আকরাম উদ্দিন
ভারত থেকে বেয়ে আসা ঐতিহ্যবাহী ‘চলতি নদী’ সদর উপজেলার সুরমা, জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়ন এবং বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার সলুকাবাদ ইউনিয়নে অবস্থিত। সদর উপজেলার সুরমা নদী হতে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত পর্যন্ত চলতি নদীর বিস্তৃতি রয়েছে। যুগ যুগ ধরে মানুষের জীবন জীবিকার অন্যতম উপায় ছিল এই চলতি নদী। কিন্তু কালের বিবর্তনে বেশি উপার্জনের কৌশল হিসাবে বোমা মেশিন ও ড্রেজার দিয়ে পাথর উত্তোলন করায় চলতি নদীর প্রাকৃতিক সম্পদ হারিয়ে গেছে। নদীর বুকে হাজারো গর্ত খনন, নদী তীরে বোমা মেশিনের তীব্র শব্দ ও কম্পন এবং যানবাহনের ঢেউয়ের কারণে নদীর উভয় পাড় ভেঙ্গে বিভিন্ন এলাকার ঘর-বাড়ি, মসজিদ ও গাছপালা বিলিন হয়েছে। এখনও ভাঙ্গনের কবলে রয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ঈদগাহ, রাস্তা-ঘাট ও অসংখ্য গাছপালা। নদীতে পাথর না পেয়ে বেকার জীবনযাত্রা করছেন এলাকার হাজারো দিনমজুর।
সুরমা ও চলতি নদীর সংযোগস্থল থেকে চলতি নদীর উত্তরে অক্ষয়নগর গ্রামের পূর্ব পাশে বয়ে যাওয়া নদীর নাম ‘ধোপাজান’। এই ধোপাজান নদীর পূর্বদিকে একটি শাখা হিল্লুয়া বিলে (কাউয়ার হাওর) প্রবেশ করেছে। অক্ষয়নগর এলাকায় বয়ে যাওয়া ধোপাজান নদী হুড়ারকান্দা ও মুসলিমপুর গ্রামের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে জিনারপুর এলাকায় চলতি নদীতে মিলিত হয়েছে। এই জন্য নদীর নাম ‘ধোপাজান-চলতি নদী’ হয়েছে।
সুরমা নদীর মুখ থেকে শুরু হওয়া এই চলতি নদী রাউটিয়ার (ছোট বিল) মুখ পর্যন্ত ‘ঝালখালী’ নামে অভিহিত হয়ে আসছে। বৃটিশ আমল থেকে ঝালখালীর উভয় পাশের সদরগড় গ্রামে পাটনী, জেলে, মালী
সম্প্রদায়ের বসবাস। এই গ্রামে প্রথম বসতি স্থাপন করেন সম্ভু মিয়া, তৈবত আলী, আকবর আলী, আইবুল্লাহ অনেকে।
তৎকালীন সময়ে এলাকার বাসিন্দা পাটনী সম্প্রদায় কুটির শিল্পের কাজ করতেন। তারা বাঁশের বেত দিয়ে মাছের খলই, চুপরা, টুকরি, কুলা, অচু ইত্যাদি জিনিসপত্র তৈরি করতেন। মালীরা মিষ্টি মাটির ‘সিকড়’ বিক্রি করতেন। বেশিরভাগ জেলেরা এই ঝালখালীতে মাছ ধরতেন। তাঁদের জীবিকা নির্বাহের অন্যতম উপায় ছিল ঝালখালী। সদর উপজেলার ইব্রাহীমপুর, আরপিননগর, জগন্নাথপুর, নবীনগর, আক্তাপাড়, হালুয়ারগাঁও ও রহমতপুর গ্রামের জেলে সম্প্রদায় ঝালখালীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন।
ঝালখালীর একটি শাখা পশ্চিম দিকে রাউটিয়ার মুখ থেকে গজারিয়া গাং এ মিলিত হয়েছে। এই গজারিয়া গাং দিয়ে খরচার হাওরে পানি প্রবেশ করে। এখানে জামেরঢালা নামের একটি চরও ছিল। ঝালখালী থেকে চলতি নদীর উত্তরের একটি অংশ জিনারপুরের গাং নামে অভিহিত হয়ে আসছে। এই চলতি নদীর আরও উত্তরের অংশের নাম ডলুরার নদী। এরপর বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের জিরো পয়েন্ট।
