স্টাফ রিপোর্টার
১৯৪৬ সালের ২৫ এপ্রিল এক কালবৈশাখীর রাতে সুনামগঞ্জ পৌর শহরের হাসন নগরে হাসান শাহরিয়ারের জন্ম। পিতা মকবুল হোসেন চৌধুরী এবং মা স্ত্রী শফিকুন্নেসা চৌধুরী দম্পতির ৮ ছেলে মেয়ের মধ্যে মেয়ে হাওয়া ও ছেলে তা’হা জন্মের পরপরই মারা যান। অবশিষ্ট ৬ জন ছিলেন রোকেয়া চৌধুরী, ফারুক চৌধুরী, আসিয়া রওশন জাহান চৌধুরী, হোসেন তওফিক চৌধুরী, হাসান শাহরিয়ার ও আসমা হোমায়েরা চৌধুরী বেবী। বর্তমানে বিশিষ্ট আইনজীবী ও কলামিষ্ট হোসেন তওফিক চৌধুরী ছাড়া সবাই পরপারে।
হাসান শাহরিয়ারের পিতা মকবুল হোসেন চৌধুরী ছিলেন তদানীন্তন আসামের প্রথম মুসলিম সম্পাদক। তিনি সম্পাদনা করেছেন কলকাতার দৈনিক ‘ছোলতান’ (১৯৩০Ñ৩১), সিলেটের সাপ্তাহিক ‘যুগবাণী’ (১৯২৫), সাপ্তাহিক ‘যুগভেরী’ (১৯৩২Ñ৩৯) ও ‘সিলেট পত্রিকা’ (১৯৫৭)। মকবুল হোসেন চৌধুরী ছিলেন খেলাফত আন্দোলনের তরুণ নেতা, আসাম ব্যবস্থাপক সভার সদস্য (এমএলএ) হুইপ ও ভাষাসৈনিক। ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত তিনি নির্বাচিত এমএলএ ছিলেন।
সুরমা উপত্যকা প্রতিনিধি দলের একজন সদস্য হিসেবে মকবুল হোসেন চৌধুরী ১৯২০ সালে ভারতের নাগপুরে অনুষ্ঠিত সর্ব ভারতীয় কংগ্রেস সম্মেলনে যোগদান করেন। সরকার বিরোধী বক্তব্য দেয়ার অভিযোগে ব্রিটিশ রাজ তাঁকে দু’বছর কারারুদ্ধ করে রাখে। কিছুদিনের জন্যে তিনি ইন্ডিয়ান জার্নালিস্ট এসোসিয়েশনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিভাগের যুগ্ম সম্পাদকের দার্য়িত্ব পালন করেন।
গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকের শুরুতে হাসান শাহরিয়ার এইচএমপি (হাজী মকবুল পুরকায়স্থ) এমই মাদ্রাসার মক্তবে (এখন হাইস্কুল) ভর্তি হন। এখানেই আমাদের শিক্ষার হাতেখড়ি। এই মাদ্রাসা স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তাঁর নানা হাজী মকবুল পুরকায়স্থ। মক্তবের পাঠ শেষ হলে ভর্তি হন এমই মাদ্রাসায়। সরকারি জুবিলি হাইস্কুলে ভর্তি হন ১৯৫৬ সালে পঞ্চম শ্রেণীতে। ক্লাস সিক্সে বৃত্তি পরীক্ষা দেওয়ার সময় ১৯৫৭ সালের ২০ ডিসেম্বর তাঁর পিতা মকবুল হোসেন চৌধুরী মৃত্যুবরণ করেন। এরপর তাঁর চাচা ইকবাল হোসেন চৌধুরী মুন্সেফ (বর্তমান নাম সহকারি জজ) ঐ সময় মুন্সেফদের ডিস্ট্রিক্ট ম্যানেজার ফর একোয়ার্ড এস্টেট হিসেবে তিনি ছিলেন পাবনায়। তিনি হাসান শাহরিয়ার কে তাঁর কাছে নিয়ে যান। সে বছরই হাসান শাহরিয়ার ভর্তি হন পাবনা জিলা স্কুলে, ক্লাস সেভেনে। ঐ বছরই (১৯৫৮) ইকবাল হোসেন চৌধুরী মুন্সেফ হিসেবে বদলি হলেন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি। চাচাতো ভাই ইশফাক হোসেন চৌধুরী ও হাসান শাহরিয়ার ভর্তি হলাম ফটিকছড়ি করোনেশন হাই ইংলিশ স্কুৃলে। ডিসেম্বরে বার্ষিক পরীক্ষার পর হাসান শাহরিয়ার আবার চলে এলেন সুনামগঞ্জে। কিন্তু জুবিলী স্কুলে কোন সিট না থাকায় ভর্তি হন বুলচান্দ হাইস্কুলে। তবে মাসখানেক পরে একটি সিট পাওয়া গেলে জুবিলী স্কুলে ক্লাস এইটে ভর্তি হন। জুবিলী স্কুলে পড়াশোনার সময়ই স্কাউট হিসেবে লাহোর জাম্বুরি এবং যশোর ও সিলেটে র্যালিতে যোগদান করেন। তখন থেকেই লেখালেখিতে উৎসাহ ছিল। তিনি ও তাঁর সতীর্থ মলয় ভৌমিক স্কুল ম্যাগাজিনের তৃতীয় সংখ্যার (১৯৬০-৬১) সম্পাদক ছিলেন। ছিলেন ইত্তেফাকের খেলাঘরের একজন সক্রিয় সংগঠক।
হাসান শাহরিয়ার ১৯৬৪ সালে করাচি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্জন করেন অনার্স সহ এমএ ডিগ্রি। ১৯৬৪ সালে সাপ্তাহিক Democrat পত্রিকায় সাংবাদিকতায় হাতে খড়ি। ছয় মাসের মধ্যে করাচি মনিং নিউজ পত্রিকায় যোগদান করেন। ১৯৬৬ সালে বিখ্যাত ‘ডন’ পত্রিকায় যোগ দেন। একই সাথে ছিলেন ইত্তেফাকের পশ্চিম পাকিস্তান প্রতিনিধি।
