প্রকাশক দীপন হত্যাকাণ্ডের মিশন প্রধান ছাতকের জঙ্গি শামীম ঢাকায় গ্রেফতার

বিশেষ প্রতিনিধি
ছাতকের কালারুখা ইউনিয়নের মাধবপুরবাসী স্তম্ভিত। তাদের গ্রামের শান্ত ও বিনয়ী শামীমই এক দুধর্ষ জঙ্গি হন্তারক, এরকমটি বিশ্বাস করতেই তাদের কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু সত্য বড় নির্মম। মাধবপুরের শামীমই (সংগঠনে যার কয়েকটি টেক নাম ছিল- শিফাত, সামির, ইমরান)। মঙ্গলবার রাতে টঙ্গির চেরাগ আলী মার্কেটের সামনে থেকে শামীম ওরফে সিফাতকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের গোয়েন্দা ও অপরাধ তথ্য বিভাগ (ডিবি)। ঢাকার প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান জাগৃতির কর্ণধার ফয়সল আরেফীন দীপন হত্যা ঘটনার কিলারগ্রুপের নেতা ছিলো এই শামীম।
শামীমের প্রতিবেশি মধ্যবয়সী এক ব্যক্তি বলেন,‘পরিবারটি এক সময় আওয়ামী লীগের জন্য নিবেদিত ছিল। শামীমের বাবা মৃত আব্দুল কদ্দুছ এলাকায় ত্যাগী নেতা (স্থানীয় নেতা) হিসাবে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু শামীমের বড় ভাই আবু জাফর টিপু সিলেট সরকারি কলেজে পড়াশুনার সময়ই শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন বলে গ্রামের একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন। গ্রামের একাধিক ব্যক্তি জানান, শামীম বিনয়ী ছিল। কিন্তু সিলেটের শাহ্জালাল জামেয়ায় পড়াশুনার সময়ই সে শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। স্কুল ছাত্র থাকাকালীন সময়েই সে জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাহ্রিরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে।
আশপাশ গ্রামের প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মীরা জানান। আবু জাফর টিপুই মঈনুল হাসান শামীমসহ অন্য ভাইদের সিলেট নগরের জামায়েতের প্রতিষ্ঠান হিসাবে পরিচিত শাহজালাল জামেয়াতে ভর্তি করান। শামীমের অন্য দুই বড় ভাই লন্ডন প্রবাসী নাজমুল হাসান লিটু এবং মঞ্জুরুল হাসান মঞ্জুর   
 সিলেটের শাহ্জালাল জামেয়ার শিক্ষার্থী ছিলেন। পরে সিলেট সরকারি কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে লন্ডনে চলে যান। এরাও সিলেটে ইসলামী ছাত্র শিবিরের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। মঈনুল হাসান শামীম শাহজালাল জামেয়া থেকে এসএসসি পাস করে মদন মোহন কলেজে ভর্তি হন। ঐ কলেজের সক্রিয় শিবির কর্মী সে। ইন্টারমিডিয়েট পাস করে এই কলেজেরই ডিগ্রি’র ছাত্র সে।
২০১০ সালে ছাতকের গোবিন্দগঞ্জ কলেজের আশপাশে হিজবুত তাহ্রিরের লিফলেট বিতরণের সময় পুলিশ গ্রেপ্তার করেছিল তাকে। এরপর ৮ মাস জেল কেটে ছাতকের জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালত থেকে ১ বছরের জন্য জামিনে মুক্তি পায় সে। এরপর হাইকোর্ট থেকে দীর্ঘ মেয়াদে জামিন নেয় শামীম।
মাধবপুরের এক তরুণ (পরিচয় প্রকাশ করতে অপরাগ) জানান, সর্বশেষ গত ফেব্রুয়ারিতে শামীমকে বাড়িতে দেখেছেন তিনি।
ঐ তরুণ জানান, শামীমদের দুই বোন বড় বোন রুমি বেগমের স্বামী ছাতকের নোয়ারাইয়ের শাহ্ আলম, স্থানীয়ভাবে জামায়েতের প্রভাবশালী নেতা। অন্য বোন রতœা বেগমের স্বামী ছাতকের ব্যবসায়ী তাজ উদ্দিন।
শামীমের বড় ভাই আবু জাফর টিপু’র সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলতে চাইলে- মুঠোফোনে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেন,‘ভাই হিসাবে অবশ্যই শামীমের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ ছিল’। আপনি জামায়াত করতেন এবং সিলেটের শাহ্জালাল জামেয়াতে সকল ভাইকে আপনি ভর্তি করিয়েছেন এমন কথা বলতেই- উত্তেজিত হয়ে ওঠেন আবু জাফর টিপু। তার সঙ্গে কথা বলা যায়নি। তিনি লাইন কেটে দেন। আবারও ফোন করলে তিনি বলেন,‘কথা বলতে হলে সামনা সামনি আসুন’।
পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ বলেন,‘২০১০ ইংরেজিতে ছাতকের গোবিন্দগঞ্জ কলেজের আশপাশে হিযবুত তাহ্রিরের লিফলেট বিতরণের সময় শামীমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ৮ মাস জেল খেটে ছাতকের জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালত থেকে ১ বছরের জন্য জামিন নেয় সে। বাড়িতে কম আসতো শামীম। সুনামগঞ্জ পুলিশ তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করছিল’।  
প্রসঙ্গত. ঢাকার প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান জাগৃতির কর্ণধার ফয়সল আরেফিন দীপনকে হত্যার এক মাস আগে থেকেই রাজধানীর অদূরে টঙ্গিতে প্রশিক্ষণ নেয় নিষিদ্ধ আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) সদস্যরা।
বুধবার দুপুরে রাজধানীর মিন্টো রোডে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত কমিশনার ও কাউন্টার টেরোরিজম এন্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম জানান, বিজ্ঞান বিষয়ক লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায়ের বই প্রকাশ করার কারণেই তাকে টার্গেট করা হয়। অপারেশন চালাতে টঙ্গিতে এক মাস প্রশিক্ষণের পর ঢাকার মহাখালীতে একটি বাসা ভাড়া নেয় জঙ্গিরা। ওই অপারেশনে এবিটির স্লিপার সেলের ৫ সদস্য অংশ নেয়। এদের নেতৃত্বে ছিল মইনুল হাসান শামীম ওরফে সিফাত ওরফে সামির ওরফে ইমরান।
মঙ্গলবার রাতে টঙ্গির চেরাগ আলী মার্কেটের সামনে থেকে শামীম ওরফে সিফাতকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের গোয়েন্দা ও অপরাধ তথ্য বিভাগ (ডিবি)।
পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও জানান, লালমাটিয়ায় শুদ্ধস্বর প্রকাশনীর প্রকাশক আহমেদ রশিদ টুটুল হত্যাচেষ্টা মামলায়  গ্রেপ্তার হওয়া এবিটি সদস্য সাইফুলের তথ্যের ভিত্তিতে সিফাতকে গ্রেপ্তার করা হয়।