এই ঐতিহ্যবাহী চলতি নদীতে পাথর উত্তোলনে অন্যতম কৌশল হিসাবে বোমা মেশিন ও ড্রেজার ব্যবহারের কারণে এখন চলতি নদীর প্রাকৃতিক সম্পদ হারিয়ে গেছে। নদীর উভয় পাড় ভেঙ্গে যাওয়ায় নদীর মানচিত্র অনেকটা পাল্টে গেছে। নদীতে এখন পর্যাপ্ত বালু-পাথর না থাকায় বেকার হয়ে পড়েছে স্থানীয় দিনমজুরেরা।
এক সময়ের ঐতিহ্যবাহী চলতি নদী জুড়ে ছিল বালু-পাথরের পাশাপাশি লাকড়ি ও মাছ। চার স্তরে মানুষের জীবন জীবিকার অন্যতম অবলম্বন ছিল এই নদী। এখন প্রায় বিলুপ্ত হয়েছে নদীর প্রাকৃতিক সম্পদ। জিনারপুর এলাকায় চলতি নদীতে কোনো প্রকারের মাছ নেই। মাছ নেই ঝালখালিতেও। হারিয়ে গেছে লাকড়ি ও পাথর।
সুরমা নদীর সংযোগস্থল থেকে ভারতের সীমান্ত পর্যন্ত চলতি নদীর সুবিশাল বিস্তৃতি রয়েছে। প্রায় পনের বছর আগেও এই নদীর প্রাকৃতিক সম্পদ মাছ, লাকড়ি ও বালু-পাথর উত্তোলন করে হাজার হাজার মানুষ জীবিকা নির্বাহ করতেন। জিনারপুর ও ঝালখালী এলাকায় চলতি নদীতে একাধিক বেলখেউ ও বাটা জাল দিয়ে সুস্বাদু মাছ শিকার করা হতো। প্রতিদিন বালু ও পাথর চলতি নদীর দুইপাড়ের বাসিন্দারা বেলচা দিয়ে বালু উত্তোলন এবং টুকরি বা জাকি দিয়ে পাথর উত্তোলন করতেন। ওই সময় নদীর গভীর পানিতে ডুবাডুবি করে বালু-পাথর উত্তোলন করতেন তারা। উত্তোলনকৃত বালু-পাথর পারগাইয়া নৌকায় ভর্তি করে প্রতি নৌকা বালু ৪০-৫০ টাকা, পাথর ৮০-৯০ টাকা বিক্রি করতেন। প্রতিদিন ভোর থেকে বালি-পাথর উত্তোলন করে দুপুর বেলায় স্থানীয় ঠিকাদারের কাছে বিক্রি করে বাড়ি ফিরতেন দিনমজুরেরা।
স্থানীয়রা জানান, অন্তত ২০০০ সাল পর্যন্ত এই ধোপাজান-চলতি নদী এলাকায় পরিবেশ ও প্রতিবেশ সুরক্ষিত ছিল। এরপর থেকে বেশি উপার্জনের কৌশল হিসাবে ঠিকাদারদের মদদে বোমা মেশিন ও ড্রেজার দিয়ে বালু-পাথর উত্তোলন শুরু করেন কতিপয় শ্রমিক। তখন থেকে যেখানে সেখানে ড্রেজার ও বোমা মেশিন স্থাপন করে বালু-পাথর উত্তোলন করার হিড়িক শুরু হয়।
নদীর বুকে বোমা মেশিন ও ড্রেজার স্থাপন করতে এগিয়ে আসেন ধনাঢ্য ব্যক্তিরা। তখন নদী হয়ে যায় বিভিন্ন স্থানে ভাগাভাগি। শুরু হয় নানা ঝগড়া, দাঙ্গা-হাঙ্গামা। বালি-পাথর উত্তোলনে বোমা মেশিন ও ড্রেজারের ব্যবহারে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে পড়ে নদীর বুক। নদীতে চলাচল শুরু করে কার্গো, বার্জ, বলগেট ও ইঞ্জিন নৌকা। হারিয়ে যাচ্ছে পারগাইয়া নৌকা।
