বিশেষ প্রতিনিধি
ভিটেমাটিহীন হতদরিদ্র জাহাঙ্গীর ও প্রান্ত সরকার পুলিশ কনস্টেবলের চাকুরি পেয়েছে। জমি-জমা না থাকলেও কর্তৃপক্ষ চাইলে যে যোগ্যতা বিবেচনা করে চাকুরি হতে পারে সেটি বুঝিয়ে দিয়েছে সুনামগঞ্জের পুলিশ প্রশাসন। জেলার জামালগঞ্জ ও তাহিরপুরের একেবারেই দরিদ্র এই দুই তরুণের চাকুরি হয়েছে পুলিশ সুপারের বিশেষ উদ্যোগে।
হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার দিঘিরপাড় গ্রামের মৃত আব্দুজ জাহিরের ছেলে জাহাঙ্গীর আলম। বাবা আব্দুল জাহিরের মৃত্যুর পর মা হালিমা খাতুন জেলার তাহিরপুর উপজেলার বাদাঘাট ইউনিয়নের পুরান লাউড় গ্রামে ভাই শুকুর আলীর বাড়িতে চলে আসেন। এখানে যাদুকাটা নদীতে বারকী শ্রমিকের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন তিনি। ছেলে জাহাঙ্গীর আলমও মায়ের সঙ্গে সংগ্রাম করতে থাকে। ৮ম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায়ই কয়েকটি টিউশনি করেছে সে। এসএসসি পাস করার পর হবিগঞ্জে প্রাণ কোম্পানীতে চাকুরি নেয় জাহাঙ্গীর আলম। একইসঙ্গে চুনারুঘাটের গাজীপুর হাইস্কুল এ- কলেজে ভর্তি হয়ে পড়াশুনাও চালায়। প্রাণ কোম্পানীতে চাকুরি করেই এবার এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে জাহাঙ্গীর। মা হালিমা খাতুন দুই বছর পক্ষাঘাতগ্রস্ত (প্যারালাইজড) হওয়ায় একেবারেই বিপদে আছে জাহাঙ্গীর।
বললো, ‘আমার বংশের কেউ সরকারি চাকুরি করে না, পুলিশ সুপার স্যার মানুষ সম্পর্কে ধারণা বদলে দিয়েছেন, তাহিরপুর থানার ওসি স্যার যখন বলেছেন, ভিটেমাটির জন্য যাতে আমি চাকুরি বঞ্চিত না হই তা দেখা হবে। আমি তখন আল্লাহ্কে ডেকেছি, গতকাল (মঙ্গলবার) আমি যখন শুনেছি ডিসেম্বরের শেষের দিকে নিয়োগের চিঠি আসবে আমার, আমার শরীরে কাঁপন শুরু হয়েছে, আমি আল্লাহ্’র দরবারে শুকরিয়া আদায় করছি।’
সুনামগঞ্জে ২৯ অক্টোবরে পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ পরীক্ষায় প্রথমে তিনদিনের শারীরিক কসরতে উত্তীর্ণ হয় জাহাঙ্গীর আলম। পরে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। পুলিশ প্রতিবেদন (ভেরিফিকেশন) দেবার সময় বাড়ি-জমি না থাকায় চাকুরি পেতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয় হতদরিদ্র এই তরুণের। বিষয়টি পুলিশ সুপারকে জানান তাহিরপুর থানার ওসি আব্দুল লতিফ তরফদার।
পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান তাহিরপুর থানার ওসিকে নির্দেশ দেন, জমি জমা না থাকায় ছেলেটির চাকুরি যেন না আটকায়।
