মো. আলী ওয়াক্কাস সোহেল
মানুষ মরণশীল। এ ধরায় মানবকুলের স্থায়ীভাবে থাকার কোনো সুযোগ নেই। জন্মিলে সমাজ সংসার ছেড়ে চলে যেতে হবে- এটাই নির্মম বাস্তবতা। যা জগতের কোনো শক্তি কৌশল প্রভাব দিয়েই প্রলম্বিত করার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই। এ ধরণিতে প্রতিনিয়ত মানবের আগমনের নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে; যা একেবারেই স্বাভাবিক। ক্ষণিকের পথচলায় অসংখ্য মানবের ভিড়ে মাঝে মাঝে এমন সব ক্ষণজন্মা মানবতাবাদী দায়িত্বশীল সংগঠক আপাদমস্তক ভালো মানুষের উপস্থিতি ঘটে, যা মানবের স্মৃতির আয়নায় ভেসে ওঠে। এসব মানুষের বিদায় মানবতাকে কাঁদায়, শূন্যতার সৃষ্টি করে এবং তাদের দেখানো পথ আউড়িয়ে পরবর্তী সমাজ প্রেরণার উৎস খোঁজার প্রয়াস চালায়। এমনই একজন প্রথিতযশা মানুষ ছিলেন হাসান শাহরিয়ার।
সাংবাদিক হাসান শাহরিয়ার যিনি ভাটিবাংলার রাজধানী সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৯৪৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন। উত্তরাধিকার সূত্রেই তিনি সাংবাদিকতার স্বাদ গ্রহণের সুযোগ পেয়েছিলেন। তার বাবা মকবুল হোসেন চৌধুরী একাধারে ভাষাসৈনিক, কলমযোদ্ধা ও রাজনীতিক ছিলেন। তিনি আসামের এমএলএ-ও ছিলেন। এমন বাবার সন্তান হিসেবে শাহরিয়ার ভাইয়ের মানবতাবোধ, ভালোবাসা ও পেশাদারিত্বের বীজ অঙ্কুরেই রোপিত হয়েছিল।
ছাত্রাবস্থায় তার সাংবাদিকতার হাতেখড়ি। তদানীন্তন পাকিস্তানের করাচিতে উচ্চশিক্ষার্থে থাকাকালে তিনি দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি পাকিস্তানের দৈনিক ডনের স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ডিগবাজি পছন্দ করতেন না, সদা হাসিমুখ মানুষটি পাকিস্তান থেকে ফিরে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার বিভিন্ন স্তরে দায়িত্ব পালন শেষে ২০০৮ সালে নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে আনুষ্ঠানিক অবসর গ্রহণ করেন। শাহরিয়ার ভাইয়ের সাংবাদিকতায় আন্তর্জাতিকতা বোধ ও ব্যাপ্তি বেশ ব্যাপক। দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক বিশ্নেষক হিসেবে তার যশ ও খ্যাতি চারিদিকে বিস্তৃত ছিল। মার্কিন বিখ্যাত সাময়িকী নিউজ উইকে নিয়মিত লিখতেন। তার সাংবাদিকতার জীবদ্দশায় মর্নিং নিউজ, আরব নিউজ, খালিজ টাইম, ডেকান হ্যারাল্ডসহ অনেক নামিদামি পত্রিকায় স্বাধীনতা, দেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার নানা বিষয়ে তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক লেখনী পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। মাদার তেরেসা, জিয়াউল হক, নওয়াজ শরিফ, বেনজির ভুট্টো, জুলফিকার আলি ভুট্টো, ইমরান খান, ইন্দিরা গান্ধী, নরসীমা রাও, চন্দ্র শেখরসহ অনেকের সাক্ষাৎকার আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে প্রকাশ করে মেধা ও মননের স্বাক্ষর রাখেন তিনি।