যুগ যুগ ধরে চলতি নদীতে প্রতি বছর বন্যার প্রবল স্রোতে স্বাভাবিকভাবে ভাংগন পরিলক্ষিত হয়ে আসছিল। কিন্তু প্রায় পনের বছর ধরে চলতি নদীতে বোমা মেশিনের ও ড্রেজারের নানা অত্যাচারে ভাঙ্গন বৃদ্ধি পেয়েছে মারাত্মকভাবে। বোমা মেশিন ও ড্রেজারের মাধ্যমে অপরিকল্পিত বালু-পাথর উত্তোলনে এবং যানবাহন চলাচলের কারণে চলতি নদীর উভয় পাড়ের গ্রাম, ঘর-বাড়ি, মসজিদ, স্কুল ইত্যাদি বিলীন হয়েছে। নদীর বিভিন্ন স্থানে ভেসে উঠছে এলোপাতাড়ি চর। পাল্টে গেছে ঝালখালীর চিত্রও। হারিয়ে গেছে মাছ, লাকড়ি ও পাথর। এখন হারিয়ে যাচ্ছে বালু।
সুরমা ও চলতি নদীর সংযোগস্থলে নদীর পূর্বদিকে সদরগড় গ্রামের পাশে ভেসে উঠেছে বিশাল চর। এই চর এলাকা জুড়ে ঠিকাদারগণ বালি-পাথর সংরক্ষণ করছেন। পশ্চিমপাড় ভেঙ্গে যাওয়ায় সদরগড়ের বাসিন্দা মোতাওয়াল্লি কালা মিয়া নি:স্ব হয়ে পড়েন। ভাঙ্গনের কবল থেকে কালা মিয়ার দোকান ঘর তিন বার সরিয়ে নিয়েছেন। কালা মিয়ার প্রতিবেশি আরও তিনটি পরিবারের ঘর বাড়ি বিলীন হয়ে গেছে নদীতে। শুকনা মৌসুমে জলহীন চলতি নদীর বিভিন্ন স্থানে কালো মাটি ভেসে উঠে। স্থানীয় বাসিন্দারা কালো মাটি উত্তোলন করে জ্বালানীর কাজে ব্যবহার করেন। বোমা মেশিন ও ড্রেজার ব্যবহারের কারণে ডলুরা এলাকায় জিনারপুর, ভাদেরটেক, রামপুর, কাইয়ারগাঁও, ডলুরা পূর্ব ও পশ্চিমের গ্রাম, ডলুরা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, কবরস্থান, মসজিদ এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানের ভাঙ্গনে ঘর-বাড়ি ও গাছপালা বিলীন হয়ে গেছে।
বর্তমানে এই চলতি নদীর বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের জিরো পয়েন্টে বারকি শ্রমিকরা হাত দিয়ে বালু-পাথর উত্তোলন করছেন। সারা দিনেও সংসারে চলার মতো বালি-পাথর সংগ্রহ করতে পারেননি বলে জানান একাধিক বারকি শ্রমিক।
ডলুরা পশ্চিমপাড়ের বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী ও মোক্তার আলী বলেন, ‘আমাদের এলাকায় বিভিন্ন গ্রামের ঘর-বাড়ি বিলীন হয়ে গেছে নদীতে। বোমা মেশিন ও ড্রেজার ব্যবহার করায় যে ক্ষতি হয়েছে, তা অপূরণীয়।’
পূর্ব ইব্রাহীমপুর গ্রামের মো. আব্দুস শহীদ, আনোয়ার উদ্দিন, জমির হোসেন মীর ও রাশিদ আলী বলেন, ‘এই চলতি নদীর ঝালখালীতে মাছ ধরেছি, লাকড়ি ধরেছি। এখন তা নেই। বালি-পাথর ছিল এখন তাও নেই।’
পূর্ব সদরগড় গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল হামিদ বলেন, ‘ঝালখালী এলাকার সদরগড় গ্রামের চিত্র পাল্টে গেছে। খালের মধ্যখানে যে চর ভেসে উঠেছে, সেই চরে এখন ঠিকাদারদের বালু-পাথর সংরক্ষিত হচ্ছে।’
জিনারপুরের এখলাছ মিয়া বলেন, ‘নদীর গভীরে এখন ৩০-৫০ ফুটের মধ্যে কোনো পাথর পাওয়া যায় না। শ্রমিকরা চলতি নদীর জিরো পয়েন্টে গিয়ে পেটের তাগিদে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাথর তোলার চেষ্টা করছেন।’
- সুনামগঞ্জ-সাচনাবাজার সড়কে খানা-খন্দক
- ধর্মপাশা শিল্পকলা একাডেমিকে অপসংস্কৃতি রোধে সুন্দরের প্রতিবিম্ব করুন