পঞ্চাশ বছরের বেশী সময় ধরে তিনি ইংরেজি ও বাংলা ভাষায় প্রকাশিত দেশ বিদেশের মর্যাদা সম্পন্ন পত্রিকায় কাজ করেছেন। বিদেশি পত্রপত্রিকা ও সংবাদ সাময়িকীগুলোর মধ্যে নিউজউইক ইন্টারন্যাশনাল-এর সঙ্গেই তাঁর সম্পর্ক ছিল দীর্ঘতম। ১৯৮১ থেকে তিনি এই বিখ্যাত সাময়িকীর বাংলাদেশ প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন তিন দশক ধরে। ২০১২ সালে ‘নিউজউইক’ এর মুদ্রিত সংস্করণ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত হাসান শাহরিয়ারের যে সব প্রতিবেদন সাময়িকীতে প্রকাশ হয়েছিল, সে সবের একটি সংকলনও রয়েছে। ওই প্রতিবেদনগুলোর পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের সময়ের মুক্তি সংগ্রাম ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে নিয়ে যেসব প্রতিবেদন সাময়িকীতে বের হয়, সেগুলোর অনুবাদও রয়েছে সাংবাদিক হাসান শাহরিয়ার এর ‘নিউজউইক-এ বাংলাদেশ: মুক্তিযুদ্ধ বিজয় এবং তারপর’ গ্রন্থে।
হাসান শাহরিয়ারের সর্বশেষ গ্রন্থ ‘যারে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা‘। ‘অতীত, অতীত নয়’ হাসান শাহরিয়ারের একটি কালজয়ী গ্রন্থ। ‘শেষ ভালো যার সব ভালো তার‘ গ্রন্থটিও ব্যাপক পাঠক প্রিয়তা লাভ করেছে। তাঁর প্রতিটি গ্রন্থ ইতিহাসের অংশ।
একাধারে কলাম লেখক ও বিশ্লেষক; দৈনিক ইত্তেফাকের সাবেক নির্বাহী সম্পাদক, জাতীয় প্রেসক্লাবের প্রাক্তন সভাপতি ছিলেন। নেতৃত্ব দিয়েছেন ওভারসিজ করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ওকাব), দক্ষিণ এশিয়া প্রেসক্লাব, কমনওয়েলথ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের (সিজেএ) ইন্টারন্যাশনাল প্রেসিডেন্ট ইমেরিটাস ও জাতীয় প্রেসক্লাব সহ দেশি বিদেশী অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাংবাদিক সংগঠনের। টরেন্টো ভিত্তিক কমনওয়েলথ জার্নালিস্ট এসোসিয়েশনের এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তিনিই প্রথম সাংবাদিক যিনি ২০০৩ ও ২০০৮ সালে এই সংগঠনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। দুই মেয়াদে ২০০৩-২০১২ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ছিলেন আজীবন প্রেসিডেন্ট ইমেরিটাস।
১৯৬৯ সালে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার মৃত্যুর পর পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন তাঁর বড় ছেলে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন। এসময় হাসান শাহরিয়ার চিফ রিপোর্টার হিসেবে পদোন্নতি পান। ১৯৬২ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত দৈনিক ইত্তেফাকের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি যখন কলেজের ছাত্র, তখনই সম্পৃক্ত হন ‘দৈনিক ইত্তেফাক’ এর সঙ্গে। এর পর টানা ৪৫ বছর। এই ঐতিহ্যবাহী পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা ও অকুতোভয় সম্পাদক মরহুম তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, তাঁর দুই ছেলে ও নাতি-নাতনিদের অর্থাৎ তিন পুরুষের সঙ্গে অত্যন্ত আন্তরিক ও হৃদ্যতাপূর্ণ পরিবেশে কাজ করেছেন এই বরণ্যে সাংবাদিক। করাচি থেকে তিনি বিশেষ সংবাদদাতা হিসেবে ইত্তেফাক-এ যোগ দেন ১৯৭৪ সালের ১ জানুয়ারি। স্বাধীনতার পর তিনি যোগ দেন দৈনিক ইত্তেফাকের কূটনৈতিক প্রতিবেদক হিসেবে। সেখান থেকে নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে অবসর নিয়েছিলেন ২০০৮ সালে। দীর্ঘ কর্মমুখর জীবনে তিনি ডেইলি সানের সম্পাদক ও চট্টগ্রামের পত্রিকা পিপলস ভিউ-এর প্রধান সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
উল্লেখ্য, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গত ১০ এপ্রিল শনিবার বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান প্রথিতযশা আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাংবাদিক হাসান শাহরিয়ার।