এ মানুষটি সাংবাদিকতার পাশাপাশি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের সংগঠনে অধিকার নীতিবোধ পেশাদারিত্ব এবং উৎকর্ষ বিনির্মাণে কাজ করে গেছেন। তিনি জাতীয় প্রেস ক্লাবের সফল সভাপতি ছিলেন। এর পাশাপাশি বৈদেশিক সাংবাদিক সংস্থার সভাপতি এবং কমনওয়েলথ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করে দেশ ও জাতিকে সম্মানিত করেছেন।
এ মানুষটি অকৃতদার ছিলেন। পাবনা কলোনির বাসিন্দা আওয়ামী ঘরানার হয়েও সব পথ ও মতের মানুষকে সম্মান এবং তাদের অবদানকে স্বীকৃতি জানাতে দ্বিধা করেননি। নিরহংকারী মেধাবী বন্ধুবৎসল মানুষটি সারা জীবন মানুষের জন্য কাজ করে গেছেন হাসিমুখে। বিনিময়ের প্রত্যাশা বা আকাঙ্ক্ষা যাকে ক্ষণিকের জন্যও গ্রাস করতে পারেনি। বঙ্গবন্ধু এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সুসম্পর্ক ছিল তার। সব সময়ই দেশ ও এলাকার মানুষের মুখে হাসি দেখতে চেয়েছিলেন। আত্মীয়-অনাত্মীয় সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতেন। পেশাগত ঘরানায় তার শত্রুর উপস্থিতি ছিল না বললেই চলে। ভোজনরসিক এ মানুষ অনেকের আতিথেয়তায় মুগ্ধ হয়েছেন। যিনি স্থানিক খাবার বেশি পছন্দ করতেন।
হাসান শাহরিয়ার তার পেশায় পেইড জার্নালিজম এবং হলুদ সাংবাদিকতার ছোবলকে প্রশ্রয় দিতেন না। যার কারণে জীবনের শেষ সময়ে এসবের ব্যাপারে তার খেদ ছিল। তিনি আফসোস করতেন উৎসবিহীন খবর পরিবেশনের হীন প্রচেষ্টার। কাউকে খাটো করা বা অবমূল্যায়ন এবং মানহানিকর তথ্য পরিবেশনের নিরুৎসাহিত করতেন। সমাজের মাঝে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করতে পারে, এসব বিষয়কে বেশি প্রাধান্য দিতেন। হাসান শাহরিয়ার জমিদার বংশের সন্তান হয়েও আভিজাত্যের ভয় এবং সাধারণ্যে নিজেকে নিয়োজিত রাখার মানসে পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্ত উপাধি ব্যবহারে অমনোযোগী ছিলেন। কারণ তিনি জানতেন কীভাবে সহজ সরল হাওর-বাঁওড়-নদীপাড়ের মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে আমোদী জীবন যাপিত করা যায়। নিকটজনের জবানিতে প্রাপ্ত তথ্যমতে ক্ষমতার স্বাদ গ্রহণের অপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সারল্য ও সহজীপনায় তা প্রত্যাখ্যান করে দৃঢ় ব্যক্তিত্বের স্বাক্ষর রাখেন।
হাসান শাহরিয়ার ভালোবাসতেন এ দেশকে এবং দেশের মানুষকে। বয়সের বাধা অতিক্রম করে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে সুসম্পর্ক ও আত্মিক বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে এ দেশমাতৃকার কল্যাণে সারা জীবন ব্যয় করেছেন।
এ মানুষটি আজ আমাদের মাঝে নেই। সবার প্রিয় শাহরিয়ার ভাই আজ পরপারের বাসিন্দা। আমরা যদি তার রেখে যাওয়া সততা পেশাদারিত্ব নেতৃত্বগুণ মানবিকতা উদারতা আপন করার কৌশল জবাবদিহিতা লালনপালন অনুশীলন করার পাশাপাশি চাটুকারিতা আত্মম্ভরিতা আভিজাত্য লোভ-লালসা পরিহার করতে পারি, তবেই কিনা স্বাজাত্যবোধ মাটি ও মানুষের জন্য কাজ করার রসদ আহরণের ক্ষেত্রে এ মহান ব্যক্তির জীবন সমগ্র হয়ে উঠতে পারে প্রজন্মের প্রেরণার বাতিঘর।
লেখক : শিক্ষক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
সূত্র : সমকাল