তাহিরপুর থানার ওসি আব্দুল লতিফ তরফদার বললেন, ‘পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগের সকল পরীক্ষায় জাহাঙ্গীর আলম উত্তীর্ণ হবার পর পুলিশ প্রতিবেদন দেবার জন্য আমাদের কর্মকর্তা জাহাঙ্গীরের বাড়িতে গিয়ে দেখতে পান, থাকার উপযোগী ঘরই নেই, মা ছেলের কষ্টে দিন কাটে, বিষয়টি এসপি স্যারকে জানালে তিনি নির্দেশ দেন পুলিশ রিপোর্টের জন্য চাকুরি বঞ্চিত যাতে সে না হয় সেইভাবে রিপোর্ট দেবার জন্য। আমরা তখন জাহাঙ্গীরের মামা শুকুর আলীর কাছ থেকে অঙ্গীকারনামা নেই, জাহাঙ্গীরের মা এবং জাহাঙ্গীরকে যেন কোন দিন স্থান ছাড়া হতে হয় না। পরে সেভাবেই রিপোর্ট পাঠাই।’
ঠিক একইভাবে জামালগঞ্জের ফেনারবাঁক ইউনিয়নের জমিজমাহীন রামজীবন সরকার ও রীমা রানী সরকারের ছেলে প্রান্ত সরকারের পুলিশ কনস্টেবল পদে চাকুরি হচ্ছে। উপজেলার ফেনারবাঁক ইউনিয়নের খোঁজারগাঁও গ্রামে শ^শুর বাড়িতে থেকে বর্গচাষ করেন প্রান্ত’র বাবা রামজীবন সরকার। বড় ছেলে প্লাবন সরকার বেসরকারি কোম্পানীর ছোট চাকুরীজীবী।
এসএসসি পাসের পর পড়াশুনা বন্ধ হবার উপক্রম হয় প্রান্ত’এর। পরে দুটি টিউশনি’র ব্যবস্থা করে সিলেটের হাউজিং স্টেটের স্টেট কলেজে ইন্টারমিডিয়েট ভর্তি হয় প্রান্ত। ওখান থেকে এইএসসি পাস করে সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে গণিত বিষয়ে অনার্সে ভর্তি হয়েছে সে।
প্রান্ত বললো, সকল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার পর পুলিশ প্রতিবেদনের সময় বিপদে পড়ি, বিষয়টি জেনে সবকিছু যাচাই শেষে পুলিশ সুপার স্যার নির্দেশ দেন, রিপোর্ট পাঠাতে দুয়েকদিন সময় নিয়ে হলেও আমার দাদু (মা’এর বাবা) রামচন্দ্র তালুকদার যেন আমার মা’এর নামে জমি রেজিস্ট্রি করে দেন। পরে একটি গরু বিক্রি করে টাকার ব্যবস্থা করে মায়ের নামে ৫ দশমিক দুই শতক জমি রেজিস্ট্রি করা হয়েছে। জমি দিয়েছেন আমার দাদু।
প্রান্ত জানায়, মঙ্গলবার পুলিশ হেড কোয়ার্টার থেকে তার পোশাকের মাপজোঁক নেওয়া হয়েছে। এটা জেনে পরিবারের সকলেই খুশি হয়েছেন।
জামালগঞ্জ থানার ওসি মীর মোহাম্মদ আব্দুন নাসের বললেন, পুলিশ প্রতিবেদনের জন্য হতদরিদ্র প্রান্ত যেন চাকুরি বঞ্চিত না হয় সেই চেষ্টা ছিল আমাদের, এসপি স্যারের সদিচ্ছা থাকায় আমরা সেটি করতে পেরেছি।
পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান বললেন, হতদরিদ্র জাহাঙ্গীর এবং প্রান্ত এর বিষয়টি জেনে আমি সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছিলাম এই দুজন প্রকৃতপক্ষে এখানকার স্থায়ী বাসিন্দা কি-না নিশ্চিত হওয়া এবং ভূমিহীন হওয়ায় তারা যেন চাকুরি বঞ্চিত না হয় সেটি খেয়াল রাখা। আমার সহকর্মীরা নির্দেশ প্রতিপালন করায় আমি খুশি, সুবিধাবঞ্চিত দুই তরুণের চাকুরি হওয়ায় তাদের পরিবারও খুশি।


