সুনামগঞ্জের এসপি’র বিশেষ উদ্যোগ- ভূমিহীন ২ যুবকের চাকুরি পাওয়ায় অভিনন্দন

সুনামগঞ্জের জেলা পুলিশ প্রশাসন তথা পুলিশ সুপারের বিশেষ উদ্যোগের ফলে ২ ভূমিহীন পরিবারের সন্তানের পুলিশের কনস্টেবল পদে চাকুরি পাওয়ার খবরটি আমাদের নজর কেড়েছে। তাহিরপুরের জাহাঙ্গীর আলম ও জামালগঞ্জের প্রান্ত সরকার উভয়েই ভূমিহীন পরিবারের সন্তান। বাংলাদেশের নাগরিক তারা। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে এই দেশের কোথাও তাদের পিতা-মাতার নামে এক ইঞ্চি ভূমি নেই। অন্যের জায়গায় থাকেন তারা। পুলিশের কনস্টেবল পদের প্রাথমিক শারীরিক সামর্থ পরীক্ষা ও পরবর্তীতে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কনস্টেবলের চাকুরি পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে তারা। কিন্তু পুলিশের নিয়োগ বিধিতে চাকুরি পাওয়ার পূর্বশর্ত হিসাবে নিজস্ব স্থায়ী ঠিকানা থাকার বাধ্য-বাধকতা থাকার কারণে যোগ্যতা অর্জনের পরও তাদের চাকুরি পাওয়া নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়। এই শঙ্কা দূর করেছেন পুলিশ সুপার। তিনি সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাগণের সহায়তায় তাদের নিজস্ব স্থায়ী ঠিকানার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। এখন শুধু অপেক্ষা নিয়োগপত্র পাওয়ার। চাকুরি পাওয়ার সম্ভাবনা চূড়ান্ত হওয়ায় দরিদ্র দুই পরিবারের এই দুই সন্তান আনন্দে উচ্ছ্বসিত। আমরাও আনন্দিত অন্তত নিজের জায়গা না থাকার জন্য এই ২ বাংলাদেশি নাগরিকের চাকুরি বঞ্চিত হওয়ার খবর না শুনে। এজন্য বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানাই পুলিশ সুপারসহ পুলিশ প্রশাসনের সকলকে। আরও ধন্যবাদ এদের স্থায়ী ঠিকানা তৈরিতে সহায়তাকারী তাদের আত্মীয়-স্বজনদেরও।
নিজস্ব ভূমি না থাকায় বরিশাল ও খুলনার যথাক্রমে আসপিয়া ও মিম আক্তার নামে দুই নারীর পুলিশ কনস্টেবলের চাকুরি না হওয়ার খবর প্রচার হওয়ার পর বিষয়টি জাতীয়ভাবে আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছিল। অনেকেই পুলিশের নিয়োগবিধিতে এমন নিয়মের বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেন। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত পৌঁছে যায় এসব কাহিনী। পরে তাদের জায়গার ব্যবস্থা হয়েছে। হয়ত আসপিয়া ও মিম আক্তারের চাকুরিও হয়ে যাবে। কিন্তু এই ঘটনার মধ্য দিয়ে নিয়োগবিধির যে শর্তের কথা উঠে এসেছে তা এক কথায় অগ্রহণযোগ্য। এই বিধি দেশের দরিদ্র মানুষের জন্য অশেষ যন্ত্রণা। কেউ কখনও ইচ্ছে করে ভূমিহীন হয় না। আমাদের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার কারণে মানুষ সর্বহারা হয়। এটি ব্যক্তির কোন অপরাধ বা ঘাটতি নয়। বরং রাষ্ট্রের ভিতর গভীরভাবে শিকড় গেঁড়ে থাকা বৈষম্যের প্রতীক এইসব ভূমিহীনরা। জাতীয়ক্ষেত্রে অগ্রগতির যে নিরন্তর যাত্রা সেখানে সবচাইতে বড় কথাই হলোÑ মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানো। কারও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়লে তার ভিটে-জমিহীন হয়ে থাকার কোন কারণ নেই। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত দেশে একজন ভূমিহীন বা স্থায়ী ঠিকানাবিহীন লোক থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটানো রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। এই জায়গায় শুধু জমি না থাকার কারণে কোন প্রতিষ্ঠানে অন্যসব যোগ্যতা থাকার পর কারও চাকুরি না হওয়া বিদ্যমান বৈষম্যকে আরও প্রকট করবে নিঃসন্দেহে। এই ধরণের নিয়মের পরিবর্তন হওয়া প্রয়োজন।
সুনামগঞ্জের জাহাঙ্গীর কিংবা প্রান্ত ভাগ্যবান। তারা পুলিশ সুপারের মানবিক উদারতার সুযোগ পেয়েছেন। কিন্তু অনেক জায়গায়ই এরকম মানবিক উদ্যোগের দেখা মিলবে না। এজন্যই সিস্টেমের বদল দরকার। বাংলাদেশে বহু সংখ্যক মানুষ আছেন যাদের কোথাও এক টুকরো জমি নেই। শহরে যারা ভাড়া থাকেন অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে তাদের একটি বড় অংশই ভূমিহীন। সংগ্রাম করে করে এরা বেঁচে আছেন, সন্তানদের লেখাপড়া শিখাচ্ছেন। তাদের সন্তানরা যখন নিয়োগ পরীক্ষার উত্তীর্ণ হওয়ার পরও স্থায়ী ঠিকানার কারণে চাকুরি বঞ্চিত হন তখন তাদের ভিতরে দারিদ্রতার জ¦ালা আরও সুতীব্র হয়ে উঠে। তারা তখন সত্যিকার অর্থেই হয়ে উঠেন অধিকার হারা নাগরিক। এদের ভিতরের বঞ্চনাবোধ দূর করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপারসহ পুলিশ প্রশাসনকে মানবিক উদারতা দেখানোয় আবারও অভিনন্দন। এই ধরনের মানবিক জাগৃতি ঘটুক সর্বত্র।