই করে লেভেল নির্ধারণ করা কষ্টকর ও সময় সাপেক্ষ।
যথাসময়ে মানসম্পন্ন কাজ করার জন্য ঠিকাদার বা পিআইসির ভালো মানসিকতা অত্যন্ত জরুরী। কাজ করার মানসিকতা ততোদিন পর্যন্ত তৈরি হবে না যতোদিন পর্যন্ত কাজ না করে (কমপ্যাকশন, লিড বা কেরিড আর্থ প্রভৃতি) অর্থ পাওয়ার সুযোগ থাকবে। দিরাই উপজেলার শ্যামারচরের কৃষক নেতা ও ঐক্য ন্যাপ নেতা অমর চাঁদ এই প্রসঙ্গে বলেন,‘হাওর ডুবির সময়েই (২৮ থেকে ৩১ মার্চ) পাউবো’র একটি পরিদর্শকদল ৩০ টি সাইট তদন্ত করে বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম পেয়েছে উল্লেখ করে আবার বলা হচ্ছে, পানি সরে গেলে আবার তদন্ত করতে হবে। এই ধরনের তদন্ত প্রতিবেদন ধামাচাপা দেবার কৌশল। পানি সরে গেলে তদন্ত করে কোন আলামত পাওয়া যাবে না। এটি মানুষের ক্ষোভ প্রশমনের জন্য সময় ক্ষেপণ’।


